২০২৫: ভারতের ইতিহাসে সংস্কারের বছর! জেনে নিন মোদীর নতুন নীতি ও প্রভাব যা বিকশিত ভারতের ভিত্তি মজবুত করছে।

নরেন্দ্র মোদী
শেষ আপডেট: 31 December 2025 07:58
সারা বিশ্বের নজর ভারতের দিকে। এর কারণ, আমাদের মানুষের উদ্ভাবনামূলক প্রচেষ্টা ও উদ্যোগ। আজ, সারা বিশ্ব আশা এবং প্রত্যয় নিয়ে ভারতের দিকে তাকিয়ে রয়েছে। দেশের বিকাশের পালে হাওয়া লাগানো পরবর্তী পর্যায়ের বহু-ক্ষেত্রিক সংস্কার যেভাবে অগ্রগতিকে ত্বরান্বিত করেছে তা প্রশংসা কুড়োচ্ছে সকলেরই।
আমি অনেককেই বলছি যে, ভারত সওয়ার হয়েছে রিফর্ম এক্সপ্রেসের।
এই রিফর্ম এক্সপ্রেসের মূল ইঞ্জিন হল ভারতের জনবিন্যাসগত সুবিধা – আমাদের তরুণ প্রজন্ম এবং আমাদের মানুষের অদম্য স্পৃহা।
সংস্কার প্রক্রিয়াকে ধারাবাহিক জাতীয় অভিযানে পরিণত করার দিক থেকে দেখলে ২০২৫ সালটি ভারতের কাছে বিশেষভাবে স্মরণীয় হয়ে থাকবে। এই যাত্রার ভিত্তির নির্মাণ হয়েছে বিগত ১১ বছর ধরে। আমরা প্রতিষ্ঠানের আধুনিকীকরণ, প্রশাসনের সরলীকরণ এবং দীর্ঘমেয়াদী সর্বাত্মক বিকাশের ভিত্তিস্থাপন করেছি।
স্থিতপ্রজ্ঞ মনোভাব নিয়ে এগিয়ে যেতে হবে আমাদের... আরও বড় লক্ষ্য নিয়ে, কর্মসম্পাদনায় দ্রুতি এবং সর্বাত্মক রূপান্তরের মন্ত্র নিয়ে। এই সব সংস্কার প্রক্রিয়ার মূল কথা হল নাগরিকদের মর্যাদাপূর্ণ জীবনযাপন সুনিশ্চিত করা, উদ্যোগপতিদের উদ্ভাবনার পথে এগিয়ে যাওয়ার সাহস জোগানো এবং বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানকে স্বচ্ছতা ও দায়বদ্ধতার সঙ্গে কাজ করতে সক্ষম করে তোলা।
সংস্কার প্রক্রিয়ার কয়েকটি উদাহরণ তুলে ধরছি।
*জিএসটি সংস্কার
• স্পষ্টভাবে ৫% ও ১৮%-এর দ্বিস্তরীয় কর কাঠামো রূপায়িত।
• সাধারণ পরিবার, ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোগপতি, কৃষক এবং শ্রমনিবিড় ক্ষেত্রগুলির ওপর বোঝা কমেছে।
• সরকারের লক্ষ্য মতভেদ ও বিরোধ দূর করা এবং সাধারণ মানুষ যাতে আরও বেশি সংখ্যায় প্রয়োজনীয় বিধি অনুসরণ করেন তা নিশ্চিত করা।
• এই সংস্কার প্রক্রিয়া উপভোক্তার চাহিদার পালে হাওয়া লাগিয়েছে। উৎসবের মরশুমে বিক্রিবাটাও বেড়েছে।
মধ্যবিত্ত শ্রেণীর জন্য অত্যন্ত খুশির খবর :
• প্রথমত, বছরে ১২ লক্ষ টাকা আয়ে কোন কর দিতে হবে না।
• ১৯৬১-র সেকেলে আয়কর আইনের জায়গায় এসেছে আধুনিক এবং সরল আয়কর আইন ২০২৫।
