
ক্যাপ্টেন বিজয়ন্ত থাপার
শেষ আপডেট: 10 May 2025 19:28
পহেলগামের রক্তাক্ত প্রহর যেন ফের জাগিয়ে তুলল সীমান্তের সেই পুরনো যন্ত্রণাকে। যখন দেশের মাটিতে একের পর এক হামলা নামিয়ে আনছে জঙ্গিরা, যখন সেনা অভিযান ‘অপারেশন সিঁদুর’ হয়ে পাকিস্তানের ভিতরে ঢুকে ঘাঁটি গুঁড়িয়ে দিচ্ছে—ঠিক তখনই এক শহিদের লেখা চিঠি ফিরে এল স্মৃতির রণাঙ্গনে। বছর ২৫ আগের সেই চিঠি, লেখা হয়েছিল এক বুক সাহস, একচিলতে আশা আর অনেকখানি ভালবাসা দিয়ে। ক্যাপ্টেন বিজয়ন্ত থাপার তাঁর শেষ চিঠিতে লিখেছিলেন—“আবার যদি জন্ম নিই, সেনাবাহিনীতেই যোগ দেব।”
এই একটি বাক্য যেন প্রতিধ্বনি তোলে হাজার হাজার শহিদের প্রাণের চেতনায়। যুদ্ধ তাঁদের কাছে শুধু এক কর্তব্য নয়, এক ভালবাসাও। সীমান্তের গর্জনের মাঝে তাই যখন দেশ আবার এক অস্থির অধ্যায়ে পা রাখছে, তখন বিজয়ন্তের চিঠি যেন মনে করিয়ে দেয়—এই ভূখণ্ড কেবল ভূগোল নয়, এ এক অমোঘ অনুভব।

সীমান্তে একের পর এক হামলার জবাবে জঙ্গি ঘাঁটি গুঁড়িয়ে দিচ্ছে ভারত। 'অপারেশন সিঁদুর'-এর মাধ্যমে পাকিস্তানের ভিতর ঢুকে গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়েছে অন্তত ৯টি জঙ্গি ঘাঁটি। পহেলগামে ২৬ জন ভারতীয় নাগরিকের মৃত্যুর পর এই অপারেশন শুরু করে ভারত। অভিযোগ, ধর্মীয় পরিচয়ের ভিত্তিতে নির্বিচারে গুলি চালিয়েছিল জঙ্গিরা।
এর পাল্টা হিসেবে পাকিস্তানও সিভিলিয়ান এলাকায় ড্রোন ও মিসাইল হামলা শুরু করেছে। ভারতীয় সেনা অবশ্য অধিকাংশ হামলা রুখে দিয়েছে। দেশের মানুষ একদিকে যখন যুদ্ধ পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বিগ্ন, ঠিক তখনই স্মৃতির পর্দা ছুঁয়ে যায় কার্গিলের এক শহিদের লেখা একটি চিঠি। ১৯৯৯ সালে কার্গিল যুদ্ধে শহিদ হয়েছিলেন ক্যাপ্টেন বিজয়ন্ত থাপার। যুদ্ধে যাওয়ার আগে পরিবারের উদ্দেশে তাঁর লেখা শেষ চিঠি আজও হৃদয়বিদারক।
‘আবার যদি জন্ম নিই, সেনাবাহিনীতেই যোগ দেব’
কার্গিল যুদ্ধের সময় যখন দেশ ক্রিকেট বিশ্বকাপ দেখতে ব্যস্ত, তখন সীমান্তে লড়াই করছিলেন ভারতীয় সেনারা। বিজয়ন্ত ছিলেন তেমনই এক সাহসী অফিসার। তিনি লিখেছিলেন, “আমি যখন চিঠি লিখছি, তখন তোমরা হয়তো আকাশে আমাকে দেখতে পাচ্ছ। কোনও দুঃখ নেই। যদি আবার জন্ম নিই, আবারও সেনাবাহিনীতে যোগ দেব, দেশের জন্য লড়ব।”
তিনি আরও অনুরোধ করেছিলেন, বাবা-মা যেন যুদ্ধক্ষেত্রে গিয়ে দেখেন, কোথায় তাঁদের সন্তান দেশের জন্য লড়েছিল। এই চিঠির জন্যই পরে তাঁকে ‘বীর চক্র’ সম্মানে সম্মানিত করা হয়। শুধু দেশপ্রেম নয়, এই শহিদের চিঠিতে ছিল মানবতার ছোঁয়াও। তিনি লিখেছিলেন, “যা কিছু অঙ্গ নেওয়া সম্ভব, তা দান করা হোক। অনাথ আশ্রমে কিছু টাকা দিও, রুকসানাকে প্রতি মাসে ৫০ টাকা করে দিও। যোগী বাবার সঙ্গে দেখা করো।”

চিঠিতে বিজয়ন্ত তাঁর বাবাকে গর্বিত হতে বলেন। মায়ের উদ্দেশে লিখেছেন ভালবাসা। শেষ লাইন ছিল—“আমার ‘ডার্টি ডজন’-এর কাছে ফিরে যেতে হবে। আমার দলেই ১২ জন রয়েছে। সবাই ভাল থেকো। ‘Live life king size’ – তোমাদের রবিন।”
১২ জুন, ১৯৯৯—তোলোলিং জয়ের পর তাঁর ব্যাটেলিয়নের দায়িত্ব ছিল ব্ল্যাক রক কমপ্লেক্সে তিনটি পিম্পলস নোল দখল করা। সেই অপারেশন চলাকালীনই ‘বারবাদ বাঙ্কার’ দখল করতে গিয়ে শহিদ হন বিজয়ন্ত। যখন 'অপারেশন সিঁদুর'-এর মতো প্রতিক্রিয়ামূলক সামরিক অভিযান চলছে, তখন বিজয়ন্ত থাপারের লেখা সেই চিঠি যেন আবারও চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয়—সেনারা শুধু যুদ্ধ করে না, তাঁরা ভালবাসতে জানে। তাঁরা দেশের জন্য প্রাণ দিতে জানে।
এ দেশ চায় যুদ্ধ না হোক, কিন্তু যদি হয়ও, সেনারা জানে—কীভাবে রক্ষা করতে হয় 'ভারতমাতার সিঁদুর'।