অজস্র মুকুট মাথায় পরেছেন, অজস্রতর তকমা ঝুলিতে পুরেছেন৷ তবু কৈশোরের সেই ‘উচ্চমাধ্যমিকে রাজ্যে প্রথম’ স্বীকৃতির তুল্য সমাদর জোটেনি বলে মনে করতেন এতদিন।

সুপ্রিয় সিনহা
শেষ আপডেট: 23 December 2025 19:02
দ্য ওয়াল ব্যুরো: উত্তুঙ্গ সাফল্যের গল্প একবার লিখেছিলেন ১৯৯৫ সালে। উচ্চমাধ্যমিকে রাজ্যে প্রথম। বাংলার শিক্ষাব্যবস্থা কালে কালে অনেক কিছুই হারিয়েছে। কিন্তু উচ্চমাধ্যমিকে সব্বাইকে টক্কর দিতে পারার চাঁদমারিটা চিরঅমলিন, আজও সমান উজ্জ্বল! তিরিশ বছর আগে সেখানে লক্ষ্যভেদ করেছিলেন সুপ্রিয় সিনহা। যাঁর বর্তমান পেশাগত পরিচয় পিয়ারলেস গ্রুপের ডিরেক্টর হিসেবে৷
এরপর সময় গড়িয়েছে। উচ্চশিক্ষা, উচ্চতর শিক্ষার সিঁড়ি ভাঙা। আইআইএম ক্যালকাটায় গোল্ড মেডেল অর্জন। তারপর পেশাগত দুনিয়ায় পা রাখা৷ সেখানেও পেছন ফিরে তাকাতে হয়নি সুপ্রিয়কে৷ অজস্র মুকুট মাথায় পরেছেন, অজস্রতর তকমা ঝুলিতে পুরেছেন৷ তবু কৈশোরের সেই ‘উচ্চমাধ্যমিকে রাজ্যে প্রথম’ স্বীকৃতির তুল্য সমাদর জোটেনি বলে মনে করতেন এতদিন।
‘এতদিন’ মানে এই কিছুদিন আগে পর্যন্ত৷ শীত সবে নামব নামব করছে যখন, তখনই বসল ন্যাশনাল ফিনসুইমিং চ্যাম্পিয়নশিপের আসর। তাতে নাম লেখালেন সুপ্রিয়। ২০২২ সালের আগে সাঁতার তো দূর অস্ত, সুইমিং পুলের সঙ্গেও যাঁর সামান্যতম সম্পর্ক ছিল না৷ বছর তিনেক আগে কোমরে চোট পান জিম করতে গিয়ে। স্লিপ ডিস্ক। ৪৬ বছর বয়সের এই যন্ত্রণা সারাতে বহু ওষুধ, ব্যায়াম, ফিজিওথেরাপি করার পরে, শেষমেশ ডাক্তারবাবুর কথায় শুরু করেন সাঁতার। ডাক্তারবাবু জানান, নিয়মিত সাঁতারেই কোমরের ব্যথা নিয়ন্ত্রণে থাকতে পারে। সেই নির্দেশ মেনে শুরু হয় এক নতুন যাত্রা, যা শেষমেশ তাঁকে রাজ্যস্তরের স্বর্ণপদক এনে দেয়। ২০২২ সালে, ডাক্তারবাবুর পরামর্শে প্রথম সাঁতারশিক্ষা শুরু। তার আগে কোনও দিন জলে পর্যন্ত নামেননি সুপ্রিয়।
রাজ্যের পর ন্যাশনাল। জয়ের মুকুট আরও উজ্জ্বল, আরও ভরাট! যদিও সোনা নয়। সুপ্রিয় জিতেছেন রুপো৷ ফার্স্ট নয়৷ হয়েছেন সেকেন্ড৷ কিন্তু পঞ্চাশের কোঠা ছুঁইছুঁই এক পুরোদস্তুর কর্পোরেট ডিরেক্টর জীবনকে ফিরে দেখতে বসে ম্যাঙ্গালোরের জাতীয় স্তরের প্রতিযোগিতায় রুপোর মেডেল গলায় ঝোলানোকেই আর সমস্ত সাফল্য—এমনকি উচ্চমাধ্যমিকে রাজ্যে প্রথমের চেয়েও উপরে রাখতে চান৷ ফেসবুকে নিজের অর্জনের খবরটুকু শেয়ার করার ফাঁকে নাতিদীর্ঘ বয়ানে সুপ্রিয় চারখানা পয়েন্টে মেলে ধরেছেন যুক্তি: কেন মধ্যজীবনের এই রুপোর চাকতি আর সব সোনাকে ম্লান করে দিয়েছে!