• সব মিলিয়ে সংস্কারের এই উদ্যোগ ভারতকে স্বচ্ছ ও প্রযুক্তিচালিত কর প্রশাসনের দিকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার কাজ সহজ করেছে।
*ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পের পক্ষে সুবিধাজনক
• ‘ছোট সংস্থা’র সংজ্ঞা পরিমার্জিত – ১০০ কোটি টাকা পর্যন্ত লেনদেন রয়েছে যে সব সংস্থার তারা এই বর্গে অন্তর্ভুক্ত হয়েছে।
• বাণিজ্যিক সংস্থার বাধ্যবাধকতা এবং তার সঙ্গে জড়িয়ে থাকা নানা ধরনের খরচও কমেছে।
বিমা ক্ষেত্রে ১০০% এফডিআই সংক্রান্ত সংস্কার
• ভারতীয় বিমা সংস্থাগুলিতে ১০০% বিদেশী প্রত্যক্ষ বিনিয়োগ বা এফডিআই অনুমোদিত।
• এর ফলে আরও বেশি গ্রাহক বীমার আওতায় আসবেন এবং তাঁদের নিরাপত্তা নিশ্চিত হবে।
• প্রতিযোগিতা বাড়ার ফলে গ্রাহকরা বীমা সংস্থা বেছে নেওয়ার আরও বেশি সুযোগ পাবেন এবং পরিষেবার মানও আরও উন্নত হবে।
শেয়ার বাজারে সংস্কার
• সংসদে পেশ হয়েছে সিকিউরিটা মার্কেট কোড বিল। এই বিলে সেবি-র প্রশাসনিক পরিধি বাড়ানোর সংস্থান রয়েছে এবং বিষয়টি লগ্নিকারীদের আরও বেশি নিরাপত্তার সহায়ক। বাধ্যবাধকতার বোঝাও কমবে এবং গড়ে উঠবে বিকশিত ভারতের উপযোগী প্রযুক্তিচালিত শেয়ার বাজার।
• সংস্কার প্রক্রিয়ার সুবাদে বাধ্যবাধকতা এবং অন্যান্য ঝুটঝামেলা কমায় সঞ্চয়ের দিকটি জোরদার হবে।
সমুদ্রপথ এবং নীল অর্থনীতি সংক্রান্ত সংস্কার :
• সংসদের একটিমাত্র অধিবেশন, বর্ষাকালীন অধিবেশনেই, এক্ষেত্রে পাঁচ-পাঁচটি যুগান্তকারী বিল পাশ হয়েছে : ল্যাডিং অ্যাক্ট, ২০২৫; ক্যারেজ অফ গুডস বাই সী বিল, ২০২৫; কোস্টাল শিপিং বিল, ২০২৫; মার্চেন্ট শিপিং বিল, ২০২৫ এবং ইন্ডিয়ান পোর্টস বিল, ২০২৫।
• এই সংস্কারমূলক পদক্ষেপ নথি সংক্রান্ত কাজ সরল করেছে। পাশাপাশি বিরোধ নিষ্পত্তি সহজতর হয়েছে এবং লজিস্টিকসের খরচও কমেছে।
• ১৯০৮, ১৯২৫ এবং ১৯৫৮ বহু সেকেলে আইন বাতিল করা হয়েছে।
*জন বিশ্বাস... অপরাধের তকমা দেওয়ার অতিরিক্ত প্রবণতার দিন শেষ *
• বেশ কয়েকশো সেকেলে আইন বাতিল হয়েছে।
• রিপিলিং অ্যান্ড অ্যামেন্ডমেন্ট বিল ২০২৫-এর মাধ্যমে ৭১টি আইন খারিজ করা হয়েছে।
ইজ অফ ডুয়িং বিজনেস জোরদার করা
• বিভিন্ন কৃত্রিম তন্তু, প্লাস্টিক, পলিমার, বেস মেটালের ক্ষেত্রে মোট ২২টি কিউসিও বাতিল করা হয়েছে। নানা ধরনের ইস্পাত, ইঞ্জিনিয়ারিং, বৈদ্যুতিক পণ্য, সঙ্কর, ভোগ্যপণ্য প্রভৃতির ক্ষেত্রে ৫৩টি কিউসিও আপাতত স্থগিত রাখা হয়েছে।
