
সুবক্তা, কবি ও রাজনীতির মিশেল। গ্রাফিক্স- শুভ্র শর্ভিন
শেষ আপডেট: 25 December 2024 14:41
দ্য ওয়াল ব্যুরো: 'সত্তা কা খেল তো চলেগা, সরকারেঁ আয়েগি-জায়েগি, পার্টিয়াঁ বনেগি বিগড়েগি...মগর ইয়ে দেশ রহনা চাহিয়ে...ইস দেশ কা লোকতন্ত্র অমর রহনা চাহিয়ে।' ১৯৯৬ সালে লোকসভায় অনাস্থা প্রস্তাবের উপর বিতর্কের জবাবে প্রধানমন্ত্রী অটলবিহারী বাজপেয়ীর সেই ঐতিহাসিক ভাষণের শুরুতেই ভারতীয় রাজনীতিতে বিজেপির প্রথম প্রধানমন্ত্রী বলেছিলেন, 'যদি ম্যায় পার্টি তোড়ু অওর সত্তা মে জানে কে লিয়ে নয়ি গঠবন্ধন বনায়ুঁ তো ম্যায় উস সত্তা কো ছুনা ভি পসন্দ নহি করুঙ্গা।'
অটলবিহারী বাজপেয়ী দেশের প্রথম তথাকথিত হিন্দুত্ববাদী দলের প্রধানমন্ত্রী, যিনি ভারতকে এক শতক থেকে পরবর্তী শতকে পৌঁছে দেওয়ার দরজা খুলে দিয়েছিলেন। দেশের ভিতরে কিংবা বাইরে সব থেকে গ্রহণযোগ্য, সর্বজনশ্রদ্ধেয়, হাসিখুশি, দলমতনির্বিশেষে নিরপেক্ষ দৃষ্টিভঙ্গির মানুষ হিসেবে খ্যাতি অর্জন করেছিলেন বাজপেয়ী। সে কারণে ২০১৮ সালের ১৬ অগস্ট মৃত্যুর ৬ বছর পরেও আজ, বুধবার, ২৫ ডিসেম্বর তাঁর জন্মশতবর্ষে সকলেই তাঁর স্মৃতিতে শ্রদ্ধা নিবেদন করেছেন।
Today, on Atal Ji’s 100th birth anniversary, penned a few thoughts on his monumental contribution to our nation and how his efforts transformed many lives.https://t.co/mFwp6s0uNX
— Narendra Modi (@narendramodi) December 25, 2024
সুবক্তা, কবি ও রাজনীতির মিশেল
১৯২৪ সালের ২৫ ডিসেম্বর মধ্যপ্রদেশের গোয়ালিয়রে জন্ম অটলবিহারীর। হিন্দি ও ইংরেজিতে অনর্গল কথা বলতে পারতেন। বিশেষত ভারতে তাঁর মতো বাগ্মী, সুরসিক, চাঁচাছোলা অথচ শুদ্ধ ভাষায় বাক্যবাণ ছুড়তে কম নেতাই পারতেন। তাই তাঁর সভায় শুধুমাত্র বিজেপি বা সরসঙ্ঘের সমর্থকরাই নন, বিরোধী দলের কর্মী-সমর্থকরাও ভিড় জমাতেন। এতটাই ছিল তাঁর বক্তৃতার আকর্ষণ।
বিশ্বের শক্তিমানদের দরবারে ভারতকে প্রথম পরমাণু শক্তিধর দেশ হিসেবে প্রতিষ্ঠা দিয়েছিলেন বাজপেয়ী। শুধু পরমাণু অস্ত্র নয়, পাকিস্তানের সঙ্গে দোস্তির হাত বাড়িয়ে দিয়েও প্রয়োজনে যুদ্ধ ঘোষণা করতেও পিছপা হননি অটলবিহারী। তাঁর দাদু শ্যামলাল বাজপেয়ী ছিলেন সংস্কৃত পণ্ডিত। বাবা কৃষ্ণবিহারী বাজপেয়ী ব্রজভাষা ও খারিবোলি হিন্দির প্রখ্যাত কবি ছিলেন। কিশোর বয়সেই হিন্দু সংস্কারবাদী আন্দোলনের পথিকৃত আর্য সমাজের যুব সংগঠন আর্য কুমার সভার সদস্যপদ গ্রহণ করেন। তাঁর পরিবার ছিল রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সঙ্ঘের অন্যতম সমর্থক। তিনিও সঙ্ঘে যোগ দেন এবং আমৃত্যু স্বয়ংসেবক হিসেবে থেকে যান।