সুপ্রিয়র ভাষায়: ‘২০২৫ সালের ন্যাশনাল ফিনসুইমিং চ্যাম্পিয়নশিপে রুপোর মেডেল জিতেছি। আজ পর্যন্ত এটাকেই আমার জীবনের সবচেয়ে বড় সাফল্য বলে মনে হচ্ছে—আইআইএম ক্যালকাটার প্রেসিডেন্টস গোল্ড, হয়তো-বা উচ্চমাধ্যমিকে রাজ্যে প্রথম হওয়ার থেকেও বড়।
কারণগুলো খুব সোজা।
প্রথমত, উচ্চমাধ্যমিক আর আইআইএম—দুটোই ছিল পড়াশোনার জায়গা। লেখাপড়ায় আমি বরাবরই স্বচ্ছন্দ। ওগুলো আমার কমফোর্ট জোন। কিন্তু সাঁতার একেবারেই অচেনা। আড়াই বছর আগেও জানতাম না। আর ফিনসুইমিং তো মাত্র ছ’মাস আগে শুরু। মানে একেবারে নতুন এক দুনিয়া।
দ্বিতীয়ত, পড়াশোনায় জরুরি মস্তিষ্কের জোর। সাঁতারে লাগে শরীরের চূড়ান্ত পরিশ্রম। খাবার, অনুশীলন, সময়—সবকিছুর কড়া শৃঙ্খলা চাই। তখন আমার একটাই কাজ ছিল—পড়া। এখন পরিবার আছে, আছে কাজ, তার সঙ্গে সাঁতার—সব একসঙ্গে সামলানো ভীষণ কঠিন।
তৃতীয়ত, সেই সময় বয়স আমার পক্ষে ছিল। ইচ্ছেমতো শরীরকে ঠেলা যেত। এখন সেই বয়স নেই। সকালে ১১–১২ ডিগ্রি ঠান্ডা জলে নেমে প্র্যাকটিস করা সহজ নয়। জল থেকে উঠে এক ঘণ্টা কাঁপতাম।
চতুর্থত, তখন যাদের সঙ্গে লড়েছি, তারা সবাই ছিল আমার বয়সি ও সমমানের। কিন্তু এই জাতীয় স্তরের প্রতিযোগিতায় যিনি সোনা জিতেছেন, তিনি ৩৭ বছর ধরে সাঁতার কাটছেন, নিজেই একজন কোচ!
তবু আমি খুশি। খুব খুশি।’
কিন্তু লম্বা পোস্টের বাইরেও তো রয়ে যায় কিছু ব্যক্তিগত ফুটনোট৷ যা ফেসবুকে লেখা থাকে না। কিন্তু হয়ে উঠতে পারে আমজনতার, বিশেষ করে অম্লপিত্তের সমস্যায় জর্জর মধ্যবিত্ত বাঙালির ঘুরে দাঁড়ানোর সঞ্জীবনী মন্ত্র!
