
শেষ আপডেট: 30 December 2023 21:01
দ্য ওয়াল ব্যুরো: পশ্চিমবঙ্গের মানুষ একসময় চিকিৎসা বা জটিল অপারেশনের জন্য দক্ষিণ ভারতে ভিড় জমাতেন। কিন্তু সময় যত এগিয়েছে ততই বাংলার স্বাস্থ্য পরিকাঠামো উন্নত হয়েছে। বিশেষ করে এখন সরকারি হাসপাতালগুলোও জটিল থেকে জটিলতর অপারেশন করে সঙ্কটাপন্ন রোগীর প্রাণ বাঁচাচ্ছে। ভুঁইফোঁড় নার্সিংহোমগুলোর থেকে অনেক কম খরচে বা বিনামূল্যে সরকারি হাসপাতালে ভাল চিকিৎসা পরিষেবা পাওয়া যাচ্ছে। ইদানীং কালে শুধু কলকাতা নয়, জেলার বিভিন্ন সরকারি হাসপাতালেও এমন সব অপারেশন হয়েছে যা শহরের বড় নার্সিংহোম বা বেসরকারি হাসপাতালগুলিতে হয়ে থাকে। ফুসফুস প্রতিস্থাপন থেকে ভ্যাজাইনোপ্লাস্টি, অথবা এক্টোপিক প্রেগন্যান্সির মতো জটিল অপারেশনও নিখুঁতভাবে করেছেন সরকারি হাসপাতালের অভিজ্ঞ ডাক্তারবাবুরা।
কলকাতা মেডিক্যাল কলেজ থেকে এনআরএস, আরজি কর হাসপাতাল, আসানসোল জেলা হাসপাতাল থেকে পুরুলিয়া হাসপাতাল, রানাঘাট মহকুমা হাসপাতালে বিরল রোগের চিকিৎসা হয়েছে। জটিল অপারেশনে প্রাণ বেঁচেছে মুমূর্ষু রোগীর।
দেখে নেওয়া যাক চলতি বছরে রাজ্যের সরকারি হাসপাতালগুলিতে কী কী বিরল রোগের চিকিৎসা ও অপারেশন হয়েছে—
অসাধ্য সাধন কলকাতা মেডিক্যালের
ছাদে জামাকাপড় মেলতে গিয়ে শরীর ফুঁড়ে ঢুকে গিয়েছিল লোহার রড। বাম হাতের তলা দিয়ে ঢুকে ৫৫ বছরের প্রৌঢ়ার শরীর ভেদ করে ডান কাঁধ দিয়ে বেরিয়ে গিয়েছিল সেই রড। বাঁচার আশা প্রায় ছিল না বললেই চলে। সেখানেই অসাধ্য সাধন করেছে কলকাতা মেডিকেল কলেজ। অপারেশন করে সেই রড বের করেছে নিরাপদে। বেঁচে ফিরেছেন প্রৌঢ়া।
শিশুর কপাল থেকে কাঁচি বের করল এসএসকেএম
বছর দুয়েকের শিশুর চোখ ও কপালের মাঝে গেঁথে গিয়ছিল কাঁচি। প্রচণ্ড রক্তক্ষরণ হচ্ছিল শিশুটির। খুলি কেটে বাচ্চাটির চোখ ও কপালের মাঝখান থেকে বিঁধে থাকা কাঁচিটি বের করেন ডাক্তারবাবুরা। প্রাণ বাঁচে শিশুটির।
গলা থেকে ভেটকির কাঁটা বের করল এসএসকেএম
১৬ দিন ধরে গলায় বিঁধেছিল ভেটকি মাছের কাঁটা। ৩ ইঞ্চি কাঁটাটি খাদ্যনালি ফুঁড়ে গলার মাংসপেশিতে বিঁধে গিয়েছিল। খাবার গেলা তো দূর, কথাও বলতে পারছিলেন না প্রৌঢ়া। গলায় দগদগে ক্ষত হতে শুরু করেছিল। ভোকাল কর্ড বাঁচিয়ে সেই কাঁটাটি নিরাপদে বের করে আনেন এসএসকেএমের ইএনটি বিভাগের অভিজ্ঞ চিকিৎসকরা।
পেটের টিউমার বের করে গর্ভবতীর প্রাণ বাঁচাল ক্যানিং হাসপাতাল
জরায়ুতে বাড়ছিল যমজ সন্তান। পাশাপাশি পেটে বাড়তে শুরু করেছিল বিশালাকার টিউমার। পেটের ভেতরে রক্তক্ষরণ শুরু হয়ে গিয়েছিল প্রসূতির। এমন অবস্থায় টিউমার সার্জারি করতে গেলে জরায়ুর ক্ষতি হওয়ার সম্ভাবনা থাকে। প্রসূতির প্রাণ সংশয়ের ঝুঁকিও থাকে। সেখানেই অসাধ্য সাধন করে কলকাতার এসএসকেএম হাসপাতাল। জরায়ু বাঁচিয়ে নিরাপদে পেট থেকে প্রায় ২ কেজি ওজনের টিউমার বের করে গর্ভবতীর প্রাণ বাঁচায়।
গর্ভপাত ঠেকিয়ে প্রসব করাল শান্তিপুর স্টেট জেনারেল হাসপাতাল
