সোমবার দুপুরে এক অদ্ভুত দৃশ্য দেখা যায় মহকুমা শাসকের দফতরের সামনে। গায়ে যাবতীয় পরিচয়পত্রের প্রতিলিপি সেঁটে সেখানে হাজির হন ছ’জন। তাঁরা সকলেই আরামবাগ পুরসভার ৬ নম্বর ওয়ার্ডের বাসিন্দা।

প্রতীকী ছবি
শেষ আপডেট: 13 April 2026 19:09
দ্য ওয়াল ব্যুরো: রাজ্যের বিধানসভা ভোটের (West Bengal Assembly Election 2026) মধ্যে ভোটার তালিকা থেকে নাম বাদ যাওয়ার আতঙ্ক কোন চরম পর্যায়ে পৌঁছতে পারে, তার সাক্ষী থাকল পশ্চিমবঙ্গ (West Bengal SIR)। হুগলি জেলার আরামবাগে এসআইআর (SIR) প্রক্রিয়ায় নাম কাটা যাওয়ায় ‘ডিটেনশন ক্যাম্প’-এর (Detention Camp) আশঙ্কায় ভুগছেন সাধারণ মানুষ। আর সেই ভয় থেকেই সোমবার দুপুরে আরামবাগ মহকুমা শাসকের দফতরে গিয়ে দেশের রাষ্ট্রপতির কাছে ‘স্বেচ্ছামৃত্যু’র (Euthanasia) আবেদন জানালেন ছ’জন বাসিন্দা। তাঁদের এই নজিরবিহীন পদক্ষেপ ঘিরে শোরগোল পড়ে গিয়েছে রাজ্য রাজনীতিতে।
সোমবার দুপুরে এক অদ্ভুত দৃশ্য দেখা যায় মহকুমা শাসকের দফতরের সামনে। গায়ে যাবতীয় পরিচয়পত্রের প্রতিলিপি সেঁটে সেখানে হাজির হন ছ’জন। তাঁরা সকলেই আরামবাগ পুরসভার ৬ নম্বর ওয়ার্ডের বাসিন্দা। সূত্রের খবর, ওই একটি ওয়ার্ড থেকেই এসআইআর-এর ধাক্কায় ২০৬ জনের নাম ভোটার তালিকা থেকে বাদ পড়েছে। আবেদনকারীদের দাবি, তাঁরা এই দেশেরই ভূমিপুত্র। কিন্তু ভোটার তালিকা থেকে নাম মুছে যাওয়ায় তাঁরা আজ ভিটেমাটি হারানোর আতঙ্কে দিন কাটাচ্ছেন।
আবেদনকারীদের বয়ানে উঠে এসেছে এক গভীর যন্ত্রণা। তাঁরা জানান, “আমরা স্বাধীন ভারতে জন্মেছি, বড় হয়েছি। কিন্তু ভোটার তালিকা থেকে নাম বাদ যাওয়ার পর মনে হচ্ছে আমরা যেন নতুন করে পরাধীন হয়ে পড়েছি।” তাঁদের আশঙ্কা, নাম না থাকায় এবার তাঁদের ডিটেনশন ক্যাম্পে পাঠিয়ে দেবে। তাঁদের সাফ কথা - “ডিটেনশন ক্যাম্পে গিয়ে পশুর মতো জীবন কাটানোর চেয়ে স্বেচ্ছামৃত্যুই শ্রেয়। তাই রাষ্ট্রপতির কাছে আমাদের আবেদন, আমাদের মরে যাওয়ার অনুমতি দেওয়া হোক।”
রাজ্যের এসআইআর প্রক্রিয়ার পরিসংখ্যান অনুযায়ী, সব মিলিয়ে এ পর্যন্ত ৯০ লক্ষ ৮৩ হাজার ৩৪৫ জনের নাম তালিকা থেকে মুছে ফেলা হয়েছে। কমিশনের তথ্য বলছে, খসড়া তালিকা থেকে শুরু করে চূড়ান্ত তালিকা প্রকাশ হওয়া পর্যন্ত ধাপে ধাপে এই বিপুল পরিমাণ ভোটারের নাম ছাঁটাই করা হয়েছে। বিশেষ করে ‘বিবেচনাধীন’ বা ‘আন্ডার অ্যাডজুডিকেশন’ তালিকায় থাকা ৬০ লক্ষ মানুষের মধ্যে ২৭ লক্ষেরই নাম শেষ পর্যন্ত বাতিল হয়ে যাওয়ায় আতঙ্ক ছড়িয়েছে সাধারণ মানুষের মধ্যে।
এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে শুরু হয়েছে রাজনৈতিক দড়ি টানাটানি। তৃণমূলের পক্ষ থেকে এই ঘটনার জন্য সরাসরি বিজেপি ও নির্বাচন কমিশনকে দায়ী করা হয়েছে। তাদের দাবি, সাধারণ মানুষের মনে এনআরসি বা ডিটেনশন ক্যাম্পের জুজু ঢুকিয়ে দেওয়া হয়েছে। অন্যদিকে, পাল্টা সুর চড়িয়েছে বিজেপিও। গেরুয়া শিবিরের দাবি, তৃণমূল ইচ্ছাকৃতভাবে সাধারণ মানুষের মধ্যে ভয়ের পরিবেশ তৈরি করছে। মৃতু্য়ুর আবেদন করিয়ে ভোটের মুখে নোংরা রাজনীতি করতে চাইছে শাসক দল।
ভোটের আগে যেখানে উন্নয়নের কথা হওয়ার কথা ছিল, সেখানে ভোটার তালিকা থেকে নাম বাদ যাওয়ায় মানুষের ‘স্বেচ্ছামৃত্যু’র আবেদন গণতন্ত্রের এক করুণ ছবিই তুলে ধরল। এখন প্রশ্ন উঠছে, এই ৯১ লক্ষ মানুষের নাগরিকত্ব ও ভবিষ্যৎ নিয়ে ধোঁয়াশা কাটবে কবে? কোনও দল কি পারবে এই সাধারণ মানুষদের মনে জমে থাকা ‘ডিটেনশন ক্যাম্প’-এর আতঙ্ক দূর করতে?