এই মন্ত্রগুপ্তির খোঁজেই ‘দ্য ওয়াল’ যোগাযোগ করে সুপ্রিয়র সঙ্গে৷ সাফল্যের খবরটুকু জানাতেই হাসিভরা গলায় পিয়ারলেসের কর্ণধার বলে উঠলেন, ‘আসলে ৫০ মিটার ফিনসুইমিং আমার পরিচিত ক্ষেত্র৷ রাজ্যস্তরের প্রতিযোগিতায় ৩০.৪ সেকেন্ডে ফিনিশ, প্রথম স্থান অর্জন আত্মবিশ্বাস জুগিয়েছে৷ এরপর নিয়মিত অনুশীলন চালিয়ে গিয়েছি৷ নামিয়ে এনেছিলাম ২৯.৩-এ। যে কারণে আত্মবিশ্বাসে ঘাটতি ছিল না কোনওদিন!’
কিন্তু আচমকা এই অটুট প্রাচীরে ধরে চিড়। জাতীয় স্তরের কম্পিটিশনে নাম লেখান৷ সেখানে আচমকা অবনমন, লেভেল ড্রপ ডাউন! প্রতিযোগিতা শেষ করেন চতুর্থ স্থানে। ৫০ মিটারের রেস খতম ৩২ সেকেন্ডে।
বাড়িতে ফিরে বেশ খানিকটাই হতোদ্যম হয়ে পড়েন সুপ্রিয়৷ শুধু নিজের পারফরম্যান্স নয়, হতাশা বাড়ায় আরও একটি তথ্য: ওই টুর্নামেন্টে ফার্স্ট হয়েছে যে সাঁতারু, তার ফিনিশিং টাইম ৩০.৮ সেকেন্ড। যা কিনা সুপ্রিয়র রাজ্যস্তরের রেকর্ডের (৩০.৪) চেয়েও নীচে! অর্থাৎ, সাদা বাংলায় বললে, কোনও কিছু বাড়ানোর দরকার ছিল না… নিজের লেভেলটুকু ধরে রাখলেই ন্যাশনাল জিততে পারতেন!
এই পরিস্থিতিতে সুপ্রিয়র সামনে দুটো রাস্তা খোলা ছিল৷ এক: সাঁতারকে এত সিরিয়াসলি না নিয়ে স্রেফ পেশাগত দুনিয়ায় মুখ ফেরানো৷ দুই: নয়া উদ্যমে ঝাঁপিয়ে পড়া!
খানিক দ্বিধায় যখন ভুগতে শুরু করেছেন, ‘করা-না করা'র সংশয় গ্রাস করছে, সেই সময় এগিয়ে আসেন সুপ্রিয়র মেয়ে৷ বাবার মতো সে নিজেও সাঁতার-পাগল। স্কুলছাত্রী৷ কিন্তু স্বপ্ন আরেকটু বড় হয়ে পেশাদার মেজাজে জলের যুদ্ধ জিতে নেওয়া। বাবার কাঁধে হাত রেখে সাহস জোগায়। ফের জাতীয় প্রতিযোগিতা বসতে চলেছে। এবার রেঞ্জ বড়: পঞ্চাশের বদলে একশো মিটার! পরিচিত সীমানা নয়৷ পারবেন ডিঙোতে? মেয়ের বরাভয়: ‘পঞ্চাশে যদি ফোর্থ হও, একশোয় বড়জোর টেন্থ হবে! চেষ্টা করতে ক্ষতি কী!’
না। চেষ্টার কোনও কসুর করেননি সুপ্রিয়৷ শুনেছেন মেয়ের কথা। মেনেছেন অক্ষরে অক্ষরে। শীতের ভোরে যখন সারা শহর লেপ-কম্বলে গুটিসুটি, তখন আয়েসি ওমের মায়া ছেড়ে সরঞ্জাম-সুদ্ধ জলের যুদ্ধ জিততে প্র্যাকটিসে নেমে পড়েছেন সুপ্রিয়৷ কামাই নেই একদিন৷ নেই ঢিলেমি৷ কর্পোরেট অফিস পরিচালনা করেন যে তীক্ষ্ম নজরে, ঠিক একই মনযোগে সাঁতারের অনুশীলনে নিজেকে মগ্ন রেখেছেন৷
এই মগ্নতা আর অধ্যয়নের ফসল যে রুপোর চাকতি, তাকে কোনও অংশে সোনার চেয়ে খাটো করা সম্ভব?