দ্য ওয়াল ব্যুরো: বেশ কিছুদিন আগে গুজব শোনা গিয়েছিল, প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর সঙ্গে বিরোধের জেরে পদত্যাগ করতে পারেন রিজার্ভ ব্যাঙ্কের গভর্নর উর্জিত পটেল। পরে অবশ্য শোনা যায়, মোদীর সঙ্গে আলোচনায় বসে বিরোধের মীমাংসা হয়েছে অনেকাংশে। কিন্তু পাঁচ রাজ্যে বিধানসভা ভোটের ফল বেরনোর আগেরদিন আচমকাই ইস্তফা দিলেন উর্জিত। ইস্তফাপত্রে অবশ্য তিনি সরকারের সঙ্গে বিরোধের কথা উল্লেখও করেননি। ইস্তফার কারণ হিসাবে দেখিয়েছেন, ‘পার্সোনাল রিজন’। অর্থাৎ তিনি ব্যক্তিগত কারণে পদ ছাড়ছেন। ২০১৯ সালের সেপ্টেম্বরে তাঁর কার্যকালের মেয়াদ শেষ হওয়ার কথা ছিল।
তিনি এক বিবৃতিতে বলেছেন, ব্যক্তিগত কারণে আমি এখন যে পদে আছি, তা থেকে অবিলম্বে ইস্তফা দিতে চাই। বেশ কয়েক বছর ধরে নানা পদে থেকে আমি রিজার্ভ ব্যাঙ্কের সেবা করার সুযোগ পেয়েছি। সেজন্য সম্মানিত বোধ করছি। গত কয়েক বছরে রিজার্ভ ব্যাঙ্কের কর্মী, অফিসার ও ম্যানেজমেন্ট কঠোর পরিশ্রম করেছেন। তাঁদের থেকে সবরকম সাহায্য পেয়েছি। এই সুযোগে আমি সহকর্মী ও বোর্ড ডিরেক্টরদের প্রতি কৃতজ্ঞতা ও শুভেচ্ছা জানাচ্ছি।
এর আগে গত বুধবারও এক সাংবাদিক বৈঠকে সরকারের সঙ্গে তাঁর বিরোধ নিয়ে মন্তব্য করতে চাননি উর্জিত পটেল। সেখানে তিনি রিজার্ভ ব্যাঙ্কের পলিসি রিভিউ নিয়ে বক্তব্য পেশ করেন। সাংবাদিকরা সরকারের সঙ্গে তাঁর মতভেদের কথা জানতে চাইলে তিনি বলেন, এখানে ওই প্রসঙ্গে আলোচনা করা অনুচিত।
রঘুরাম রাজনের মেয়াদ শেষ হওয়ার পরে ২০১৬ সালের ৪ সেপ্টেম্বর উর্জিত পটেল রিজার্ভ ব্যাঙ্কের গভর্নরের দায়িত্ব গ্রহণ করেন। রঘুরাম রাজনের সময় থেকেই সরকারের সঙ্গে রিজার্ভ ব্যাঙ্কের বিরোধ শুরু হয়েছিল। উর্জিত পটেলের সময় তা আরও তীব্র হয়ে ওঠে।
নোটবন্দি নিয়ে রিজার্ভ ব্যাঙ্কের বিবৃতিতে রীতিমতো অস্বস্তিতে পড়ে সরকার। রিজার্ভ ব্যাঙ্ক জানায়, বাতিল হওয়া নোটের ৯৯.৩ শতাংশ ফিরে এসেছে ব্যাঙ্কে। অর্থাৎ নোটবন্দির ফলে কালো টাকা বাতিল করা যায়নি। সরকারের চেষ্টা ব্যর্থ।
ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পগুলিকে ঋণ দেওয়া নিয়ে রিজার্ভ ব্যাঙ্কের সঙ্গে সরকারের বিরোধ চরম আকার নেয়। ওই শিল্পগুলিতে বিপুল কর্মসংস্থান হয়। সারা দেশে চাকুরেদের ৪০ শতাংশ ওই ক্ষেত্রে কাজ করেন। সরকার সেজন্য চেয়েছিল, ওই শিল্পগুলিকে সহজে ঋণ দেওয়ার ব্যবস্থা হোক। কিন্তু রিজার্ভ ব্যাঙ্ক অন্যান্য ব্যাঙ্কের জন্য ঋণ দেওয়ার যে গাইডলাইন তৈরি করেছে তাতে ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পের ঋণ পেতে সমস্যা হবে বলে সরকারের ধারণা।
২৬ অক্টোবর মুম্বইতে রিজার্ভ ব্যাঙ্কের ডেপুটি গভর্নর এক ভাষণে বলেন, যে সরকার কেন্দ্রীয় ব্যাঙ্কের স্বাধীনতা স্বীকার করে না, তাদের প্রতি অর্থের বাজার আস্থা হারাতে বাধ্য। এর ফলে নেমে আসবে বিপর্যয়। তিনি আর্জেন্টিনার উদাহরণ দিয়ে বলেন, ২০১০ সালে সে দেশের সরকার কেন্দ্রীয় ব্যাঙ্কের স্বশাসনে হাত দেওয়ায় অর্থনীতির হাল খারাপ হয়ে গিয়েছিল।
বিরাল আচার্যের পিছনে উর্জিত পটেলের সমর্থন আছে বলে জানা যায়। অন্যদিকে আর্জেন্টিনার সঙ্গে ভারতের তুলনা করায় অসন্তুষ্টও হন অনেকে। তাঁরা বলেন, আর্জেন্টিনা সাতবার বৈদেশিক ঋণ শোধ করতে ব্যর্থ হয়েছে। অভ্যন্তরীণ ঋণ শোধ করতে ব্যর্থ হয়েছে পাঁচবার। ভারত কখনও ঋণ শোধ করতে ব্যর্থ হয়নি।
অনেকে আশঙ্কা করছেন, উর্জিত পটেল যেভাবে কার্যত বিদ্রোহ করে রিজার্ভ ব্যাঙ্কের গভর্নরের পদ ছেড়ে দিলেন, তাতে পরের বার ওই পদে কাউকে নিয়োগ করার সময় সতর্ক হবে সরকার। হয়তো সরকারের ‘ইয়েস ম্যান’ যারা, অর্থাৎ যে সরকারের সব নির্দেশই মেনে নেবে, ব্যাঙ্কের স্বশাসনের কথা তুলবে না, এমন লোককেই রিজার্ভ ব্যাঙ্কের গভর্নর পদে নিয়োগ করা হবে।