
শেষ আপডেট: 27 July 2023 08:35
দ্য ওয়াল ব্যুরো: সাদামাটা জীবনযাত্রার জন্য বরাবরই প্রশংসিত তিনি। সংবাদমাধ্যমের শিরোনামেও এসেছেন বহুবার। কিন্তু এই সাদামাটা জীবনই তাঁকে ইদানীং ট্রোলের (Sudha Murthy Trolled) মুখে ফেলছে বারবার। সম্প্রতি সুধা মূর্তি মন্তব্য করেছিলেন, নিরামিষাশী হওয়ায় বাইরে কোথাও ঘুরতে গেলে তিনি হয় খাঁটি নিরামিষ রেস্তোরাঁয় খেতে যান, অথবা নিজের হাতে খাবার বানিয়ে খান। কারণ তিনি ভয় পান, অন্য কোথাও খেলে হয়তো যে চামচ দিয়ে আমিষ খাবার পরিবেশন করা হয়েছে, সেই চামচ দিয়েই তাঁকে নিরামিষ খাবার পরিবেশন করা হবে। সেই ঘটনা সামনে আসার পর থেকেই ভারতের অন্যতম ধনী মানুষ সুধাকে নিয়ে শুরু হয়েছে ট্রোলিং, সমালোচনা। এমনকী, টুইটারেও ট্রেন্ডিং হয়ে উঠেছেন তিনি।
এরই মধ্যে এক টুইটার ব্যবহারকারী সুধা মূর্তিকে কটাক্ষ করেছেন তাঁর শাড়ি নিয়ে। 'ড্রাঙ্ক জার্নালিস্ট' নামের ওই টুইটার হ্যন্ডেল থেকে সুধা মূর্তির একটি ছবি পোস্ট করা হয়েছে, যাতে তিনি একটি সবুজ রঙের সিল্ক শাড়ি পরে রয়েছেন। ক্যাপশনে ওই ব্যক্তি লিখেছেন, যে এই সিল্কের শাড়িগুলি কী দিয়ে তৈরি করা হয়, তা সুধা মূর্তি জানেন কিনা!
সমালোচনাকারী ইঙ্গিত করতে চেয়েছেন, সিল্কের শাড়ির যে সুতো, তা রেশমকীটের লালা থেকেই তৈরি হয়। ফলে সেই শাড়ি আর 'নিরামিষ' রইল না আক্ষরিক অর্থে। তাই সেটা মনে করিয়ে তিনি সুধা মূর্তিকে খোঁচা দিতে চেয়েছেন, যিনি নিজের নিরামিষ খাওয়া নিয়ে এত সচেতন তিনি এমন 'আমিষ' শাড়ি কী করে পরছেন!
সম্প্রতি ইউটিউব সিরিজ ‘খানে মে কেয়া হ্যায়’-এর একটি এপিসোডে দেখা গিয়েছিল ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী ঋষি সুনকের শাশুড়ি তথা লেখিকা, জনহিতৈষী সুধা মূর্তিকে। সেখানেই সুধা জানান, কাজের ব্যাপারে তিনি যতটা পরীক্ষা-নিরীক্ষা করতে পছন্দ করেন, খাবারের ব্যাপারে তা একেবারে উল্টো। সেখানে একেবারেই ‘অ্যাডভেঞ্চারাস’ নন তিনি। মাছ মাংস তো দূর, ডিম কিংবা রসুনও খান না সুধা। একজন নিরামিশাষী হিসেবে তিনি সবসময়ই ভয়ে ভয়ে থাকেন, আমিষ খাবারের সঙ্গে তাঁর খাবার যেন ছোঁয়াছুঁয়ি না হয়ে যায়। এমনকী, বাইরে কোথাও ঘুরতে গেলেও নিরামিষ রেস্তোরাঁ ছাড়া তিনি খাবার খান না। ভারত থেকে বিদেশে যাওয়ার সময় সঙ্গে সবসময় চিঁড়ের মতো ‘রেডি টু ইট’ খাবার রাখেন তিনি, যেগুলো শুকনো কিংবা চটজলদি জলে মিশিয়ে খাওয়া যায়। তিনি আরও জানান, বাইরে খাওয়ার ক্ষেত্রে তাঁর সবচেয়ে বড় ভয় হল, যদি তাঁকে আমিষ খাওয়ার চামচ দিয়েই খাবার পরিবেশন করা হয়!
তাঁর সেই বক্তব্যকে ঘিরেই তৈরি হয়েছে বিতর্ক। সোশ্যাল মিডিয়া এখন তাঁর খাদ্যাভ্যাস নিয়ে দু'ভাগে বিভক্ত হয়ে গেছে। নেটিজেনদের একাংশ সুধাকেই সমর্থন জানিয়েছেন। তাঁদের দাবি, খাদ্যাভ্যাস একান্ত ব্যক্তিগত ব্যাপার। তাই সুধা যদি খাবার সঙ্গে নিয়ে যান, বা বাইরের খাবার না খান, তাতে দোষের কিছু নেই।
এবার সেই প্রসঙ্গে টুইটার ব্যবহারকারী 'ড্রাঙ্ক জার্নালিস্ট'-এর মন্তব্যও অনেকেই ভালভাবে নেননি। তাঁকে কটাক্ষ করে অনেকেই মনে করিয়ে দেন, সুধা মূর্তি ওই শাড়ি মোটেই খাচ্ছেন না। কেউ আবার বলেছেন, নিরামিষাশীদের নিয়ে আমিষভোজীদের এত মন্তব্য করারই দরকার নেই। এতে আবার ট্রোলারদের একাংশ মনে করিয়ে দিয়েছেন, সুধা মূর্তি তো চামচও খান না। তাহলে আমিষ-নিরামিষ চামচ নিয়ে তাঁর ছুঁতমার্গ কেন!
