
শেষ আপডেট: 21 April 2022 12:41
দ্য ওয়াল ব্যুরো: হৈমবতী দাতব্য চিকিৎসালয় (Bardhaman hospital), শতাব্দী প্রাচীন এই হাসপাতালটি দীর্ঘদিন তালা বন্ধ। পরিকাঠামোর অভাব, চিকিৎসক নেই, তবুও উদাসীন সরকার! বন্ধ এই হাসপাতালটি পুনরায় চালু করতে আদালত পর্যন্তও জল গড়িয়েছে। তবে সবকিছুর পেছনে আছে একটা মানুষ। গুরুদাস চট্টোপাধ্যায় (Gurudas Chatterjee)। শতায়ুর দোরগোড়ায় দাঁড়িয়েও লড়াই চালিয়ে যাচ্ছেন তিনি। গরিব ও দুঃস্থ মানুষের চিকিৎসার স্বার্থে গুরুদাসবাবুর এমন আপোশহীন লড়াইকে কুর্নিশ জানাচ্ছেন নেটিজেনরা।
পূর্ব বর্ধমানের পাঁচড়া গ্রামে শতাব্দী প্রাচীন এই স্বাস্থ্যকেন্দ্রটির অবস্থা এখন প্রায় ভগ্নদশা। কমতে কমতে এই স্বাস্থ্যকেন্দ্রের চিকিৎসকের সংখ্যা এখন শূন্যতে এসে ঠেকেছে। এক সময়ে এই স্বাস্থ্যকেন্দ্রের অবস্থা ছিল অন্য রকম। চিকিৎসক থেকে রোগীর ভিড়ে গমগম করত এই স্বাস্থ্যকে কেন্দ্রটি।
তবে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে ১৯১৭ সালের তৈরি হওয়া এই হাসপাতালটির অবস্থা এখন খুবই করুণ। কিন্তু লড়াই ছাড়েননি গুরুদাস চট্টোপাধ্যায়। তাঁর বয়স এখন ৯৩ ছুঁয়েছে। বার্ধক্যে শারীরিক শক্তি কমলেও কমেনি তাঁর মনের জোর। অবসরপ্রাপ্ত স্কুল শিক্ষক শুরুদাসবাবু মূলত আইনি পথে ও সামাজিক ভাবেই এই লড়াই চালাচ্ছেন। গরিব দুঃস্থ মানুষের চিকিৎসার জন্য জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত এই লড়াই জারি রাখার ব্যাপারেও দৃৃঢ় প্রত্যয়ী গুরুদাস বাবু। তাই পাঁচড়া গ্রামের সাধারণ মানুষজনও তাঁর এই লড়াইয়ে সঙ্গী হয়েছেন।
১০৫ বছর আগে, ১৯১৭ সালের ১৭ ডিসেম্বর পাঁচড়া গ্রামের পশ্চিম পাড়ায় দ্বারোদঘাটন হয় এই হৈমবতী দাতব্য চিকিৎসালয়ের। সর্বসাধারণের চিকিৎসার জন্য এই চিকিৎসালয়টি তৈরির ব্যাপারে মূখ্য ভূমিকা নিয়েছিলেন এলাকারই এক বধূ হৈমবতী মুখোপাধ্যায়।তাই তাঁর নামেই চিকিৎসালয়টির নামকরণ হয়। ব্রিটিশ রাজত্বে তৎকালীন বর্ধমানের ডিভিশনাল কমিশনার ডি. এইচ. লিস এই হৈমবতী দাতব্য চিকিৎসালয়টির উদ্বোধন করেছিলেন।
তারপর দেশ স্বাধীন হল। কিন্তু পরিষেবা আর বাড়েনি সেভাবে। ধীরে ধীরে কমতে থেকেছে চিকিৎসক ও কম্পাউন্ডারের সংখ্যা। ২০১৭ সালের ৭ এপ্রিল বর্ধমান জেলা ভাগ হয়। তারপরে পূর্ব বর্ধমান জেলা পরিষদের তত্বাবধানে একজন মাত্র চিকিৎসকের উপর নির্ভর করে চলছিল হৈমবতী দাতব্য চিকিৎসালয়টি। ২০২০ সালের ৩১ ডিসেম্বর ওই চিকিৎসক অবসর নেন। ব্যস তারপর থেকেই হৈমবতী দাতব্য চিকিৎসালয়টি তালা বন্ধ হয়েই পড়ে রয়েছে।
