পুলিশের এই এফআইআরকে ‘লোক দেখানো’ এবং প্রভাবশালীদের আড়াল করার হাতিয়ার বলে কটাক্ষ করা হয়।

গ্রাফিক্স-দ্য ওয়াল।
শেষ আপডেট: 22 December 2025 15:54
দ্য ওয়াল ব্য়ুরো: যুবভারতী ক্রীড়াঙ্গনে মেসিকে (Messi case in Yuva Bharati) এক ঝলক দেখার আশায় জমায়েত, কিন্তু মাঠে সেই প্রত্যাশা পূরণ না হওয়ায় ভাঙচুর, জল-বিতর্ক এবং আর্থিক ক্ষতিপূরণ—এই তিনটি বিষয় ঘিরে কলকাতা হাইকোর্টে (Calcutta High Court) দায়ের হওয়া জনস্বার্থ মামলার শুনানি শেষ হল। তবে রায়দান আপাতত স্থগিত রাখলেন ভারপ্রাপ্ত প্রধান বিচারপতির ডিভিশন বেঞ্চ।
শুনানিতে বিরোধী দলনেতার পক্ষে আইনজীবী বিল্বদল ভট্টাচার্য দাবি করেন, ১৩ ডিসেম্বর যুবভারতীতে মেসির অনুষ্ঠানের জন্য অগস্ট মাস থেকেই ব্যাপক প্রচার চালানো হয়। প্রচারে বলা হয়েছিল, মেসি মাঠে এসে কিছুক্ষণ বল নিয়ে খেলবেন এবং সংবর্ধনাও গ্রহণ করবেন। কিন্তু বাস্তবে তা ঘটেনি। অভিযোগ, দমকলমন্ত্রী সুজিত বসু মেসিকে দিয়ে ৭০ ফুটের মূর্তি উন্মোচন করান এবং হায়াত হোটেলে অর্থের বিনিময়ে ছবি তোলার ব্যবস্থা হয়। ফলে মেসির মাঠে পৌঁছতে প্রায় ৪০ মিনিট দেরি হয়। শেষে তাঁকে দ্রুত মাঠ ছাড়তে হয়।
আয়োজক শতদ্রু দত্ত আগেই জেরায় তদন্তকারীদের জানিয়েছে, তিনি মাত্র ১৫০টি পাস দিয়েছিলেন। অথচ বাস্তবে ৩০০টিরও বেশি পাস বিতরণ হয়। অভিযোগকারীদের দাবি, আয়োজককে সামনে রেখে গোটা অনুষ্ঠানটি শাসক দলের মদতেই পরিচালিত হয়েছিল। টাকা দিয়ে টিকিট কেটে আসা দর্শকেরা মেসিকে দেখতে না পেয়ে ক্ষুব্ধ হন।
ঘটনার পর বিধাননগর দক্ষিণ থানায় সন্ধ্যা ৬টা ৩০ মিনিটে এফআইআর দায়ের হয়। আয়োজক শতদ্রু দত্ত গ্রেফতার হন। তবে সবচেয়ে উদ্বেগজনক বলে আদালতে জানানো হয়, ৭-৮ জন সাধারণ দর্শককেও গ্রেফতার করা হয়েছে। অথচ শাসক দলের একাধিক মন্ত্রীর নাম এফআইআরে নেই। পুলিশের এই এফআইআরকে ‘লোক দেখানো’ এবং প্রভাবশালীদের আড়াল করার হাতিয়ার বলে কটাক্ষ করা হয়।
আরও অভিযোগ, স্টেডিয়ামের ভিতরে জলের বোতল নিয়ে যাওয়ার অনুমতি না থাকলেও ২০০ টাকা করে জল বিক্রি হয়েছে। পুরো ঘটনার সঙ্গে আর্থিক দুর্নীতির যোগ রয়েছে বলে দাবি। সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত খবর অনুযায়ী, মেসিকে নাকি আগাম ৬৫ কোটি টাকা দেওয়া হয়েছিল—এই টাকা কোথা থেকে এল, সেই প্রশ্নও ওঠে।
মামলাকারী ময়ূখ বিশ্বাসের পক্ষে আইনজীবী সব্যসাচী চট্টোপাধ্যায় সিএজি দিয়ে অডিট এবং সিরিয়াস ফ্রড ইনভেস্টিগেশন অথরিটিকে দিয়ে তদন্তের দাবি জানান। তাঁর বক্তব্য, টিকিটে রাজ্যের ক্রীড়া দফতরের সিল থাকায় পুরো অনুষ্ঠান আসলে রাজ্যেরই দায়িত্ব। তাই ইডি দিয়ে তদন্ত প্রয়োজন।
তৃতীয় মামলাকারীর পক্ষে বিকাশ রঞ্জন ভট্টাচার্য বলেন, ফুটবল ম্যাচের নামে সাধারণ মানুষের কাছ থেকে টাকা নিয়ে বিপুল আর্থিক দুর্নীতি হয়েছে। রাজ্যের কোনও সংস্থা এই ঘটনার নিরপেক্ষ তদন্ত করতে পারবে না বলেও তিনি দাবি করেন।
রাজ্যের পক্ষে আইনজীবী কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায় জানান, মুখ্যমন্ত্রী ঘটনার পরই সংবেদনশীলতার পরিচয় দিয়ে ক্ষমা চেয়েছেন এবং প্রাক্তন বিচারপতিকে দিয়ে অনুসন্ধান কমিটি গঠন করেছেন। তাঁর দাবি, যুবভারতীর ভিতরে জলের বোতল বা পাউচের অনুমতি ছিল না। মেসিকে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রকের তরফে জেড ক্যাটাগরি নিরাপত্তা দেওয়া হয়েছিল।
পাস বিতর্কেও বিস্তারিত তথ্য উঠে আসে। শতদ্রু দত্ত মোট ৪০০টি পাস দেন, এর মধ্যে ২৭টি ছিল ‘ক্লোজ প্রক্সিমিটি’ পাস, বাকি ৩৭৩টি ডিউটি পাস। আইবি ওয়েস্ট বেঙ্গল, সোশাল মিডিয়া মনিটরিং সেল এবং ঊর্ধ্বতন পুলিশ আধিকারিকদের মিলিয়ে মোট ৮২টি ক্লোজ প্রক্সিমিটি পাস দেওয়া হয়।
সব পক্ষের সওয়াল-জবাব শেষে ডিভিশন বেঞ্চ রায়দান স্থগিত রাখায়, যুবভারতীর সেই বহুচর্চিত মেসি-হট্টগোলের আইনি পরিণতি আপাতত ঝুলেই রইল।