কথিত আছে, খ্রিস্টীয় প্রথম শতকে অযোধ্যার (Ayodhya) এক রাজকন্যা (Ayodhya Princess) সমুদ্র পেরিয়ে পৌঁছে গিয়েছিলেন কোরিয়ায়— আর সেখানেই রচনা করেছিলেন এক নতুন রাজবংশের।

গ্রাফিক্স: দ্য ওয়াল
শেষ আপডেট: 27 December 2025 20:29
দ্য ওয়াল ব্যুরো: কে-পপ বা কোরিয়ান খাবারের (Korea) ঢেউ ভারতে আসার বহু আগে থেকেই ভারত ও কোরিয়ার (India Korea) মধ্যে ছিল মানুষের, সংস্কৃতির আর কাহিনির আদানপ্রদান। ইতিহাস-পুরাণের সেই অধ্যায় আজও দুই দেশের সম্পর্কের এক আশ্চর্য সেতু হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। কথিত আছে, খ্রিস্টীয় প্রথম শতকে অযোধ্যার (Ayodhya) এক রাজকন্যা (Ayodhya Princess) সমুদ্র পেরিয়ে পৌঁছে গিয়েছিলেন কোরিয়ায়— আর সেখানেই রচনা করেছিলেন এক নতুন রাজবংশের।
লোককথা অনুযায়ী, ৪৮ খ্রিস্টাব্দে অযুত্যা (অনেক ঐতিহাসিকের মতে বর্তমান অযোধ্যা) থেকে রাজকন্যা সুরিরত্না পাড়ি দেন কোরিয়ার উদ্দেশে। সেখানেই তিনি বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন গয়া বা কারাক রাজ্যের রাজা কিম সুরোর সঙ্গে। কোরিয়ায় তিনি পরিচিত হন রানি হিও হোয়াং-ওক নামে। এই বিয়ের মধ্য দিয়েই শুরু হয় কারাক রাজবংশের ইতিহাস।

কাহিনি আরও বলে, বিয়ের সময় পণের সঙ্গে করে রাজকন্যা নিয়ে গিয়েছিলেন চা-বীজ। সেই সূত্রেই নাকি কোরিয়ায় চা চাষের সূচনা। কোরিয়ান তরঙ্গের অনেক আগে এই ‘ভারত-তরঙ্গ’-ই দুই সভ্যতার মধ্যে এক প্রাচীন যোগাযোগের নিদর্শন।
এই বিশ্বাসের জোরেই বহু দশক ধরে দক্ষিণ কোরিয়ার শত শত মানুষ অযোধ্যায় আসেন রানি হিও হোয়াং-ওকের স্মৃতিতে শ্রদ্ধা জানাতে। রামমন্দির নির্মাণের আগেও এই যাতায়াত চলেছে। কোরিয়ার প্রাচীন গ্রন্থ ‘সমগুক ইউসা’-য় ‘আয়ুতা’ নামের এক দূরবর্তী রাজ্যের রাজকন্যার উল্লেখ রয়েছে, যাকে অনেকেই অযোধ্যার সঙ্গে মিলিয়ে দেখেন।
২০২০ সালে তৎকালীন দক্ষিণ কোরিয়ার রাষ্ট্রদূত জানিয়েছিলেন, কোরিয়ার ইতিহাসগ্রন্থে এই বিবাহের উল্লেখ আছে এবং রাজা কিম সুরোর সমাধি থেকে পাওয়া কিছু প্রত্নবস্তু ভারতের সঙ্গে যোগসূত্রের ইঙ্গিত দেয়। উত্তরপ্রদেশ পর্যটন দফতরের দাবি, কারাক বংশের প্রায় ৬০ লক্ষ মানুষ অযোধ্যাকে তাঁদের মাতৃভূমি বলে মনে করেন।
এই ঐতিহাসিক যোগসূত্রকে স্বীকৃতি দিয়ে ২০১৯ সালে ভারত সরকার রানি হিও হোয়াং-ওকের স্মরণে ডাকটিকিট প্রকাশ করে। অযোধ্যার সরযূ নদীর তীরে ২০০১ সালেই তাঁর স্মৃতিসৌধ তৈরি হয়েছিল। পরে ২০১৫ সালে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর কোরিয়া সফরের সময় স্মৃতিসৌধ সম্প্রসারণে দুই দেশের মধ্যে চুক্তি হয়। ২০২২ সালে নতুন রূপে উদ্বোধন হয় কুইন হিও মেমোরিয়াল পার্ক, যেখানে তাঁর সমুদ্রযাত্রা, কোরিয়া পৌঁছনোর কাহিনি ও রাজদম্পতির ভাস্কর্য তুলে ধরা হয়েছে।
এই ধারাবাহিকতায় গত ২৪ ডিসেম্বর অযোধ্যায় আরও এক গুরুত্বপূর্ণ সংযোজন— দক্ষিণ কোরিয়া থেকে আনা ১০ ফুট উচ্চতার ব্রোঞ্জের মূর্তি স্থাপন করা হয়েছে রানি হিও হোয়াং-ওকের। খারাপ আবহাওয়ার কারণে কোরিয়ার প্রতিনিধিরা উপস্থিত থাকতে না পারলেও, অযোধ্যার মেয়র গিরিশপতি ত্রিপাঠী মূর্তির উন্মোচন করেন। তাঁর কথায়, “দু' হাজার বছরের পুরনো ভারত-কোরিয়া সম্পর্ককে স্মরণ করার এক শুভ মুহূর্ত।”
যদিও সব গবেষক অযোধ্যাকেই রাজকন্যার জন্মস্থান বলে মানেন না। কেউ কেউ দক্ষিণ ভারতের পাণ্ড্য রাজ্যের সঙ্গে তাঁর যোগসূত্রের কথাও তুলে ধরেছেন। বিতর্ক থাকলেও, ইতিহাস আর উপকথার মিশেলে এই কাহিনি আজও দুই দেশের মানুষকে কাছাকাছি এনেছে।
দু' হাজার বছর পর অযোধ্যায় স্থাপিত সেই ব্রোঞ্জ মূর্তি যেন আবার নতুন করে স্মরণ করিয়ে দিল— কে-ওয়েভের অনেক আগেই ভারত ও কোরিয়ার মধ্যে বইতে শুরু করেছিল এক গভীর সাংস্কৃতিক স্রোত।