কখনও দু’মাস, কখনও পাঁচ মাসের গর্ভাবস্থায় গর্ভপাত হয়ে যাচ্ছিল তরুণীর। পরপর চারবার গর্ভপাত হওয়ার পরে সন্তানধারণের ঝুঁকি নিতে চাননি তিনি। কিন্তু নদিয়ার শান্তিপুরের স্টেট জেনারেল হাসপাতালের স্ত্রীরোগ বিশেষজ্ঞদের তত্ত্বাবধানে জটিল অপারেশন হয় তরুণীর। কোনওরকম জটিলতা ছাড়াই এরপর সন্তানের জন্ম দেন তিনি।
ব্লু বেবিকে জীবনদান কলকাতার হাসপাতালে
জন্মের আড়াই বছর পরে আচমকা দেখা দিতে থাকে উপসর্গ। সারা শরীর নীল হতে শুরু করেছিল শিশুর। ঠোঁট কাটা থাকার কারণে খাবার ঢুকে যেত শ্বাসনালিতে। দক্ষিণ কলকাতার এক বেসরকারি হাসপাতালের চিকিৎসকরা পরীক্ষা করে দেখেন, শিশুটির হার্টে ছিদ্র রয়েছে। তাছাড়া শিশুটির ব্লু বেবি সিনড্রোম দেখা দিয়েছে। অপারেশন করে শিশুটিকে সুস্থ করেন তাঁরা।
কৃত্রিম যোনি প্রতিস্থাপন সিউড়ির হাসপাতালে
জন্ম থেকে যোনিপথ ছিল না। ‘অ্যাবসেন্ট ভ্যাজাইনা’র সমস্যা নিয়ে সিউড়ির হাসপাতালে এসেছিল নাবালিকা। পরীক্ষা করে দেখা যায় ‘মেয়ার রকিট্যানস্কি কুজস্টার হাউজার সিন্ড্রোম’ রয়েছে কিশোরীর। এমন শারীরিক অবস্থা থাকলে ঋতুস্রাব হওয়া বা মা হওয়া অসম্ভব। কৃত্রিম যোনি তৈরি করে তা প্রতিস্থাপন করে মেয়েটিকে নতুন জীবন দেন সিউড়ি হাসপাতালের চিকিৎসকরা।
রাজ্যে প্রথম বিরল অপারেশন এসএসকেএমে
রাজ্যে প্রথমবার হাত প্রতিস্থাপন করে কলকাতার এসএসকেএম হাসপাতাল। ব্রেন ডেড রোগীর থেকে পাওয়া হাত প্রতিস্থাপন করা হল হাসপাতালের রোনাল্ড রস বিল্ডিংয়ের প্লাস্টিক সার্জারি ইউনিটে।
দুই জরায়ুতে দুই সন্তান!
জন্ম থেকে দুই জরায়ু। দুই জরায়ুতে বাড়ছিল দুই সন্তান। বিরল অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে যমজ সন্তান প্রসব করান নদিয়ার শান্তিপুরের স্টেট জেনারেল হাসপাতালে চিকিৎসকরা।
চোয়ালে বিরল অপারেশন
দুর্ঘটনায় বিকৃত হয়েছিল চোয়াল। একের পর হাসপাতালে ঘুরে নাজেহাল হয়ে শেষমেশ অশোকনগর-কল্যাণগড় পুরসভা পরিচালিত প্রজ্ঞানানন্দ সরস্বতী সেবাসদন হাসপাতালের দ্বারস্থ হন ওই রোগীর পরিবার। মাক্সিলোফেসিয়াল অপারেশন করে রোগীর চোয়াল ঠিক করেন ডাক্তারবাবুরা।
ব্রেস্ট টিউমার অপারেশন দিঘার হাসপাতালে
৮০ বছরের বৃদ্ধার স্তন থেকে ১২০০ গ্রামের টিউমার অপারেশন করেন দিঘা স্টেট জেনারেল হাসপাতালের ডাক্তারবাবুরা। চিকিৎসকরা জানান, এটি ফিলোডস টিউমার, যা বিরল টিউমার হিসাবেই গণ্য করা হয়। এই ধরনের অপারেশনের ঝুঁকি অনেক বেশি।
শিশুর অস্থিমজ্জা প্রতিস্থাপন নীলরতন সরকারে
সাত বছরের শিশুর অস্থিমজ্জা প্রতিস্থাপন করে নজির গড়ে নীলরতন সরকার মেডিক্যাল কলেজ ও হাসপাতালের হেমাটোলজি বিভাগ। হাড়ে ক্যানসার হয়েছিল শিশুটির। ধীরে ধীরে তা ছড়াচ্ছিল সারা শরীরে। এ বছরের এপ্রিল মাস থেকে শুরু হয় চিকিৎসা। কেমো-রেডিয়েশনে কাজ না হওয়ায় অস্থিমজ্জা প্রতিস্থাপনের সিদ্ধান্ত নেন ডাক্তাররা। ডোনারের থেকে বোনম্যারো নিয়ে জটিল অপারেশনে তা প্রতিস্থাপিত করা হয়। বর্তমানে শিশুটি সম্পূর্ণ সুস্থ।