গ্রাম্য, বাংলা-জারিত ইংরেজি অথচ অকপট ও আত্মবিশ্বাসী উচ্চারণে পূজা শেয়ার করেন ভিডিও। মূলত বিদেশি সমান্তরাল ছায়াছবির উল্লেখে মেলে ধরেন নিজের ভাললাগা-টুকু৷ কোথাও মেধাবী বিশ্লেষণ নেই৷ নেই এডিটিং, কালার গ্রেডিং নিয়ে তীক্ষ্ম সমালোচনা। বদলে রয়েছে স্নিগ্ধ-মায়াবী স্বীকারোক্তি, সৎ-সাহসি উচ্চারণ।

গ্রাফিক্স: দিব্যেন্দু দাস
শেষ আপডেট: 5 February 2026 14:39
লেখাটার বিকল্প শিরোনাম হতে পারত ‘যিনি আনাজ কাটেন, তিনি খালেদ হুসেইনিও পড়েন’। তুলনা-প্রতিতুলনার এক অদ্ভুতকিমাকার ম্যাট্রিক্স সমাজ যেভাবে চাপিয়ে দিয়েছে, তাকে ভেঙে খানখান করছেন পূজা। মেদিনীপুরের এক প্রান্তিক গ্রামের ছাপোষা গৃহিণী পূজারিণী প্রধান (Pujarini Pradhan)। ইনস্টাগ্রামের জনতা তাঁকে চেনেন ‘লাইফ অফ পূজা’ (Life of Puja) এবং ‘লিটল অর্ডিনারি থিংস’ (Little Ordinary Things) পেজের দৌলতে। যেখানে গ্রাম্য, বাংলা-জারিত ইংরেজি অথচ অকপট ও আত্মবিশ্বাসী উচ্চারণে পূজা শেয়ার করেন ভিডিও। মূলত বিদেশি সমান্তরাল ছায়াছবির উল্লেখে মেলে ধরেন নিজের ভাললাগা-টুকু৷ কোথাও মেধাবী বিশ্লেষণ নেই৷ নেই এডিটিং, কালার গ্রেডিং নিয়ে তীক্ষ্ম সমালোচনা। বদলে রয়েছে স্নিগ্ধ-মায়াবী স্বীকারোক্তি, সৎ-সাহসি উচ্চারণ।
কে নেই পূজারিণীর লিস্টে! মার্টিন স্করসেসি (Martin Scorsese) থেকে আন্দ্রেই তার্কভ্স্কি (Andrei Tarkovsky), কিম কি-ডুক (Kim Ki-duk) থেকে কেনজি মিজোগুচি (Kenji Mizoguchi)—একের পর এক প্রসিদ্ধ পরিচালকের ফিল্ম গোগ্রাসে দেখেন তিনি৷ তারপর আচ্ছন্ন মাদকতার কথা পেশ করেন দর্শকদের দরবারে। বাংলা নয়, বিষয় যেহেতু আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র, তাই বেছে নিয়েছেন ইংরেজিকেই, ভিডিও পরিবেশনার মাধ্যম হিসেবে।
প্রথম যখন পূজার ভিডিও দেখেছিলাম, মিথ্যে বলব না, ধাক্কা লেগেছিল৷ ধাক্কাটা বোধে, চেতনায়। ‘সিনেফাইল’, ‘বিবলিওফাইলে’র মতো ট্যাগলাইনের সঙ্গে একমাত্র সমাজের উচ্চকোটির জনতার যে-জন্মপ্রদত্ত, অশ্লীল এবং এক অর্থে অসংগত সংযোগ—তাকে প্রশ্নের মুখে ঠেলে দিয়েছেন পূজা। যিনি ঠাটবাট জানেন না। যিনি পাঁচতারা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়েননি। যিনি সুরাপাত্র হাতে, ধুম্রউদ্গীরণ সহযোগে ভাব-বিগলিত, অঙ্গভঙ্গি-চর্চিত, গোদারের ছবি সুশোভিত দেয়ালের সামনে