
শেষ আপডেট: 21 December 2023 10:29
দ্য ওয়াল ব্যুরো: লোকসভার শীতকালীন অধিবেশনে সংসদে ঝাঁপ কাণ্ডের জেরে গত বুধবার থেকে শুরু হয়েছে তুমুল বিতর্ক। প্রবল প্রতিবাদ বিক্ষোভের মধ্যে কংগ্রেস, তৃণমূল মিলিয়ে বিরোধী দলের প্রায় দুই তৃতীয়াংশ সাংসদকেই সাসপেন্ড করা হয়েছে। প্রায় বিরোধী শূন্য সেই লোকসভায় বুধবার পাশ হয়ে গেল তিনটি বিল, যা কিনা ভারতীয় দণ্ডবিধি, ফৌজদারী কার্যবিধি এবং সাক্ষ্য আইনের বিকল্প হতে চলেছে।
এই তিনটি বিল হল ভারতীয় ন্যায় সংহিতা ২০২৩, ভারতীয় নাগরিক সুরক্ষা সংহিতা ২০২৩ এবং ভারতীয় সাক্ষ্য বিল ২০২৩। বুধবার সংসদে পাশ করানোর আগে লোকসভায় এই বিলগুলির খুঁটিনাটি প্রস্তাবনা পড়ে শুনিয়েছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ।
এক নজরে দেখে নেওয়া যাক এই তিনটি বিলের মূল বক্তব্য।
ভারতীয় ন্যায় সংহিতা ২০২৩:
নয়া এই বিলে ভারতীয় দণ্ডবিধির বেশিরভাগ অপরাধের ধারা অপরিবর্তিত রাখা হয়েছে। সেই সঙ্গে শাস্তির নতুন পদ্ধতি হিসেবে যোগ করা হয়েছে অপরাধীকে দিয়ে সমাজসেবামূলক কাজ করানো। চুরি-ছিনতাই জাতীয় ছোটখাটো অপরাধের ক্ষেত্রে এই ধারা প্রযোজ্য হবে।
সন্ত্রাসবাদকে এই বিলে অপরাধের তালিকাভুক্ত করা হয়েছে। দেশ কিংবা মানুষের একতা, নিরাপত্তা, আর্থিক সুরক্ষা, সম্ভ্রম বিঘ্নিত হয়, এমন যে কোনও কার্যকলাপকে সন্ত্রাসবাদের তালিকাভুক্ত করা হয়েছে।
কোনও গোষ্ঠীর হয়ে অপহরণ, সাইবার ক্রাইম, জোর করে টাকা আদায় বা এই জাতীয় সংগঠিত অপরাধের সঙ্গে যুক্ত থাকলে তা আলাদাভাবে অপরাধ হিসেবে পরিগণিত হবে।
রাজদ্রোহের ধারা বদলে সেই জায়গায় আনা হয়েছে নতুন ধারা 'দেশদ্রোহ'।
জাতি, ধর্ম, ভাষা, ব্যক্তিগত বিশ্বাস জাতীয় কোনও বিশেষ পরিচয়ের ভিত্তিতে পাঁচজন কিংবা তার বেশি ব্যক্তি যদি কাউকে খুন করে, অর্থাৎ গণপিটুনির ঘটনার ক্ষেত্রে যাবজ্জীবন কারাবাস কিংবা মৃত্যুদণ্ডের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে।
যৌন নির্যাতনের ঘটনার ক্ষেত্রে নিগৃহীতার মৌখিক এবং ভিডিও বয়ান রেকর্ড করার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে এই বিলে।
'হিট এন্ড রান' মামলার ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ ১০ বছর পর্যন্ত জেল হতে পারে। তবে অপরাধী যদি আহত ব্যক্তিকে হাসপাতালে কিংবা থানায় নিয়ে যায় দুর্ঘটনার পর, সেক্ষেত্রে শাস্তি খানিক কমতে পারে।
জিরো এফআইআর দায়ের করার বিষয়ে পরিশ্রম আরও কমানোর চেষ্টা করা হয়েছে। ঘটনাস্থলের নিকটবর্তী থানা নয়, যে কোনও থানাতেই জিরো এফআইআর দায়ের করা যাবে। প্রশাসনের কাজ হবে সেই এফআইআর ২৪ ঘণ্টার মধ্যে নিকটবর্তী থানায় স্থানান্তরিত করা।
Speaking in the Lok Sabha on three new criminal law bills. https://t.co/R9dNYYD0VA