কেউ আবার নিজের মতামত জানিয়ে লিখেছেন, 'আমিও কখনও এমন জায়গায় খাব না যেখানে পর্ক রান্না হয়। আমি জানি না কেন লোকজন সুধা মূর্তির চামচ নিয়ে এত খেপে উঠেছে।' কেউ আবার বলেছেন, 'এই যুক্তিতে তো একজন নিরামিষাশী চামড়ার ব্যাগ, বেল্ট, জুতোও ব্যবহার করতে পারবেন না। অপর এক টুইটারিয়ানের বক্তব্য, 'আমি প্রায় প্রতিদিনই মাংস খাই, কিন্তু যদি কোনও নিরামিষ পরিবারের অতিথি আমার বাসনপত্র ব্যবহার করতে পছন্দ না করে, তবে আমি ব্যক্তিগতভাবে তাঁকে সম্মান করব।'
তবে এই প্রথম নয়। এর আগেও মাস দুয়েক আগে জনপ্রিয় কমেডি শো ‘দ্য কপিল শর্মা শো-তে এসেছিলেন সুধা। সেখানেই তিনি ছাপোষা জীবনযাপনের কারণে বিভিন্ন অদ্ভুত ঘটনার সম্মুখীন হওয়ার অভিজ্ঞতা শেয়ার করেন। সুধা জানান, লন্ডনে যখন একটি ফর্মে নিজের ঠিকানা ১০, ডাউনিং স্ট্রিট (ব্রিটেনের প্রধানমন্ত্রীর ঋষি সুনক অর্থাৎ সুধা মূর্তির জামাইয়ের বাসভবন) লিখেছিলেন, তখন হতবাক হয়ে গিয়েছিলেন ইমিগ্রেশন অফিসার। সুধাকে তিনি জিজ্ঞেস করেছিলেন, ‘আপনি কি মজা করছেন?’ আসলে সুধার পোশাক, এবং ‘ডাউন-টু-আর্থ’ ব্যবহার দেখে ওই আধিকারিক কল্পনাও করতে পারেননি, সুধা আসলে কে।
কপিল শর্মা শো-তে এই ধরনের আরও একাধিক অভিজ্ঞতার কথা শেয়ার করেছেন সুধা মূর্তি। একবার নাকি লন্ডনের হিথরো বিমানবন্দরে দুই মহিলা তাঁকে ব্যঙ্গ করে ‘বেহেনজি’ বলে ডেকেছিলেন। ‘সালোয়ার কামিজ পরে হাতে বিজনেস ক্লাসের টিকিট নিয়ে আমি লাইনে দাঁড়িয়ে ছিলাম। সেই সময় দুজন সহযাত্রী আমাকে ‘বেহেনজি’ বলে ডাকেন, কারণ আমি সালোয়ার কামিজ পরেছিলাম। ওদের ধারণা, কেউ শাড়ি কিংবা সালোয়ার কামিজ পড়লেই সে বেহেনজি কিংবা দিদি হয়ে যায়,’ জানিয়েছেন সুধা।
যে সাধারণ জীবনযাত্রার জন্য অনেকের কাছে সম্ভ্রমের পাত্রী সুধা, সেই ছিমছাম জীবনযাপনের জন্যই সেদিনের পর থেকে নেটিজেনদের ঠাট্টা-ট্রোলিংয়ের শিকার হচ্ছেন নারায়ণ-ঘরণী। সোশ্যাল মিডিয়া ব্যাঙ্গাত্মক মিম এবং পোস্টে ভরে উঠেছে। তবে নেটিজেনদের অনেকেই ট্রোলারদের বিপক্ষে গিয়ে সুধার পাশে দাঁড়িয়েছেন। তাঁদের বক্তব্য, প্রত্যেক মানুষেরই জীবনকে নিজের মতো করে দেখার অধিকার রয়েছে। সুধা মূর্তির মতো বিত্তশালী এবং ক্ষমতাশালী একজন মানুষ যদি সাধারণ মানুষের মতো জীবনযাপন বেছে নেন, তাহলে তা নিয়ে বিদ্রূপ করা অন্যায় বলেই তাঁদের অভিমত।
প্রসঙ্গত, ইনফোসিস প্রতিষ্ঠাতার স্ত্রীর এই সাদামাটাভাবে জীবন কাটানো যে শুধুই কথার কথা নয়, বরং তা অক্ষরে অক্ষরে সত্যি তার প্রমাণ মিলেছে আগেও। এর আগে পোঙ্গল উৎসবের সময় পদ্মশ্রী এবং পদ্মভূষণপ্রাপ্ত সুধাকে দেখা গিয়েছিল, কেরলের তিরুঅনন্তপুরমের আট্টুকাল ভগবতী মন্দিরের মেঝেতে বসে ভোগ রান্না করছেন তিনি। সাদা শাড়ি, কালো ব্লাউজ, মুখে অমলিন হাসি-সুধার সেই রান্নার ছবি প্রশংসা কুড়িয়েছিল নেটিজেনদের।