দাঁড়িয়ে ‘গুডফেলাস’ বনাম ‘গডফাদারে’র বাইনারি, আল পাচিনো (Al Pacino) বনাম রবার্ট ডি নিরো-র (Robert De Niro) ভাল-মন্দ বিচার করতে শেখেননি। বদলে একফালি ঘরে, তেলচিটে পর্দা, পেঁয়াজের খোসা উঁকি মারছে কি মারছে না—সে সবের তোয়াক্কা না করে গোটা গোটা, গোদা গোদা ও প্রবলভাবে লোকায়ত বাংলা-প্রভাবিত ইংরেজিতে এটুকু বলতে চান: তিনি মার্টিন স্করসেসি-র ভক্ত। জানাতে চান: মার্কিন পরিচালকের সমস্ত সিনেমা দেখেছেন৷ কিন্তু সবচেয়ে পছন্দের যে-ছায়াছবি, তার নাম ‘দ্য কিং অফ কমেডি’ (The King of Comedy)। স্করসেসির সবচেয়ে সফল ও প্রসিদ্ধ সৃষ্টি না হয়েও এই ছায়াছবি যেভাবে ব্যাকরণ ভেঙেছে—এক সহৃদয়, সংবেদী দর্শকের এই বিস্ময়টুকু অনর্গল কয়েক মিনিটের ভিডিওতে গুছিয়ে বলে দেন পূজা। গভীর বিশ্লেষণ নয়, তাঁর ইউএসপি সারল্য, অকপটতা এবং অতি অবশ্যই সততা!
প্রথমবার দেখছেন যাঁরা, তাঁদের অনেকেই প্রথম ঝলকে পূজারিণীর ভিডিওগুলোকে ‘কিচেন রিল’ বলে হালকা করে দিতে পারেন। কিন্তু কয়েক সেকেন্ড বাদে বোঝা যায়—এই রান্নাঘর কোনও সেট নয়, এই আলো নয় কোনও রিং লাইট, এই শব্দ কোনও ল্যাভালিয়ের মাইকে ধরা নয়… বরং, এই কনটেন্ট তৈরি হয় কাজের ফাঁকে। বঁটি-চালানো হাত বন্ধ হয় না, বাসনকোসনের ঠোকাঠুকির আওয়াজ থামে না। থমকে যায় না কথাও।
তিনি বলেন কিতানোর (Takeshi Kitano) সিনেমার কথা। পরমুহূর্তে বইয়ের নাম—‘আ থাউজ্যান্ড স্প্লেনডিড সানস’ (A Thousand Splendid Suns)। পূজা কোথাও শিক্ষক নন, প্রভাবক নন। তিনি কেবল ভাগ করে নেন। আর এই ভাগ করে নেওয়ার মধ্যেই লুকিয়ে এক সামাজিক সত্য। আমাদের ফিডে প্রতিদিন যে ‘নিখুঁত নারী’র ছবি ভাসে—সাজানো রান্নাঘর, ‘মর্নিং রুটিন’ আর ‘নাইট স্কিনকেয়ারে’ বিশুদ্ধ-বনেদী—তার সঙ্গে পূজার কোনও মিল নেই। তবু তাঁর দিকে তাকিয়ে থাকতে, তাঁর কথা শুনতে ইচ্ছে করে। কারণ তিনি আমাদের চিরপরিচিত… আমাদের পাশের বাড়ির স্নেহপ্রবণ বউদি। তিনি বলেন, কোভিড তাঁর পড়াশোনার স্বপ্ন কীভাবে কেড়ে নিয়েছে। গ্রামের অনেক মেয়ের মতো তাকেও বিয়ে করতে হয়েছিল খুবই অল্প বয়সে। তবু নতুন সংসারে এসেছে গুছিয়ে নিয়েছেন। যেভাবে জীবন সাজাতে চেয়েছেন, পেয়েছেন সমস্ত সুযোগ। স্বামী কিংবা শাশুড়ি—বাধা দেননি কেউ-ই! এই স্বীকারোক্তি—না অতিনাটকীয়, না অতিরঞ্জিত… বরং, সরল, সোজা, সহজ!
