
শেষ আপডেট: 2 October 2023 18:08
দ্য ওয়াল ব্যুরো: বিহারে বহুচর্চিত কাস্ট সেন্সাস বা জাতি গণনার ফলাফল প্রকাশিত হল সোমবার। তাতে দেখা যাচ্ছে, পূর্ব ভারতের বৃহত্তম রাজ্যটির ১৩ কোটি জনসংখ্যার ৬৩ ভাগই অন্যান্য অনুন্নত শ্রেণি বা ওবিসি সম্প্রদায় ভুক্ত। এরমধ্যে ৩৬ শতাংশ অতি পিছড়া বা এক্সট্রিম ব্যকওয়ার্ড শ্রেণি ভুক্ত। পশ্চাৎপদ বা ব্যাকওয়ার্ড ২৭.১ শতাংশ।
৬৩ শতাংশ ওবিসি-র মধ্যে সংখ্যায় সবচেয়ে বেশি—প্রায় ১৪ শতাংশ হল লালুপ্রসাদ যাদবের যাদব সম্প্রদায়ের লোকেরা। তুলনায় মুখ্যমন্ত্রী নীতীশ কুমারের কুর্মি সম্প্রদায় অনেকটা পিছিয়ে। তবে দুই সম্প্রদায়ই ওবিসি। সোমবার প্রকাশিত রিপোর্টে বলা হয়েছে, রাজ্যে তফসিলি সম্প্রদায়ভুক্ত মানুষ ১৯ শতাংশ। এক শতাংশের সামান্য বেশি হল তফসিলি উপজাতি সম্প্রদায়ের মানুষ।
কাস্ট সেন্সাস নিয়ে গত এক-দেড় বছর ধরে জাতীয় রাজনীতিতে তোলপাড় চলছে। অবস্থান বদলে কংগ্রেস এখন ওবিসি প্রশ্নে সবচেয়ে সরব। হাত-শিবিরসহ বিজেপি বিরোধী বেশিরভাগ দল জাতি গণনার দাবি তুললেও কেন্দ্রীয় সরকার তাতে রাজি হয়নি। স্বভাবতই লোকসভা ভোটের কয়েক মাস আগে প্রকাশিত এই রিপোর্ট বিজেপিকে বেগ দিতে পারে, মনে করছে ওয়াকিবহাল মহল। বিশেষ করে দেশে চাকরি-শিক্ষায় ওবিসি সংরক্ষণের হার ২৭ শতাংশ থেকে বাড়ানোর দাবি উঠতে পারে। ইতিমধ্যে ডিএমকে শাসিত তামিলনাড়ু, কংগ্রেস শাসিত ছত্তীসগড়, রাজস্থান এবং জেএমএম পরিচালিত ঝাড়খণ্ড প্রভৃতি রাজ্য ওবিসি কোটা বৃদ্ধি করতে বিধানসভায় প্রস্তাব পাশ করিয়েছে। কিন্তু ৫০ শতাংশের বেশি সংরক্ষণ দিতে হলে কেন্দ্রীয় সরকারের অনুমোদন প্রয়োজন। সেই অনুমতি দিচ্ছে না মোদী সরকার।
বিজেপি সরকারের ইচ্ছানুসারেই সদ্য লোকসভায় মহিলা বিল পাশ হয়েছে ওবিসি নারীদের জন্য পৃথক কোটা ছাড়াই। কংগ্রেস-সহ সব বিরোধী দল এই ব্যাপারে এককাট্টা হয়ে দাবি তোলে, তফসিলি জাতি এবং উপজাতিদের পাশাপাশি ওবিসি সম্প্রদায়ের মহিলাদেরও সংরক্ষণের আওতায় আনা হোক। বলা হয় ওই সম্প্রদায়ের মানুষই দেশে সংখ্যাগরিষ্ঠ। কিন্তু মোদী সরকার সেই দাবি নস্যাৎ করে দেয়।
কেন্দ্র কাস্ট সেন্সাসে রাজি না হওয়ায় বিহার একমাত্র রাজ্য যারা নিজেরাই গণনার সিদ্ধান্ত নেয়। তার আগে মুখ্যমন্ত্রী নীতীশ কুমার দিল্লিতে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর সঙ্গে দেখা করে সারা দেশেই জাতি গণনার দাবি জানান। তাঁর প্রস্তাব ছিল জনগণনার সময়ই তফসিলি জাতি এবং উপজাতির বাইরে অন্যান্য অনুন্নত শ্রেণিভুক্তদের মাথা গোনা হোক। ২০২১-এ যেহেতে কোবিডের কারণে জনগণনা হয়নি তাই সময় হাতে নিয়ে জাতিগত গণনার দাবি তুলেছিলেন বিহারের মুখ্যমন্ত্রী। বিজেপি বিরোধী সব দল তাতে সায় দেয়। কিন্তু এখনও নারাজ মোদী সরকার।
