
মুখ প্রতিস্থাপন।
শেষ আপডেট: 17 July 2024 22:16
দ্য ওয়াল ব্যুরো: মুখমণ্ডল প্রতিস্থাপনের মতো জটিল ও কঠিন সার্জারি চিকিৎসাবিজ্ঞানে খুব কমই রয়েছে। অত্যাধুনিক এই অস্ত্রোপচার গোটা বিশ্বেই বেশ বিরল। এবার এই বিষয়েই বিশেষজ্ঞ সার্জেনের একটি দল বিশেষ প্রশিক্ষণে প্রস্তুত হচ্ছে দিল্লির এইমসে।
মুখমণ্ডল প্রতিস্থাপনের ক্ষেত্রে মৃত বা ব্রেনডেথ হওয়া কোনও মানুষের মুখ থেকে টিস্যু নিয়ে এই প্রতিস্থাপন করা হয়। ২০০৫ সালে বিশ্বের প্রথম আংশিক মুখ প্রতিস্থাপনের অস্ত্রোপচার হয়েছিল এবং ২০১০ সালে স্পেনে প্রথম সম্পূর্ণ মুখ প্রতিস্থাপনের অস্ত্রোপচার সফল হয়েছিল। তথ্য বলছে, বিশ্বে সব মিলিয়ে এমন সফল অস্ত্রোপচার হয়েছে ৫০টিরও কম। আমেরিকা, ফ্রান্স, স্পেন এবং তুরস্ক-- এই চারটি দেশেই আপাতত হয়েছে এই ফেস ট্রান্সপ্লান্ট। এবার সেই তালিকায় এইমসের হাত ধরে নাম লেখাতে চলেছে ভারতও।
এইমস সূত্রের খবর, ইনস্টিটিউটের সার্জনরা এই বছর ডামি ফেস ট্রান্সপ্লান্ট করার মাধ্যমে প্রশিক্ষণ নেওয়া শুরু করবেন। মৃতদেহ থেকে অন্য মুখে প্রতিস্থাপন করবেন টিস্যু। ডামি থেকে আসল রোগীর উপর এই পদ্ধতি প্রয়োগ করতে হয়তো তিন-চার বছর লেগে যেতে পারে।

এইমসের প্লাস্টিক সার্জারি বিভাগের সিনিয়র চিকিৎসক এবিষয়ে বলেন, 'এইমস একটি সরকারি প্রতিষ্ঠান। তা সত্ত্বেও এখানে জটিল প্লাস্টিক সার্জারির উপর অসাধারণ কাজ হয়। আগামী কিছু বছরের মধ্যে মুখমণ্ডল প্রতিস্থাপনের কাজও শুরু করব আমরা। তবে এ জন্য কঠোর প্রশিক্ষণ নিতে হবে চিকিৎসকদের। প্রত্যেকের মধ্যে বিশেষ দক্ষতা এবং কোঅর্ডিনেশন প্রয়োজন। এ জন্য বিদেশের একাধিক হাসপাতালে চিকিৎসকদের যেতে হতে পারে।'
চিকিৎসকরা জানাচ্ছেন, পুড়ে যাওয়া, দুর্ঘটনায় নষ্ট হয়ে যাওয়া অথবা জন্মগত ত্রুটিতে বিকৃত কোনও মুখে এই অস্ত্রোপচার করা হয়ে থাকে। কোনও মৃত ব্যক্তির দান করা মুখের টিস্যু দিয়েই মুখ প্রতিস্থাপন করতে পারেন রোগী। এই পদ্ধতি ভাস্কুলারাইজড কম্পোজিট অ্যালোট্রান্সপ্লান্টেশন নামেও পরিচিত। এতে মুখের ত্বক, নাকের গঠন, চোখ এবং চোখের পাতা, ঠোঁট, ধমনী এবং শিরা, মুখ নাড়ানোর পেশি, নার্ভ, হাড়ের অংশ-- এই সবকিছুর প্রতিস্থাপন জড়িত। তবে এই সার্জারির পরে রোগী যে দেখতে একেবারে অন্যরকম হয়ে যান, তা নয়, কারণ বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই, আসল হাড়ের কাঠামোর উপর মুখের টিস্যুগুলি বসানো হয় কেবল।