তবু পূজার স্বপ্ন শুনলে আজও অবাক লাগতে পারে অনেকের। তিনি জমি কিনতে চান। নিজের ঘর বানাতে চান। জন্মসূত্রে অর্জিত নয়, বিয়ের সূত্রে পাওয়া নয়—‘নিজের’ ঘর। বলেন, মেয়েদের আসলে কখনও নিজের বাড়ি হয় না। বাবার বাড়ি ‘নিজের’ নয়। শ্বশুরবাড়িও ‘নিজের’ নয়! কী ভয়ংকর রাজনৈতিক এই কথা। কী নির্ভেজাল সত্যকথন! কোনও স্লোগান ছাড়া, তত্ত্ব ছাড়া… শুধু অভিজ্ঞতা। অথচ কী অন্তর্ভেদী!
পূজার লক্ষ্য, বেশি আয় হলে ছেলের জন্য সঞ্চয় করবেন। বই কিনবেন। আঁকা শিখবেন। স্বপ্নগুলো সাধারণ। ব্যাকড্রপে খসে পড়া দেয়ালের মতো, শাড়ির ফিকে রংয়ের মতো, কোমরে গোঁজা আঁচলের মতো সাধারণ। পূজারিণী দেখান না কীভাবে প্যান্ট্রি রিস্টক করতে হয়, কোন প্রসিদ্ধ রেস্তোরাঁ আজও ‘হিডেন জেম’! পূজারিণী স্রেফ নিজের জন্য ভিডিও বানান। একদিন কথার ফাঁকে বলেই দিয়েছিলেন—জীবনের এই পর্যায়টা তাঁর ভাল লাগছে। কিন্তু প্রতিদিন ভ্লগ করাটা নাপসন্দ। সবকিছু রেকর্ড করলে বাস্তবের সঙ্গে যোগাযোগ হারিয়ে যাবে। তার চেয়ে সিনেমা দেখাই ভাল। এই নির্ভার কথাটুকু সবচেয়ে সুন্দর। ডিজিটাল উন্মাদনার মধ্যে দাঁড়িয়ে একজন নারী সোচ্চারে জানাচ্ছেন—আমি একটু থামতে চাই!
ধীরে ধীরে নিজের পরিসর ছড়িয়ে দিয়েছেন পূজারিণী৷ আওয়াজ তুলেছেন গ্রামের স্কুলে দেওয়া মিড ডে মিলের গুণমান নিয়ে। গার্হস্থ্য হিংসা, মেয়েদের পোশাক নিয়ে তালিবানি ফতোয়া, স্বামীর সঙ্গে রুচির মিল-অমিল—সবই এসেছে ভিডিও রিলের উপাত্ত হিসেবে। পলিটিক্যাল কারেক্টনেসের ধার না ধেরে নিজের বক্তব্যে, যুক্তিতে ঋজু থেকেছেন৷ কমেন্ট বক্সে ট্রোলের বন্যা বইলেও জিনস পরেছেন প্রথমবারের মতো। রক্ষণশীল গ্রামের গৃহবধূর পরনে জিনস এল কী করে? খানিক বেমানান-কিম্ভূত লাগছে না কি?—অস্বস্তিটুকু সমেত বানিয়েছেন রিল। ওভারস্মার্টনেসে ঝাঁঝালো দুনিয়ায় এই হিমেল থমকে যাওয়াটুকু, ব্রীড়ানতা পূজার সলজ্জ চাহনিটুকু এক আঁজলা উতল হাওয়া হয়ে আমাদের ফিডে, অ্যালগরিদমে ছড়িয়ে পড়ে।