— Amit Shah (@AmitShah) December 20, 2023
ভারতীয় নাগরিক সুরক্ষা সংহিতা:
১৯৭৩ সালের ফৌজদারী কার্যবিধিকে প্রতিস্থাপিত করতে চলেছে এই বিল। যে সমস্ত অপরাধের ক্ষেত্রে ন্যূনতম সাত বছর কারাবাসের বিধান রয়েছে সেগুলির ক্ষেত্রে ফরেনসিক তদন্ত বাধ্যতামূলক করা হয়েছে।
যৌন নির্যাতনের ঘটনার ক্ষেত্রে নিগৃহীতার শারীরিক পরীক্ষার রিপোর্ট ৭ দিনের মধ্যে তদন্তকারী আধিকারিকের কাছে পাঠাতে হবে মেডিকেল এক্সামিনারকে।
এমন কোনও ঘটনা, যেখানে শাস্তি এড়ানোর জন্য একজন ঘোষিত অপরাধী পালিয়ে গেছে এবং অল্প সময়ের মধ্যে তাকে গ্রেফতার করার সম্ভাবনা নেই, তেমন ক্ষেত্রে তার অনুপস্থিতিতেই বিচার চালিয়ে যাওয়া এবং রায় ঘোষণা করার প্রস্তাব আনা হয়েছে।
তদন্ত এবং আইনি পদ্ধতির জন্য দরকার হলে গ্রেফতার করা হয়নি এমন সন্দেহভাজন ব্যক্তির কাছ থেকেও আঙুলের ছাপ, ভয়েজ স্যাম্পেল, সই সংগ্রহ করে পরীক্ষা করা যেতে পারে।
নতুন এই বিলে ক্ষমা ভিক্ষার আর্জির সময়সীমা বেঁধে দেওয়ার কথা বলা হয়েছে। তাছাড়া সাক্ষীদের সুরক্ষা দেওয়া, বয়ান সংগ্রহ এবং নথিভুক্ত করার ক্ষেত্রে ইলেকট্রনিক মোডের অনুমতির প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে।
এছাড়া পুলিশি পদ্ধতি এবং কিছু ঘটনার তদন্তের ক্ষেত্রে সময়সীমা বেঁধে দেওয়া হয়েছে। যেমন মামলার প্রথম শুনানির এক সপ্তাহের মধ্যে পুলিশকে আদালতে চালান পেশ করতে হবে। এ ছাড়া চার্জশিট দেওয়ার ৯০ দিনের মধ্যে তদন্ত প্রক্রিয়া শেষ করতে হবে। ৩০ দিনের মধ্যে রায় ঘোষণা করতে হবে।
ভারতীয় সাক্ষ্য বিল ২০২৩:
ভারতীয় সাক্ষ্য আইনের বদলি হিসেবে আসতে চলেছে এই বিল। পুরাতন সাক্ষ্য আইনে মৌখিক এবং তথ্যভিত্তিক- এই দুই ধরনের প্রমাণ গ্রাহ্য করা হত। নতুন বিলে এই দুই ধরনের প্রমাণের পাশাপাশি ইলেকট্রনিক রেকর্ডকেও প্রমাণ হিসেবে গ্রহণ করার প্রস্তাব আনা হয়েছে।
এছাড়া আদালতে মামলার শুনানি, তদন্ত এবং বিচার প্রক্রিয়া বৈদ্যুতিনভাবে করার প্রস্তাব আনা হয়েছে। ডিজিটাল সাক্ষ্যপ্রমাণ পেশের পদ্ধতি হিসেবে ইলেকট্রনিক কমিউনিকেশন ডিভাইস ব্যবহারের অনুমতি চাওয়া হয়েছে এই বিলে।
ম্যাজিস্ট্রেটের শংসাপত্র ছাড়া থানায় পুলিশ আধিকারিকদের সামনে দেওয়া কোনও স্বীকারোক্তি গ্রাহ্য করা হবে না নতুন বিলে। তবে জেলবন্দি থাকাকালীন অভিযুক্তের কাছ থেকে যদি এমন কোন তথ্য পাওয়া যায় যা সরাসরি কোনও রহস্যের উদঘাটনে কাজে লাগবে, তাহলে সেক্ষেত্রে তা প্রমাণ হিসেবে গণ্য করা যেতে পারে।
এছাড়া এই বিলে একাধিক মানুষের জন্য যৌথ বিচার ব্যবস্থার বিধান রাখার প্রস্তাব আনা হয়েছে। যেসব ঘটনায় অভিযুক্ত পলাতক কিংবা অ্যারেস্ট ওয়ারেন্টে সাড়া দেয়নি, তাদের ক্ষেত্রে এই নিয়ম প্রযোজ্য হবে।