শুধু মুখের বাহ্যিক বিকৃতি নয়, এই সার্জারিতে খাবার গেলা, চিবোনো, দেখা, কথা বলা, গন্ধ শোঁকা, মুখের অভিব্যক্তি-- এই সবকিছুরই সুস্থতা আনা সম্ভব। অর্থাৎ এই অস্ত্রোপচার বিকৃত মুখকে বদলে মানুষের জীবনে পরিবর্তন এনে দিতে তো পারেই, সেই সঙ্গে জীবনের সামগ্রিক গুণমান উন্নত করে মানুষকে নবজন্ম দিতে পারে এই সার্জারি।
চিকিৎসকরা জানাচ্ছেন, মুখের রিকনস্ট্রাকটিভ প্লাস্টিক সার্জারির সঙ্গে মুখমণ্ডল প্রতিস্থাপন সার্জারির ফারাক রয়েছে। কারণ রিকনস্ট্রাকটিভ প্লাস্টিক সার্জারির ক্ষেত্রে ওই রোগীরই নিজের ত্বক সংগ্রহ করা হয় তাঁর উরু, পিঠ বা বুক থেকে। একাধিক অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে মুখের ক্ষতিগ্রস্থ অংশে সেই নতুন ত্বক বসানো হয় এবং মুখকে আগের মতো করে তোলা হয়।

মুখ প্রতিস্থাপনের ক্ষেত্রে প্রয়োজন দাতা। সেই দাতার বিভিন্ন ক্রাইটেরিয়া আবার গ্রহীতার সঙ্গে মিলতে হবে, ঠিক অন্যান্য অঙ্গ প্রতিস্থাপনের মতোই। সেই সঙ্গে রয়েছে লিঙ্গ, জাতি, ত্বকের রঙ-- এই সব ফ্যাক্টর। সবকিছু মেলানোর পরে, দাতা ও গ্রহীতার মুখের মডেল তৈরি করে, ম্যাপিং করা হয় ইমেজিং প্রযুক্তি ব্যবহার করে। এর পরে ধাপে ধাপে সার্জারি পরিচালনা করা হয়।
প্রথমে দাতার মুখ থেকে ধমনী, চর্বি, স্নায়ু, পেশী এবং ত্বকের অংশগুলি সংগ্রহ করা হয়, এর পরে সেগুলি সংরক্ষণ করা হয় অস্ত্রোপচারে কাজে লাগানোর জন্য। এর পরে গ্রহীতার অস্ত্রোপচার শুরু হয়, তাঁর মুখের ক্ষতিগ্রস্ত ত্বক এবং টিস্যুগুলি সরানো হয়। এর পরে সূক্ষ্ম সুঁচ ব্যবহার করে, তাঁর মুখের অসংখ্য রক্তনালীকে সংযুক্ত করা হয়। তার উপরে স্নায়ু এবং পেশী গ্রাফ্টিং করা হয়। এর পরে তরুণাস্থি এবং হাড়গুলিকে সংযুক্ত করা হয় এবং অবশেষে, নতুন নরম টিস্যু এবং ত্বক একসঙ্গে সেলাই করা হয়। এই গোটা পদ্ধতিটি ১০ থেকে ৩৬ ঘণ্টা দীর্ঘ হতে পারে। কয়েকশো সার্জেনকে কাজে লাগতে পারে, একটা সার্জারির জন্য।

তবে একথা মনে রাখতে হবে, আর পাঁচটা অঙ্গ প্রতিস্থাপনের মতোই এই প্রতিস্থাপনের পরেও বিশেষ যত্ন এবং ফলোআপ চিকিৎসা প্রয়োজন। এর ফলে অন্যান্য নানা স্বাস্থ্য ঝুঁকিও বাড়তে পারে, সে কথাও মাথায় রাখতে হবে।