তাঁর দক্ষতা ও সাহিত্যপ্রীতি দেখে সঙ্ঘ তাঁকে প্রচারণ ও পত্রিকা বিভাগের দায়িত্ব সঁপে দেয়। 'রাষ্ট্রধর্ম' নামে পত্রিকা প্রকাশের সময় তাঁকেই সম্পাদক নির্বাচন করা হয়। ১৯৪৮ সালে আরএসএসের হিন্দি পত্রিকা 'পাঞ্জজন্য'র প্রথম সম্পাদক ছিলেন বাজপেয়ী। এছাড়াও হিন্দি দৈনিক 'স্বদেশ' এবং 'বীর অর্জুন' ও সাহিত্য পত্রিকা 'চেতনা'র সম্পাদক ছিলেন। প্রত্যক্ষ রাজনীতিতে যোগ দেওয়ার পর মোরারজি দেশাইয়ে জনতা পার্টির মন্ত্রিসভায় বিদেশমন্ত্রী হিসেবে থাকাকালীন তাঁর কবিতার বই প্রকাশ হলে বিশ্বসুদ্ধ লোক জানতে পারে তাঁর কাব্যপ্রতিভার কথা। জরুরি অবস্থার সময় জেলে বসে লেখা কবিতার সংকলন প্রকাশিত হয় 'কৈদি কবিরায় কি কুণ্ডলিয়াঁ' নামে।
বাজপেয়ী ও বাংলা এবং মমতা
১৯৯৮ সালের ফেব্রুয়ারি। বিজেপি এবং সিপিএমের হাড্ডাহাড্ডি লড়াইয়ে জমি তৈরি হচ্ছে। দমদম লোকসভা কেন্দ্রের বিজেপি প্রার্থী তপন সিকদারের তারকা প্রচারক অটলবিহারী বাজপেয়ী। দমদম সেন্ট্রাল জেলে মাঠে জনসভা। কিন্তু, সেই জনসভার সাফল্যের মেয়াদ হল মাত্র ১৩ মাসের। তপন সিকদার সিপিএম প্রার্থী নির্মল চট্টোপাধ্যায়কে হারিয়ে দিলেও ১৯৯৯ সালের এপ্রিলে বাজপেয়ী সরকারের পতন হল।
কিন্তু ১৩ বছর পর বাজপেয়ীর সেই সভার বক্তব্য রাজ্যের রাজনৈতিক পর্দায় সত্যি হয়ে উঠল। বাজপেয়ী বলে গিয়েছিলেন, যদি এমন কেউ থাকে, যে বাংলার বুক থেকে কমিউনিস্ট শাসনের অবসান ঘটাবে, তাহলে তাঁর নাম মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। সেই লোকসভা ভোটে বিজেপি এবং তৃণমূল রাজ্যে বিরোধী শক্তি হিসেবে উঠে এল এবং ৮টি আসন ছিনিয়ে নিল লাল পার্টির কাছ থেকে।
২০০০ সালের জুলাই মাসে পারিবারিক বন্ধুত্বের সূত্রে অটলবিহারী বাজপেয়ী এসেছিলেন মমতার ৩০বি হরিশ চ্যাটার্জি রোডের বাড়িতে। দেখা করেছিলেন মমতার মা গায়ত্রী দেবীর সঙ্গে। মমতার সঙ্গে তাঁর প্রগাঢ় সম্পর্কের মূল ভিতই ছিল কবিতা। দুজনেই কবি। পরে রাজনৈতিক বন্ধন ছিঁড়ে গেলেও বাজপেয়ীর মৃত্যুর দিন পর্যন্ত মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সঙ্গে ছিল অটুট সম্পর্ক। অসুস্থ থাকাকালীন এবং মৃত্যুর দিন মমতা নিরন্তর খোঁজ নিয়েছেন তাঁর বিষয়ে। মমতার রেলমন্ত্রী হিসেবে পদত্যাগের পর বাজপেয়ীর পাঠানো দূত সুধীন্দ্র কুলকার্নির পরামর্শ মানেননি মমতা। তহেলকা কেলেঙ্কারি এবং তৎকালীন প্রতিরক্ষামন্ত্রী জর্জ ফার্নান্ডেজের পদত্যাগের দাবিতে অনড় ছিলেন তৃণমূল নেত্রী। ২০০১ সালে ১৫ মার্চ ক্যাবিনেট থেকে ইস্তফা দেওয়ার দিনেও বাজপেয়ীকে মমতা 'দেশের নেতা' বলে বর্ণনা করেছিলেন।