
শেষ আপডেট: 8 November 2023 11:39
দ্য ওয়াল ব্যুরো: নয়ের দশকের একদম শেষদিকের কথা। রাজকুমার তখন ১৫ বছরের কিশোর। তখনই শেষবারের জন্য বাবাকে দেখছিল সে। এক শীতের সকালে হঠাৎ করেই উধাও হয়ে গিয়েছিলেন রাধে চৌরাশিয়া। হাজার খোঁজাখুঁজিতেও সন্ধান মেলেনি। সুখী, হাসিখুশি পরিবার মুহূর্তে যেন বিধ্বস্ত হয়ে পড়েছিল। কালের নিয়মে ধীরে ধীরে যদিও সামলে নেন সকলেই। তবে খোঁজাখুঁজি জারি ছিল। তারপর কেটে গেছে ২ যুগ! ২৪টা শীতকাল পেরিয়ে একদিন হঠাৎই ফোন আসে রাজকুমারের কাছে। জানা যায়, সুদূর কলকাতার কাছে ব্যারাকপুর স্টেশনে খোঁজ মিলেছে হারিয়ে যাওয়া রাধে চৌরাশিয়ার!
রাধে চৌরাশিয়া ছিলেন ভারতীয় সেনার একজন কর্মী। সেনাবাহিনীর মিলিটারি ইঞ্জিনিয়ারিং সার্ভিস বিভাগে কাজ করতেন। কাজের সূত্রেই দেশের বিভিন্ন জায়গায় পোস্টিং থাকত তাঁর। তবে তাঁর পরিবার থাকত উত্তরপ্রদেশের দেওরিয়ার পৈতৃক ভিটেতে। ১৯৯৯ সালের ৩ জানুয়ারি। পৌষের কড়া শীত তখন। স্ত্রী শান্তিদেবী, এবং ১৫ বছরের ছেলে বাড়িতেই ছিলেন। রাধের পোস্টিং ছিল অসমের তেজপুরে। সেখান থেকেই রেলপথে বাড়ি ফিরছিলেন ৪৪ বছরের সেনাকর্মী। কিন্তু সেই ফেরা আর হয়নি। বাড়ি আসার পথেই রহস্যজনকভাবে উধাও হয়ে যান রাধে।
শান্তিদেবী ও তাঁর বাড়ির লোকজন বহু রকমভাবে তাঁকে খুঁজে পাওয়ার চেষ্টা করেছেন। এদিক সেদিক ফোন করা, ছবি বিলি করা- কী না চেষ্টা বাকি ছিল! কিন্তু লাভ হয়নি। সময় এগিয়েছে, বছরের পর বছর ঘুরেছে। স্বামীকে আর দেখতে পাওয়ার আশা ছেড়েই দিয়েছিলেন শান্তিদেবী। যদিও হাল ছাড়েননি রাজকুমার। সেদিনের কিশোর আজ ৩৯ বছরের যুবক। বাবার অবর্তমানেই মা বহু কষ্টে সংসার টেনেছেন, লেখাপড়া শিখিয়েছেন। এখন রাজকুমার কাজ পেয়েছেন রাজ্যের স্বাস্থ্য দফতরে। তাঁর রোজগারে সংসার চলছে দিব্যি। সেই রোজনামচার মাঝেই রোজ নিয়ম করে বাবার সন্ধানে এদিক সেদিক খোঁজ করতেন তিনি। রোজই আশাহত হতেন।
তার মধ্যেই প্রয়াত হয়েছেন শান্তিদেবী। বাবা হারিয়ে গেছেন দু-যুগ আগে। এবার মা-ও চলে গেলেন।
২৪ বছর পর ঈশ্বর বোধহয় ভাল করে রাজকুমারের দিকে তাকিয়েছিলেন। কৈশোরে হারানো বাবাকে খুঁজে পাওয়ার কী করুণ আর্তি তাঁর মনের ভিতরে, সেকথা হয়তো বুঝতে পেরেছিলেন। একটা ফোন এসেছিল রাজকুমারের কাছে। ওপ্রান্তে ছিলেন হ্যাম রেডিও কলকাতার কর্মকর্তারা। তাঁরা জানিয়েছিলেন, ব্যারাকপুর স্টেশনে এক বৃদ্ধের খোঁজ মিলেছে। স্মৃতিশক্তি হারিয়েছেন, সব কিছু ঠিক করে বলতেও পারছেন না। তবু যেটুকু জানা গেছে, তাঁদের অনুমান, তিনিই ২৪ বছর আগে হারিয়ে যাওয়া রাধে চৌরাশিয়া।
রাজকুমারের চোখের কোলে তখন জল চিকচিক করছে। আর দেরি করেননি। ব্যাগপত্র গুছিয়ে রওনা হয়েছিলেন কলকাতার উদ্দেশে। সেখান থেকেই মঙ্গলবার সকাল সকাল হাজির হয়ে যান ব্যারাকপুর স্টেশনে। সেখানে তখন হ্যাম রেডিওর কর্মীরাও ছিলেন। তাঁদের সঙ্গেই ছিলেন এক বৃদ্ধ। আলুথালু চেহারা, ময়লা পোশাক। মুখে অপরিচ্ছন্ন সাদা দাড়ি-গোঁফের জঙ্গল। ৬৮ বছরের বৃদ্ধ রাধে চৌরাশিয়া তখন নিষ্পলক তাকিয়ে রয়েছেন রাজকুমারের দিকে। ছেলেকে চিনতে পেরেছিলেন কি?
প্রায় আড়াই দশক আগে শেষ দেখা। তবুও বাবাকে চিনতে কষ্ট হয়নি রাজকুমারের। তাঁর গাল বেয়ে তখন জল গড়িয়ে নামছে। এত বছর ধরে চেপে রাখা আবেগের মুখ যেন খুলে গেছে। চাইলেও বাধ মানছে না চোখের জল। চোখে জল বৃদ্ধেরও। কী বুঝেছিলেন কে জানে! ২৪ বছর আগে কিশোর ছেলেকে সামলাতেন বাবা। জীবনের পথে নিষ্কন্টক এগিয়ে যেতে হবে কীভাবে, শেখাতেন। দশক পাল্টাতেই রোল বদল। বাস্তবের রাস্তা চিনতে পারছেন না বাবা। তাঁকে হাত ধরে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছেন ছেলে, পথ দেখাচ্ছেন। সন্তানস্নেহে রাস্তা চিনিয়ে নিয়ে যাচ্ছেন দেওরিয়ার উদ্দেশে।