
শেষ আপডেট: 23 January 2024 20:55
ভরদুপুরে ছাগল কোলে নিয়ে খোলা মাঠে রোদ পোহাচ্ছিলেন মানুষটি। মাজারের সামনে অপরিচিত লোকজন জড়ো হয়েছে দেখে উঠে এসে নিজেই পরিচয় দিয়ে বললেন, ‘আমার নাম মহম্মদ ইসলাম খান। এই মাজার আমি দেখভাল করি।’
মাজারের দু’পাশে খোলা মাঠ। বাঁদিকে জমির একটা অংশে সর্ষের ক্ষেত। ডান দিকের মাঠে এলাকার ছেলেরা ক্রিকেট খেলছে। খেলা থামিয়ে একজন ছুটে এসে বহিরাগতদের পরিচয় জেনে নিয়ে ফের গেল। ক’দিন ধরেই দেশ-বিদেশের সাংবাদিকেরা গ্রামে আসছেন। জানতে চাইছেন কবে শুরু হবে মসজিদ তৈরির কাজ। এ প্রশ্নের স্পষ্ট জবাব গ্রামবাসীদের জানা নেই।
মহম্মদ ইসলাম খান। পেশায় ক্ষেতমজুর এই ব্যক্তি মাজার দেখভাল করেন।
তবে তাঁরা শুনেছেন, সব কিছু ঠিকঠাক চললে আগামী মাস থেকে শুরু হওয়ার কথা নতুন মসজিদ তৈরির কাজ। মাঠের একপাশে স্টোনচিপস জমা হয়েছে। বাকি সামগ্রী এখনও আসেনি।
এলাকাটির নাম ধান্নিপুর। অযোধ্যা শহর থেকে তিরিশ-পঁয়ত্রিশ কিলোমিটার দূরের এই কৃষিপ্রধান জনপদের বাসিন্দাদের মধ্যে হিন্দু ও মুসলিমরা সংখ্যায় প্রায় সমান সমান। এখানেই রাজ্য সরকারের কৃষি খামারের পাঁচ একর জমি মসজিদ তৈরির জন্য বরাদ্দ করেছে যোগী আদিত্যনাথের সরকার।
অযোধ্যার মন্দির-মসজিদ বিবাদের মীমাংসা করে সুপ্রিম কোর্ট রায় দিয়েছিল ২০১৯-এর নয় নভেম্বর। বিতর্কিত জমি রামলালার জন্মস্থান বলে মেনে নিয়ে সেখানে রাম মন্দির তৈরির আর্জি মঞ্জুর করেছিল শীর্ষ আদালত। একই রায়ে বলা হয়েছিল বাবরির বিকল্প মসজিদ তৈরির জন্য মুসলিম পক্ষকে পাঁচ একর জমি দিতে হবে। জমি দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয় রাজ্য সরকারকে।
ধান্নিপুরে শাহগাদা শাহ মাজার। গ্রামবাসীদের বক্তব্য, মসজিদ তৈরির সময় মাজারের কোনও ক্ষতি তারা মানবে না।
সোমবার প্রধানমন্ত্রী অযোধ্যায় রাম মন্দিরের উদ্বোধন করেছেন। কিন্তু মসজিদ এখনও তিমিরেই। যদিও ২০২১-এর ২৬ জানুয়ারি প্রজাতন্ত্র দিবসে মসজিদের শিলান্যাস হয়ে গিয়েছে। সেই থেকে কখনও মসজিদের মডেল নিয়ে বিতর্ক তো কখনও টাকা-পয়সা নিয়ে সমস্যায় থমকে আছে ইট গাঁথার কাজ।
বছর পঞ্চাশের ইসলাম খান পেশায় কৃষি মজুর। সেই সঙ্গে দিনের অনেকটা সময় মাজার দেখভাল করেন। তাঁর কথায়, ‘গ্রামের হিন্দু-মুসলিম দুই সম্প্রদায়ের মানুষ মাজারে চাঁদর চড়ান। এপ্রিল মাসে উরস উৎসবে দুই দূর-দূরান্ত থেকে দুই সম্প্রদায়ের মানুষ শামিল হন। বসে কাওয়ালি গানের আসর।’
সোমবার গোটা গ্রাম টিভিতে রাম মন্দির উদ্বোধন অনুষ্ঠান দেখেছে। গ্রামের আর এক বাসিন্দা শাহবাজ খানের কথায়, ‘রাম মন্দির নিয়ে গ্রামে বিরূপ প্রতিক্রিয়ার প্রশ্নই ওঠে না। আগের ফৈজাবাদ কিংবা বর্তমান অযোধ্যায় অনেক কিছু আছে। কিন্তু যা নেই সেটা নিয়েই আমরা গর্ব করে থাকি—অযোধ্যায় হিন্দু-মুসলিম ভেদাভেদ বলে কিছু নেই।’
ইসলাম ও শাহবাজ খান, দু’জনেরই বক্তব্য, নতুন মসজিদ, যা বাবরির বিকল্প হিসাবে গড়ে ওঠার কথা সেটির ব্যাপারে কমিটিকে তাঁরা দুটি কথা সাফ জানিয়ে দিয়েছেন। এক. মসজিদ হোক ক্ষতি নেই, তার আগে গ্রামে আধুনিক স্কুল-কলেজ-হাসপাতাল চাই। দুই. মসজিদ তৈরি করতে গিয়ে শাহগাদ শাহ মাজারের কোনও ক্ষতি তাঁরা মানবেন না। কারণ, সাড়ে সাতশো বছরের পুরনো মাজারের সঙ্গে গ্রামের সব ধর্মের মানুষের আত্মীক ও মানসিক যোগ রয়েছে।