পাঁচড়ার বাসিন্দাদের এখন চিকিৎসার জন্য পাড়ি দিতে হয় কয়েক কিলোমিটার দূরের পথ। নিজের গ্রামে হাসপাতাল থাকতেও কষ্ট সহ্য করতে হয় বাসিন্দাদের। যার জেরে ক্ষোভ বেড়েছে গ্রামবাসীদের মনে। পাঁচড়ার বাসিন্দা রাজু ঘোষ ও শ্রীকান্ত নন্দী জানিয়েছেন, "হৈমবতী দাতব্য চিকিৎসালয়টি থেকে শুধু পাঁচড়া নয় আরও ২০-২২টি গ্রামের মানুষজন চিকিৎসা পরিষেবা পেতেন। যতদিন হাসপাতালটি চালু ছিল প্রতিদিন গড়ে ২৫০ থেকে ৩০০ জন মানুষ স্বাস্থ্য কেন্দ্রে চিকিৎসার জন্য আসতেন। যে হাসপাতালের 'হেরিটেজ হাসপাতাল’ হিসাবে স্বীকৃতি পাবার কথা ছিল সেই হাসপাতাল এখন তালা বন্ধ হয়ে পড়ে রয়েছে। তার কারণে চিকিৎসা পরিষেবা পেতে এখন সবাইকে দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে। অথচ সব জেনেও প্রশাসন, জেলাপরিষদ বা স্বাস্থ্য দফতর কারোই কোন হেলদোল দেখাচ্ছে না।"
অন্যদিকে, এই হাসপাতাল চালুর ব্যাপারে গুরুদাস চট্টোপাধ্যায়ের লড়াইকেও কুর্নিশ জানাচ্ছেন গ্রামবাসীরা। তাঁদের কথায়, তাঁদের গ্রামের প্রবীণ বাসিন্দা গুরুদাস চট্টোপাধ্যায়, হৈমবতী দাতব্য চিকিৎসালয়টি পুনরায় চালু করার জন্য সামাজিক ভাবে ও আইনি পথে লড়াই চালিয়ে যাচ্ছেন। গুরুদাসবাবুর এই লড়াইয়ে পাঁচড়া সহ আশেপাশের বাসিন্দারাও সামিল হয়েছেন।
গুরুদাস চট্টোপাধ্যায় কী বলেছেন তাঁর এই লড়াই নিয়ে। তাঁর কথায়, চিকিৎসা পরিষেবা পাবার ক্ষেত্রে এলাকার গরিব দুঃস্থ মানুষজন নির্ভরশীল ছিলেন হৈমবতী দাতব্য চিকিৎসালয়ের উপরেই। সেই হাসপাতাল বন্ধ হয়ে পড়ে থাকায় এলাকার গরিব মানুষরা চরম বিপাকে পড়ে গিয়েছেন। গরিব মানুষের প্রতি প্রশাসন ও স্বাস্থ্য দফতরের এই অবহেলা মেনে নিতে পারেনি। তাই হাসপাতালটি চালু করার জন্য কলকাতা হাইকোর্টে জনস্বার্থ মামলা করেছিলাম।' মামলা করেই ক্ষান্ত হননি ৯৩ বছর বয়সী এই বৃদ্ধ। পাশাপাশি সামাজিক ভাবেও জনমত সংঘটিত করে হাসপাতাল চালুর দাবিতে আন্দোলন চালিয়ে যাচ্ছেন।
এই লড়াইয়ে গুরুদাস বাবুর পাশে দাঁড়িয়েছেন তাঁর স্ত্রী রেখাদেবী এবং কলকাতা হাইকোর্টের আইনজীবী রবিশংকর ও উদয়শংকর। সম্পর্কে এই দুজনই গুরুদাস চট্টোপাধ্যায়ের ছেলে। জেঠার লড়াইয়ে সঙ্গী হয়েছেন আইনজীবী ভাইপো সুমনশংকরও।
যদিও সরকারের এই উদাসীনতার জন্য ২৫ হাজার টাকা জরিমানার নির্দেশ দিয়েছিল কলকাতা হাইকোর্ট। তবে কবে এই হাসপাতাল চালু হবে তাঁর কোনও সদুত্তর নেই। প্রশাসনও মুখে কুলুপ এঁটেছে। শতায়ু ছুঁতে বসা বৃদ্ধের চোখে এখন একটাই স্বপ্ন, হৈমবতী দাতব্য হাসপাতালটিতে আবার চিকিৎসা শুরু হয়েছে তা দেখা।
বদলির জন্য ঘুষের দাবি! খতিয়ে দেখবে সিআইডির ডিআইজি, নির্দেশ বিচারপতি অভিজিৎ গঙ্গোপাধ্যায়ের