• এটি পোশাক রপ্তানিতে ভারতের অংশীদারিত্ব বাড়াবে; জুতো, অটোমোবাইলসের মতো বিভিন্ন শিল্পে উৎপাদন খরচ কমাবে; এবং ইলেকট্রনিক্স, সাইকেল ও স্বয়ংচালিত পণ্য দেশীয় ক্রেতারা যাতে কম দামে কিনতে পারেন তা নিশ্চিত করবে।
ঐতিহাসিক শ্রম সংস্কার
• শ্রম আইনগুলোকে নতুন রূপ দেওয়া হয়েছে, ২৯টি বিচ্ছিন্ন আইনকে চারটি আধুনিক বিধিতে সংযুক্ত করা হয়েছে।
• ভারত এমন একটি শ্রম কাঠামো তৈরি করেছে যা শ্রমিকদের স্বার্থ সুরক্ষিত রাখার পাশাপাশি ব্যবসায়িক পরিমণ্ডলকে উৎসাহিত করে।
• এই সংস্কারগুলি ন্যায্য মজুরি, সময়মতো মজুরি প্রদান, বিবাদহীন শিল্প সম্পর্ক, সামাজিক নিরাপত্তা এবং নিরাপদ কর্মক্ষেত্রের উপর দৃষ্টি নিবদ্ধ করে।
• এগুলি শ্রমশক্তিতে মহিলাদের আরও বেশি সংখ্যায় অংশগ্রহণ নিশ্চিত করে।
• সংগঠিত শ্রমশক্তির পরিধি বাড়িয়ে চুক্তিভিত্তিক শ্রমিকসহ অসংগঠিত শ্রমিকদের ইএসআইসি এবং ইপিএফও-এর আওতায় আনা হয়েছে।
ভারতীয় পণ্যের জন্য বৈচিত্র্যময় ও সম্প্রসারিত বাজার
• নিউজিল্যান্ড, ওমান এবং ব্রিটেনের সঙ্গে বাণিজ্য চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছে। এগুলি বিনিয়োগ বাড়াবে, কর্মসংস্থান সৃষ্টিকে উৎসাহিত করবে এবং স্থানীয় উদ্যোক্তাদেরও অনুপ্রাণিত করবে। বিশ্ব অর্থনীতিতে এক বিশ্বস্ত ও প্রতিযোগিতাসক্ষম অংশীদার হিসেবে ভারতের অবস্থান সুদৃঢ় হবে।
• সুইজারল্যান্ড, নরওয়ে, আইসল্যান্ড এবং লিচেনস্টাইনকে নিয়ে গঠিত ইউরোপীয় মুক্ত বাণিজ্য সংস্থার (EFTA) সঙ্গে মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি কার্যকর হয়েছে। উন্নত ইউরোপীয় অর্থনীতির সঙ্গে এটিই ভারতের প্রথম মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি।
পারমাণবিক শক্তি সংস্কার
• শান্তি আইনটি ভারতের পরিচ্ছন্ন শক্তি এবং প্রযুক্তি যাত্রায় এক যুগান্তকারী পদক্ষেপ।
• এটি পারমাণবিক বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির নিরাপদ, সুরক্ষিত এবং দায়িত্বশীল প্রসারের জন্য একটি শক্তিশালী কাঠামো নিশ্চিত করে।
• এটি ডেটা সেন্টার, উন্নত উৎপাদন, গ্রীণ হাইড্রোজেন এবং উচ্চ-প্রযুক্তি শিল্পক্ষেত্রের মতো এআই যুগের ক্রমবর্ধমান শক্তির চাহিদা মেটাতে ভারতকে সক্ষম করে।
• এটি স্বাস্থ্যসেবা, কৃষি, খাদ্য নিরাপত্তা, জল ব্যবস্থাপনা, শিল্প, গবেষণা এবং পরিবেশগত স্থিতিশীলতার ক্ষেত্রে পারমাণবিক প্রযুক্তির শান্তিপূর্ণ প্রয়োগকে উৎসাহিত করে। এতে অন্তর্ভুক্তিমূলক বিকাশ এবং উন্নত জীবনযাত্রার পথ প্রশস্ত হয়।
