দ্য ওয়াল ব্যুরো: দক্ষিণ ২৪ পরগনার কুলতলির জামতলায় এক গৃহবধূর অস্বাভাবিক মৃত্যুর পরে তাঁকে পুড়িয়ে মারার অভিযোগ উঠেছে শ্বশুরবাড়ির লোকজনের বিরুদ্ধে। অভিযোগের ভিত্তিতে পুলিশ তাঁর স্বামীকে গ্রেফতার করেছে। অভিযুক্তরা অবশ্য সমস্ত অভিযোগই অস্বীকার করেছে।
জামতলার মনসাতলার দক্ষিণ দুর্গাপুরের মণ্ডলপাড়ার বাসিন্দা আমিরচাঁদ মণ্ডলের ছেলে সব্যসাচী মণ্ডল ব্যবসায়ী। গত বছর তাঁর সঙ্গে সম্বন্ধ করে বিয়ে হয়েছিল বিষ্ণুপুরের আন্দারমানিক অঞ্চলের পাইখোলা গ্রামের হাসান সানার মেয়ে হাবিবার। হাবিবার মাসতুতো ভাই আলি আজগর শেখের অভিযোগ, বিয়ের কিছুদিন পর থেকেই হাবিবার উপরে তাঁর শ্বশুরবাড়ির লোকজন অত্যাচার শুরু করে। সেকথা হাবিবা তাঁর বাপের বাড়িতে জানাতেন বলে তাঁর ফোন করা পর্যন্ত বন্ধ করে দেন শ্বশুরবাড়ির লোকজন। হাবিবার ননদ রুবি মণ্ডলই বেশি অত্যাচার করতেন।
বারুইপুরে আল আমিন কলেজে বিএ দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্রী ছিলেন হাবিবা। ছয় ভাইবোনের মধ্যে তিনি মেজ। তাঁর আরও তিন বোন আছে। তাঁদেরও বিয়ে দিতে হবে। সেসব কথা ভেবেই হাবিবা মুখ বুজে সব সহ্য করতেন। তা ছাড়া তাঁর ধারনা ছিল কিছুদিন পরেই সব মিটে যাবে। একথা জানিয়েছেন আলি আজগর শেখ।
তাঁর বয়ান অনুযায়ী, ২১ মার্চ সকাল সাড়ে সাতটায় হাবিবার শ্বশুর আমিরচাঁদ ফোন করে বলেন, “আপনাদের মেয়ে অসুস্থ। দুটো নার্সিংহোমে নিয়ে গেছি, ভর্তি নেয়নি কোথাও। কসবার রিবেল নার্সিংহোমে ভর্তি আছে।” তখন তিনি সব্যসাচীর নম্বরে ফোন করে দেখেন যে তাঁর ফোন বন্ধ। নার্সিংহোমে গিয়েও প্রথমে মণ্ডল পরিবারের কাউকেই তাঁরা দেখতে পাননি যদিও পরে তাঁরা আসেন।
নার্সিংহোম থেকে চিকিৎসক প্রাথমিক ভাবে জানান যে অন্তত ৮০ শতাংশ পুড়ে গেছে। পরে তাঁরা লিখিত ভাবে জানান যে শরীরের ৯৩ শতাংশ পুড়ে গেছে। আলি আজগর শেখ বলেন, “তখন বাড়ির লোক কান্নাকাটি করতে শুরু করে দেয়। পরে হাবিবার শাশুড়ি মরিয়ম মণ্ডলকে জিজ্ঞাসা করি কী ভাবে ও পুড়ে গেল। তিনি বলেন ‘গায়ে তেল ঢেলে পুড়েছে। আমরা ঘুমাচ্ছিলাম।’ আমরা বাড়ির যে ক’জনকে জিজ্ঞাসা করেছি সকলেই বলছেন তখন ঘুমোচ্ছিলেন। একথা আমরা কেউ বিশ্বাস করতে পারছি না।” ২৩ তারিখ সকাল পাঁচটা পঞ্চাশ মিনিটে হাবিবা মারা যান। সেই দিনই কুলতলি থানায় তাঁরা ডায়েরি করেন।
আজগর শেখ বলেন, “২৩ তারিখে বিকেলে ওদের বাড়িতে যাই। গিয়ে দেখি ঘরে তালা দেওয়া। পাড়ার লোক একবার বলেন যে বারান্দায় গায়ে আগু দিয়েছে হাবিবা, একবার বলে ঘরে দিয়েছে। কিন্তু সে সব জায়গায় কোথাও পোড়ার চিহ্ন আমরা পাইনি।” তাঁর আরও অভিযোগ, শ্বশুবাড়ির লোকজন তাঁর মৃতদেহের দাবি করা দূরে থাক করবে মাটি পর্যন্ত দিতে আসেননি।
এই ঘটনায় পাঁচজমনের নামে কুলতলি থানায় অভিযোগ দায়ের হয়েছে। তাঁরা হলেন আমিরচাঁদ মণ্ডল, সব্যসাচী মণ্ডল, মরিয়ম মণ্ডল, মিজানুর মণ্ডল (দেওর) ও রুবি মণ্ডল। এর মধ্যে পুলিশ সব্যসাচী মণ্ডলকে গ্রেফতার করেছে।
আমিরচাঁদ মণ্ডল বলেন, “করোনা ভাইরাসের সময় বাড়িতে থাকা নিয়ে স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে গণ্ডগোল বাধে। স্ত্রী বলেছিল বাপের বাড়িতে যাবে কিন্তু স্বামী বাধা দিয়েছিল। ছেলেকে ভয় দেখানোর জন্য বৌমা গায়ে আগুন লাগায়। এই দুর্ঘটনা ঘটার সঙ্গে সঙ্গে প্রথমে হাসপাতাল ও তারপরে নার্সিংহোমে নিয়ে গিয়ে চিকিৎসার জন্য যথাসম্ভব চেষ্টা করা হয়। কেন ওরা পুলিশের কাছে অভিযোগ জানিয়েছে জানি না। এই মৃত্যুর পিছনে আমি বা আমার পরিবার বা ছেলে কেউ দায়ী নয়। মৃত্যুর আগে নার্সিংহোমে জীবিত অবস্থায় আমার বৌমা তাঁর বাপের বাড়ির লোকজনকে ও বলেছিল যে এটা তাঁর নিজের ভুলের জন্য হয়েছে। আমি প্রস্তাব দিয়েছি উভয় পক্ষ বসে বিষয়টির মীমাংসা করে নিতে। আমার ছেলের কোনও দোষ থাকলে ও শাস্তি পাবে।” যদিও আজগরের অভিযোগ, তিনি আসলে টাকা নিয়ে বিষয়টি মিটিয়ে ফেলতে চাইছেন।
কুলতলি থানার তদন্তকারী আধিকারিক জানিয়েছেন যে একটা মামলা করা হয়েছে, মৃতার স্বামীকে গ্রেফতার করা হয়েছে। তদন্ত চলছে। ময়নাতদন্তের রিপোর্ট পেলে তবেই মৃত্যুর কারণ জানা যাবে।