আসলে সংরক্ষণের ব্যাপারে বিজেপি সরকারের পক্ষে আরএসএসের নির্দেশের বাইরে হাঁটা মুশকিল। হিন্দু জাতিয়তাবাদী এই সংগঠন সাধারণভাবে সংরক্ষণ ব্যবস্থার বিপক্ষে। তারা বর্ণ নির্বিশেষে সব হিন্দুকে হিন্দুত্বের ছাতার তলায় আনার পক্ষপাতী। সেই কারণে নানা সময় সঙ্ঘ পরিবার সংরক্ষণ তুলে দেওয়ার দাবিও তুলেছে। তবে সম্প্রতি উল্টো সুর শোনা গিয়েছে আরএসএস প্রধান মোহন ভাগবতের মুখে। তিনি বলেছেন, সংরক্ষণ ব্যবস্থা চালু রাখার প্রয়োজন আছে।
ভারতে আসলে ১৯৩১-এর পর আর জাতিগত গণনা হয়নি। জনগণনার সময় সাধারণ বা জেনারেল এবং তফসিলি জাতি ও উপজাতি, এই তিন ক্যাটিগরিতে গণনা করা হয়। কিন্তু সাধারণ ক্যাটিগরির অন্তর্ভুক্ত থাকা ওবিসি সম্প্রদায়ের শত শত জাতি সংখ্যায় কত, তাদের আর্থ-সামাজিক অবস্থা কেমন ১৯৩১-এর পর তা আর জানার চেষ্টা হয়নি। সেই কাজটিই ৯২ বছর পর বিহারে করা হল। আদালত অবশ্য সেন্সাস বা জনগণনার পরিবর্তে সার্ভে বা সমীক্ষা শব্দটি ব্যবহার করতে বলেছে।
দ্য ওয়াল এখন হোয়াটসঅ্যাপেও। ফলো করতে ক্লিক করুন।
সেন্সাস না হলেও ১৯৭৭ সালে ক্ষমতায় এসে জনতা পার্টির সরকার ওবিসিদের সংরক্ষণের আওতায় আনতে বিহারের প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী বিন্দেশ্বরী প্রসাদ মণ্ডলের নেতৃত্বে কমিটি গঠন করেছিল যা মণ্ডল কমিশন নামে খ্যাত। সেই কমিটির সুপারিশ মেনে ১৯৯০-এ প্রধানমন্ত্রী বিশ্বনাথপ্রতাপ সিংহ ওবিসি’দের জন্য কেন্দ্রীয় সরকারের চাকরি ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ২৭ শতাংশ সংরক্ষণের সিদ্ধান্ত ঘোষণা করেন। সেই সূত্রে জন্ম নেয় মণ্ডল-কমণ্ডল বা মণ্ডল বনাম মন্দির রাজনীতি যা বিগত সাড়ে তিন দশক যাবৎ জাতীয় রাজনীতির মূল ধারা হয়ে আছে। পরে চালু হয় রাজ্যভিত্তিক সংরক্ষণ। বাংলায় এখন সংরক্ষণের পরিমাণ ১৭ শতাংশ।
বিহারের সমীক্ষার ফল প্রকাশ্যে আসার পর আশু দুটি পরিবর্তন নিয়ে রাজনৈতিক মহলে চর্চা শুরু হয়েছে। এক. ওবিসি সংরক্ষণের মাত্রা বৃদ্ধির দাবি জোরালো হবে। দুই. লোকসভা ভোটের মুখে মণ্ডল রাজনীতির পালে বাড়তি হাওয়া লাগতে পারে। দুটি সম্ভাবনাই বিজেপির জন্য বিপদের।
সেই কারণেই সোমবার বিহারের কাস্ট সমীক্ষার ফল প্রকাশের পর পরই মুখ্যমন্ত্রী নীতীশ কুমার এবং আরজেডি সুপ্রিমো লালুপ্রসাদ যাদবকে তীব্র আক্রমণ শানিয়েছেন পঞ্চায়েত ও গ্রামোন্নয়ন মন্ত্রী গিরিরাজ সিং। তিনি বলেন, নীতীশ, লালুপ্রসাদরা জনগণের চোখে ধুলো দিতে চাইছে। এই সমীক্ষার ফল সামাজিক অশান্তি বাড়িয়ে দেবে। অন্যদিকে, মুখ্যমন্ত্রী নীতীশ বলেন, সোমবার মহাত্মা গান্ধীর জন্মদিনে আমরা রিপোর্টটি প্রকাশ করে তাঁর প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করলাম। তিনি আজীবন এই মানুষদের জন্য লড়াই করেছেন।