সীমান্ত পেরিয়ে, সময়ের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে চলা এই কূটনৈতিক–আইনি অভিযানের লক্ষ্য ছিল একটাই: ভারতের সভ্যতা ও আত্মিক উত্তরাধিকারের অঙ্গচ্ছেদ হতে না দেওয়া (How India Brought Back Jewels)।

গ্রাফিক্স: দ্য ওয়াল
শেষ আপডেট: 30 January 2026 14:34
দ্য ওয়াল ব্যুরো: একেবারে সিনেমার চিত্রনাট্যকে হার মানানো নাটকীয়তায়, শেষ মুহূর্তে থামানো গেল নিলাম। রক্ষা পেল প্রায় আড়াই হাজার বছরের প্রাচীন, ভগবান বুদ্ধের সঙ্গে প্রত্যক্ষ ভাবে যুক্ত একগুচ্ছ অমূল্য রত্ন— পিপরাওয়া রেলিক্স (Buddha's Relics)। সীমান্ত পেরিয়ে, সময়ের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে চলা এই কূটনৈতিক–আইনি অভিযানের লক্ষ্য ছিল একটাই: ভারতের সভ্যতা ও আত্মিক উত্তরাধিকারের অঙ্গচ্ছেদ হতে না দেওয়া (How India Brought Back Jewels)।
শুরুটা যেভাবে
ঘটনার সূত্রপাত একটি ‘রুটিন অ্যালার্ট’ দিয়ে। কিন্তু খুব দ্রুতই তা বদলে যায় আন্তর্জাতিক স্তরের এক টানটান অভিযানে। জানা যায়, লন্ডনে থাকা পিপরাওয়া বুদ্ধ-রত্ন নিলামে তুলতে চলেছে আন্তর্জাতিক নিলাম সংস্থা সোদেবি’স (Sotheby’s), হংকংয়ে (Hong Kong)। বেস প্রাইস— প্রায় ১০০ মিলিয়ন ডলার। ১৮৯৮ সালে প্রাচীন কাপিলাবস্তুর স্তূপে এই রত্নগুলি আবিষ্কার করেছিলেন ব্রিটিশ প্রত্নতত্ত্ববিদ উইলিয়াম ক্ল্যাক্সটন পেপ্পে। ১২৭ বছর পরে তাঁরই বংশধর সেই রত্ন নিলামে তোলার উদ্যোগ নেন।
যেভাবে গয়না ফেরাল ভারত
পিপরাওয়া উত্তরপ্রদেশের গোরক্ষপুরের কাছে অবস্থিত। বৌদ্ধ ইতিহাসে যার গুরুত্ব অপরিসীম। এই রত্নগুলি শুধু গয়না নয়, বুদ্ধের অস্থিধাতু, রেলিক, রিলিকোয়ারি ও খোদাই করা পাথরের সঙ্গে যুক্ত এক অনন্য ঐতিহ্য। প্রথমবার ১২৭ বছর পরে ব্রিটেনে নিয়ে যাওয়া এই রত্নগুলির একাংশ ভারতে থাকা বুদ্ধ-রেলিকের সঙ্গে পুনর্মিলিত হওয়ার সুযোগ তৈরি হয় ‘দ্য লাইট অ্যান্ড দ্য লোটাস: রেলিক্স অফ দ্য অ্যাওয়েকেন্ড ওয়ান’ প্রদর্শনীর মাধ্যমে।
কিন্তু নিলামের ঘণ্টা বাজলে এই সভ্যতার স্মারক চিরতরে ছড়িয়ে পড়ত ব্যক্তিগত সংগ্রাহকদের হাতে। আরও ভয় ছিল— চিনের হাতে চলে যাওয়ার আশঙ্কা। সেখানেই হস্তক্ষেপ করে ভারত।
আইনের পাশাপাশি দর্শনের অস্ত্র
এই উদ্ধার অভিযানকে আলাদা করে দিয়েছে ভারতের যুক্তি। শুধু মালিকানা বা আইনি অধিকারের প্রশ্নে নয়, ভারত দাবি তোলে দর্শনের ভিত্তিতে। সরকারের বক্তব্য ছিল এই রত্ন ‘বস্তু’ নয়, জীবন্ত সভ্যতার বাহক। করুণা, অহিংসা, জ্ঞানধারার ধারাবাহিকতা— বৌদ্ধ দর্শনের এই মূল স্তম্ভগুলির সঙ্গে যুক্ত পবিত্র স্মারক কখনও বাণিজ্যের বিষয় হতে পারে না।
এই ‘নৈতিক ও সাংস্কৃতিক’ যুক্তিই আন্তর্জাতিক মঞ্চে আলোচনার মোড় ঘুরিয়ে দেয়। বাণিজ্যের জায়গায় বিবেককে সামনে এনে ভারত কার্যত নিলাম স্থগিত করতে সক্ষম হয়।
সংস্কৃতি মন্ত্রকের সচিব বিবেক আগরওয়াল, যিনি এই অভিযানের অন্যতম কারিগর, স্পষ্ট বলেন, “এই প্রথমবার ভারতে সরকারি ও বেসরকারি যৌথ উদ্যোগে কোনও রত্ন প্রত্যাবর্তন হল।” তাঁর অভিজ্ঞতা, বিশেষত অর্থ মন্ত্রকের ফিনান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিটে কাজ করার সুবাদে নিলাম জগতের ফাঁকফোকর বুঝতে বড় ভূমিকা নেয়। শেষ ৭২ ঘণ্টায় আইনি নোটিস, কূটনৈতিক চাপ ও তথ্যপ্রমাণের দৌড়ে থামে নিলাম।
অমূল্য ঐতিহ্যের সাক্ষ্য
ন্যাশনাল মিউজিয়ামের বিশেষজ্ঞ সভিতা কুমারীর কথায়, “এই রত্নগুলির বয়স প্রায় আড়াই হাজার বছর। প্রাথমিক বৌদ্ধ সভ্যতার অন্যতম প্রাচীন নিদর্শন এগুলি।” সহমত ন্যাশনাল মিউজিয়ামের ডেপুটি কিউরেটর আবিরা ভট্টাচার্যও। তাঁর মতে, “এগুলি শুধু প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন নয়, সভ্যতার স্মৃতি— যা ভৌগোলিক সীমানা মানে না।”
সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য দিক, এই অভিযানে এগিয়ে আসেন শিল্পপতি পিরোজশা গদরেজ। তিনি নিজে রত্নগুলি কিনে নিয়ে সরকারের হাতে তুলে দেন, এই শর্তে যে সেগুলি চিরকাল ভারতে থাকবে।