• এটি বেসরকারি ক্ষেত্রের অংশগ্রহণ, উদ্ভাবন এবং দক্ষতা উন্নয়নের জন্য নতুন পথ খুলে দেয়। এটি ভারতের তরুণদের জন্য অত্যাধুনিক প্রযুক্তি এবং পরবর্তী প্রজন্মের শক্তি সমাধানে নেতৃত্ব দেওয়ার সুযোগ তৈরি করে।
বিনিয়োগকারী, উদ্ভাবক এবং প্রতিষ্ঠানগুলির জন্য ভারতের সঙ্গে অংশীদারিত্বের ভিত্তিতে বিনিয়োগ ও উদ্ভাবনের মাধ্যমে এক পরিচ্ছন্ন, স্থিতিশীল ও ভবিষ্যতের জন্য প্রস্তুত শক্তি পরিমণ্ডল গড়ে তোলার এটিই উপযুক্ত মুহূর্ত।
গ্রামীণ কর্মসংস্থান নিশ্চয়তায় এক যুগান্তকারী সংস্কার
• বিকশিত ভারত- জি রাম জি আইন, ২০২৫ কর্মসংস্থান নিশ্চয়তা কাঠামো, কর্মসংস্থানের নিশ্চয়তাকে ১০০ দিন থেকে বাড়িয়ে ১২৫ দিন করেছে।
• এর ফলে গ্রামের পরিকাঠামো এবং জীবিকা শক্তিশালী করার জন্য ব্যয় বৃদ্ধি পাবে।
• এর লক্ষ্য হলো গ্রামীণ কাজকে উচ্চতর আয় এবং উন্নত সম্পদ গড়ে তোলার এক মাধ্যমে পরিণত করা।
শিক্ষা সংস্কার
সংসদে বিল পেশ করা হয়েছে।
• একটি একক, সমন্বিত উচ্চশিক্ষা নিয়ন্ত্রক সংস্থা স্থাপন করা হবে।
• ইউজিসি, এআইসিটিই, এনসিটিই-এর মতো একাধিক পরস্পর-সংযুক্ত সংস্থার পরিবর্তে বিকশিত ভারত শিক্ষা অধিষ্ঠান স্থাপন করা হবে।
• প্রাতিষ্ঠানিক স্বায়ত্তশাসন জোরদার করা হবে, উদ্ভাবন ও গবেষণাকে উৎসাহিত করা হবে।
কেবল পরিধিই নয়, এর অন্তর্নিহিত দর্শনও ২০২৫ সালের সংস্কারগুলোকে তাৎপর্যপূর্ণ করে তুলেছে। আমাদের সরকার এক আধুনিক গণতন্ত্রের প্রকৃত চেতনায় নিয়ন্ত্রণের চেয়ে সহযোগিতাকে এবং বিধি-নিষেধের চেয়ে সুবিধাকে অগ্রাধিকার দিয়েছে।
ক্ষুদ্র ব্যবসা, তরুণ পেশাজীবী, কৃষক, শ্রমিক এবং মধ্যবিত্তদের বাস্তবতা স্বীকার করে নিয়ে এই সংস্কারগুলি প্রণয়ন করা হয়েছে। ব্যাপক পরামর্শ, তথ্য এবং সাংবিধানিক মূল্যবোধের উপর ভিত্তি করে এগুলি প্রতিষ্ঠিত। নিয়ন্ত্রণ-ভিত্তিক অর্থনীতি থেকে নাগরিকদের কেন্দ্রে রেখে পারস্পরিক আস্থার যে অর্থনীতিতে আসার প্রয়াস গত এক দশক ধরে করা হচ্ছে, এই সংস্কারগুলি তাতে গতির সঞ্চার করেছে।
এই সংস্কারগুলোর লক্ষ্য একটি সমৃদ্ধ ও আত্মনির্ভরশীল ভারত গড়ে তোলা। বিকশিত ভারত নির্মাণই আমাদের উন্নয়ন যাত্রার ধ্রুবতারা। আগামী বছরগুলোতেও আমরা সংস্কারের এই কর্মসূচি চালিয়ে যাব।
ভারতের এই বিকাশ যাত্রায় সামিল হতে দেশ - বিদেশের সবাইকে আমি অনুরোধ জানাচ্ছি।
ভারতের উপর আস্থা রাখুন এবং আমাদের জনগণের উপর বিনিয়োগ করুন!
মতামত ব্যক্তিগত