ইসলাম খানের কথায়, ‘ধান্নিপুর গ্রামে মসজিদ আছে। আশপাশের গ্রামেও আছে। নামাজ পড়া নিয়ে এ গ্রামে কোনও সমস্যা নেই। তাছাড়া, নামাজের জন্য মসজিদে যাওয়া বাধ্যতামূলক নয়। কিন্তু স্কুল-কলেজ-হাসপাতাল না হলে চলে না। সন্তানের শিক্ষা কোন বাবা-মা না চায়! আর অসুখ-বিসুখ হলে অযোধ্যা শহরে ছুটতে হয়।’
অযোধ্যায় যে জমিতে রাম মন্দির তৈরি হয়েছে, সেখানেই ছিল বাবরি মসজিদ, যা হিন্দু করসেবকেরা ভেঙে ফেলে। পরিবর্তে কোর্টের নির্দেশে ধান্নিপুরে যে বিকল্প মসজিদ তৈরি হবে সেটির নাম বাবরি রাখা হোক চান না স্থানীয় মানুষ। গ্রামের ভিতরে স্থানীয় মসজিদের সামনে রোদ পোহাচ্ছিলেন কয়েকজন। তাঁদের কথায়, বাবরি নামে ফের বিতর্ক দেখা দিতে পারে। মসজিদের নাম বাবরিই রাখতে হবে এমন কোনও বাধ্যবাধকতা নেই।
মসজিদ তৈরির দায়িত্বে আছে ইন্দো-ইসলামিক কালচারাল ফাউন্ডেশন অ্যান্ড অযোধ্যা মস্ক ট্রাস্ট। মাজারের গায়ে এক জায়গায় সাঁটা আছে প্রস্তাবিত মসজিদের পরিবর্তিত মডেলের ছবির পোস্টার। ট্রাস্টের সভাপতি জাফর আহমেদ ফারুরি গত মাসে ‘দ্য ওয়াল’কে টেলিফোনে জানিয়েছিলেন ফেব্রুয়ারিতে মসজিদ নির্মাণের কাজ শুরু হবে। অর্থ সংগ্রহের কাজ এখনও চলছে।’
এই মসজিদ নির্মাণে সুপ্রিম কোর্ট অযোধ্যা শহরেই জমি বরাদ্দের নির্দেশ দিলেও প্রশাসন তা মানেনি। ধান্নিপুর বর্তমান অযোধ্যা জেলার অংশ হলেও শহরের মধ্যে নয়। মুসলিম পক্ষ এ নিয়ে বিবাদে জড়ায়নি।
অযোধ্যায় যখন রাম মন্দিরের উদ্বোধন হয়ে গেল তখন মসজিদের জন্য একটি ইটও গাঁথা যায়নি কেন? ইন্দো-ইসলামিক কালচারাল ফাউন্ডেশন অফ অযোধ্যা মস্ক ট্রাস্টের সম্পাদক আতাহার হুসেন দ্য ওয়াল’কে জানিয়েছিলেন, ‘বিলম্বের কারণ হল, মসজিদের ডিজাইন পুরোপরি বদলে ফেলা হয়েছে। মসজিদের সঙ্গেই থাকবে একটি হাসপাতাল, গবেষণাকেন্দ্র, লাইব্রেরি, গবেষকদের হস্টেল ইত্যাদি। ফাউন্ডেশনের বক্তব্য, নতুন মসজিদ হবে দেশের মধ্যে বৃহত্তম। নয় হাজার মানুষ একত্রে প্রার্থনা করতে পারবেন।
প্রস্তাবিত মসজিদের নাম নিয়ে ফারুকি বলেছিলেন, ‘আমরা কোনও বিতর্ক চাই না। নতুন মসজিদের নামের সঙ্গে বাবরি শব্দটি থাকবে না। সকলের কাছে গ্রহণযোগ্য করতেই মসজিদের নাম রাখা হবে ইসলামের নবি মহম্মদের নামে।’
ট্রাস্টের এক কর্তা আরও বলেন, রাম মন্দির তৈরির জন্য হিন্দুদের সংগঠনগুলি তিরিশ-পঁয়ত্রিশ বছর যাবৎ অর্থ সংগ্রহ করছে। আমরা সেই কাজ শুরু করেছি সুপ্রিম কোর্টের রায় প্রকাশের পর। ফলে অর্থ সংগ্রহে সময় দরকার।
ট্রাস্ট আরও এক সিদ্ধান্ত করে রেখেছে। রাম মন্দির উদ্বোধন করেছেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী। অন্যদিকে, ধান্নিপুরে প্রস্তাবিত মসজিদ নিয়ে ট্রাস্ট সিদ্ধান্ত করেছে, মসজিদ যেদিনই তৈরি হোক, উদ্বোধন অনুষ্ঠানে কোনও রাজনীতিককে ডাকা হবে না। মক্কার প্রধান ইমামকে এ জন্য আমন্ত্রণ জানানো হতে পারে।