এখানে যেমন বিশাল হলঘর জুড়ে কয়েক হাজার সামগ্রীর প্রদর্শনী, তেমনি মুক্ত আকাশের নিচে থাকা পাথর খণ্ডে সযত্নে রক্ষিত আদিম ভারতের গুহাচিত্র। প্রাকৃতিক রঙের আঁকা কয়েক হাজার বছরের প্রাচীন গুহাচিত্রকে সযত্নে রক্ষা করে চলেছে এই সংগ্রহালয়। যে প্রতিষ্ঠানটির সঙ্গে জড়িয়ে আছে এক বিদগ্ধ বাঙালির নাম।

ইন্দিরা গান্ধী মানব সংগ্রহালয়
শেষ আপডেট: 7 February 2026 13:03
আপনি কি টাইম মেশিনে চেপে কয়েক ঘন্টার জন্য ফিরে যেতে চান কয়েক হাজার বছরের প্রাচীন ভারতে? মুহূর্তে গোটা ভারত ভ্রমণ করতে চান? দেখতে চান কাশ্মীর থেকে কন্যাকুমারী (Kashmir to Kanyakumari), অরুণাচল প্রদেশের চিন সীমান্ত থেকে রাজস্থান, গুজরাতের পাকিস্তান লাগোয়া মরুভূমি এলাকার প্রাচীন ভারতের খণ্ডচিত্র। না, কোনও কাহিনী চিত্র বা তথ্যচিত্র নয়, আজও আদিবাসীদের একাংশ যে প্রাচীন জীবনযাত্রায় অভ্যস্ত মাত্র কয়েক ঘণ্টায় আপনি তা চেক খুশ করতে পারেন মধ্যপ্রদেশের রাজধানী ভোপালে (Bhopal) এলে। ভোপাল শহর থেকে ঘন্টা দেড় দুয়েকের গাড়ি পথে ইন্দিরা গান্ধী রাষ্ট্রীয় মানব সংগ্রহালয় পৌঁছে গেলেই আপনি ফিরে যেতে পারেন প্রাচীন ভারতে। উপলব্ধি করতে পারেন কয়েক হাজার বছর আগে ভারতের আদিবাসী সমাজ বিজ্ঞান প্রযুক্তিকে ( Science Technology) কীভাবে তাদের জীবনযাত্রায় সম্পৃক্ত করেছিল।

ভোপালের পাহাড়ে অবস্থিত ইন্দিরা গান্ধী রাষ্ট্রীয় মানব সংগ্রহালয় (IGRMS) আদিম ভারতে মানব বিবর্তন ও সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্যের ধারক। ভারতের সমস্ত প্রদেশ এবং ভৌগোলিক এলাকার আদিম জনজাতিতের বাড়িঘর, পোশাক, খাবার, উৎসব এবং নানা সামাজিক ও সাংস্কৃতিক জীবনের উপাদানে সমৃদ্ধ এই সংগ্রহালয়ের প্রতিটি সামগ্রী সংশ্লিষ্ট এলাকা থেকে শুধু সংগ্রহ করা হয়েছে তাই নয়, সেগুলি নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্বেও আছেন সংশ্লিষ্ট সমাজের মানুষেরা যারা এখনো তাদের জীবনযাত্রায় আদি সভ্যতা বহন করেন।
ভারতের এই প্রাচীন ইতিহাস, ঐতিহ্যের জীবন্ত দলিলকে গোটা বিশ্বের সামনে তুলে ধরার প্রয়াস নিয়েছে নরেন্দ্র মোদীর সরকার। সেই সূত্রে গোটা বিশ্বে আদিম সভ্যতা নিয়ে পড়াশুনা এবং গবেষণায়রত মানুষের গন্তব্য ভোপালের এই সংগ্রহালয়। দেশের বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান থেকে নিয়মিত পড়ুয়াদের এই সংগ্রহালয় দেখানোর ব্যবস্থা করেছে কেন্দ্র। পাশাপাশি মধ্যপ্রদেশ সরকারও রাজ্যের স্কুল ও কলেজ পড়ুয়াদের এই সংগ্রহালয় পরিদর্শনের ব্যবস্থা করেছে।

আসলে এটি আর পাঁচটি মিউজিয়ামের মতো নয়। এখানে যেমন বিশাল হলঘর জুড়ে কয়েক হাজার সামগ্রীর প্রদর্শনী, তেমনি মুক্ত আকাশের নিচে থাকা পাথর খণ্ডে সযত্নে রক্ষিত আদিম ভারতের গুহাচিত্র। প্রাকৃতিক রঙের আঁকা কয়েক হাজার বছরের প্রাচীন গুহাচিত্রকে সযত্নে রক্ষা করে চলেছে এই সংগ্রহালয়। যে প্রতিষ্ঠানটির সঙ্গে জড়িয়ে আছে এক বিদগ্ধ বাঙালির নাম।
১৯৭০ সালে কলকাতায় অনুষ্ঠিত ভারতীয় বিজ্ঞান কংগ্রেসের এক অধিবেশনে নৃতত্ত্ব ও প্রত্নতত্ত্ব বিভাগের সভাপতি সচিন রায় ভারতে একটি ‘মানব জাদুঘর’ তৈরির প্রয়োজনীয়তার কথা তুলে ধরেন। সেই আহ্বানে সাড়া দিয়ে মধ্যপ্রদেশ রাজ্য সরকার ২০০ একর জমি বরাদ্দ করে। ১৯৭৭ সালে ভিত্তি প্রস্তর স্থাপনের মাত্র দু বছরের মাথায় আনুষ্ঠানিকভাবে যাত্রা শুরু করে এই সংগ্রহালয়। আনুষ্ঠানিক যাত্রা দিল্লিতে হলেও পরে তা মধ্যপ্রদেশের ভোপালে স্থানান্তর করা হয়।

আইজিআরএমএস নৃতাত্ত্বিক বিস্ময়ে সমৃদ্ধ এক ভাণ্ডার, যেখানে উন্মুক্ত প্রদর্শনী, গ্যালারি (ভীথি-সংকুল ও ভোপাল গ্যালারি) এবং পর্যায়ক্রমিক/অস্থায়ী প্রদর্শনীর মাধ্যমে ঐতিহ্যবাহী বাড়িঘর থেকে শুরু করে আচার-অনুষ্ঠানের নানা বৈচিত্র্যময় উপাদান রয়েছে। ভীথি-সংকুল ও ভোপাল গ্যালারি অভ্যন্তরীণ প্রদর্শনীর অন্যতম আকর্ষণ। সেখানে বিভিন্ন নিদর্শন ও সেগুলি সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্যসমৃদ্ধ তথ্যচিত্র প্রদর্শনীর ব্যবস্থা রয়েছে। আগ্রহী দর্শক ও ছাত্রছাত্রীরা প্রতিদিন সেগুলি থেকে তাদের প্রয়োজনীয় রসদ সংগ্রহ করছেন।
উন্মুক্ত প্রদর্শনীগুলির মধ্যে রয়েছে ভারতের বিভিন্ন প্রান্তের আদিবাসীদের আদিম ঘরবাড়ি, দক্ষিণের সমুদ্র উপকূল, মরুভূমি থেকে, হিমালয়ের গ্রাম, শিলাচিত্র ঐতিহ্য, প্রাচীন পথ, নদী উপত্যকার সংস্কৃতি, মন্দির প্রাঙ্গণ এবং ঐতিহ্যবাহী প্রযুক্তি পার্ক।