Date : 14th Apr, 2026 | Call 1800 452 567 | info@thewall.in
'ভয় দেখিয়ে মুখ বন্ধ করা যাবে না', আইপ্যাক ডিরেক্টরের গ্রেফতারিতে বিজেপিকে হুঁশিয়ারি অভিষেকেরভোটের মুখে ইডির বড় পদক্ষেপ! কয়লা পাচার মামলায় গ্রেফতার আইপ্যাক ডিরেক্টর ভিনেশ চান্ডেলমহাকাশে হবে ক্যানসারের চিকিৎসা! ল্যাবের সরঞ্জাম নিয়ে পাড়ি দিল নাসার ‘সিগনাস এক্সএল’সঞ্জু-রোহিতদের পেছনে ফেলে শীর্ষে অভিষেক! রেকর্ড গড়েও কেন মন খারাপ হায়দ্রাবাদ শিবিরের?আইপিএল ২০২৬-এর সূচিতে হঠাৎ বদল! নির্বাচনের কারণে এই ম্যাচের ভেন্যু বদলে দিল বিসিসিআইWest Bengal Election 2026 | হার-জিত ভাবিনা, তামান্না তো ফিরবেনা!সুস্থ সমাজ গড়াই লক্ষ্য: শহর ও মফস্বলে স্বাস্থ্য শিবিরের মাধ্যমে সাধারণের পাশে ডিসান হাসপাতালWest Bengal Election 2026 | আবেগের বশেই ‘হুমকি’ দিই শুভেন্দু ‘অপেরা’ করলে পারত!উত্তর কলকাতার অর্ধেক বুথই ‘অতি স্পর্শকাতর’, থাকছে ১০০টি মহিলা বুথও'৯০ লক্ষ না দিলে সেক্স করতে দেব না', বর রাজি না হওয়ায় বাড়িসুদ্ধ লোককে পুড়িয়ে মারার চেষ্টা কনের

‘জয় শ্রী রাম’ বললে ৫০০ টাকা ছাড় রোগীর! 'চৈত্র সেল' কলকাতার ডাক্তারের, কী বলছেন চিকিৎসকরা

চেম্বারে এসে ‘জয় শ্রী রাম’ বললেই মিলবে ৫০০ টাকা ডিসকাউন্ট! কলকাতার হার্ট স্পেশালিস্ট ডক্টর পিকে হাজরার এই পোস্টার ঘিরে উত্তাল চিকিৎসকমহল। বিস্তারিত পড়ুন।

‘জয় শ্রী রাম’ বললে ৫০০ টাকা ছাড় রোগীর! 'চৈত্র সেল' কলকাতার ডাক্তারের, কী বলছেন চিকিৎসকরা

জিনিয়া সরকার

শেষ আপডেট: 13 April 2026 19:49

জিনিয়া সরকার

চিকিৎসক মানেই সাধারণ মানুষের কাছে তিনি ভগবানের রূপ। বর্ণ, ধর্ম বা রাজনৈতিক আদর্শের ঊর্ধ্বে উঠে আর্তের সেবা করাই তাঁর পরম ধর্ম। কিন্তু ভোটের আবহে সেই মহৎ পেশার গায়েও কি তবে রাজনীতির রং লাগল? কলকাতার নামী কার্ডিওলজিস্ট ডক্টর পিকে হাজরার সাম্প্রতিক একটি পোস্টার ঘিরে এখন এমনই উত্তাল রাজ্য রাজনীতি থেকে চিকিৎসকমহল।

কী সেই বিতর্কিত পোস্টার?

সম্প্রতি সোশ্যাল মিডিয়ায় একটি ডিজিটাল পোস্টার ভাইরাল হয়েছে। সেখানে দেখা যাচ্ছে, কলকাতার বিশিষ্ট হৃদরোগ বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক পিকে হাজরা গেরুয়া উত্তরীয় ও মাথায় টুপি পরে রয়েছেন। 

পোস্টারের বয়ানটি আরও চমকপ্রদ— সেখানে লেখা হয়েছে, যে সমস্ত রোগী চিকিৎসকের চেম্বারে এসে ‘জয় শ্রী রাম’ বলবেন, তাঁরা ডাক্তারবাবুর কনসালটেশন ফি বা পরামর্শ মূল্যে বিশেষ ছাড় পাবেন। এমনকি রিসেপশনে ওই ছবি দেখালে ৫০০ টাকা ডিসকাউন্ট পাওয়ার কথাও বলা হচ্ছে।

চিকিৎসায় রাজনীতি, প্রশ্ন নৈতিকতার

ভোটের বাজারে বিভিন্ন পেশার মানুষ নিজস্ব রাজনৈতিক মতাদর্শ নিয়ে প্রচার চালান, তা নতুন কিছু নয়। কিন্তু একজন চিকিৎসকের প্রেসক্রিপশন বা তাঁর চেম্বারে পাওয়া আর্থিক ছাড় কি কোনও নির্দিষ্ট স্লোগানের ওপর নির্ভর করতে পারে? এই প্রশ্নই এখন বড় হয়ে দেখা দিয়েছে।

চিকিৎসকেরাই জানাচ্ছেন, তাঁদের প্রধান শপথই হল, বৈষম্যহীন সেবা। সেখানে একটি নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দলের স্লোগানকে ছাড়ের শর্ত হিসেবে ব্যবহার করা চিকিৎসকের পেশার সততা ও নিরপেক্ষতাকে কাঠগড়ায় দাঁড় করাচ্ছে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞ মহলের একাংশ।

‘ডাক্তারিই আমার রাজনৈতিক প্রচারের অস্ত্র’

তবে নানা মহলের প্রতিবাদের মুখে দাঁড়িয়ে নিজের অবস্থানে অনড় রয়েছেন কার্ডিওলজিস্ট ডাঃ পি কে হাজরা। তাঁর সাফ কথা, ‘জয় শ্রী রাম’ কোনও ধর্মীয় স্লোগান নয়, এটি একটি নিখাদ রাজনৈতিক স্লোগান। নিজের সপক্ষে যুক্তি টেনে তিনি বলেন, "বিধানচন্দ্র রায় যদি চিকিৎসক হয়েও রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী হতে পারেন, কিংবা ডাঃ শান্তনু সেন যদি তৃণমূলের সাংসদ হতে পারেন, তবে আমার এই প্রচারে ভুল কোথায়? ডাক্তার মানেই যে সে সারাজীবন শুধু ডাক্তারিই করবে, এমনটা নয়। এর বাইরেও নাগরিক হিসেবে অনেক কিছু করার অধিকার আছে।"

বিজেপি এবং নরেন্দ্র মোদীর আদর্শে উদ্বুদ্ধ ডাঃ হাজরা নিজেকে একজন ‘রাষ্ট্রবাদী’ নাগরিক হিসেবে পরিচয় দিয়ে জানান, সমাজ পরিবর্তনের জন্য একটি রাজনৈতিক প্ল্যাটফর্ম প্রয়োজন। তাঁর কথায়, "আমি আমার পেশাকে কেন্দ্র করেই এই প্রচারের কাজটি করছি। বুদ্ধিজীবীরা যেমন তাঁদের শিল্পের মাধ্যমে প্রচার করেন, আমি চিকিৎসক হিসেবে আমার কমিউনিটির মাধ্যমে প্রচার করছি। আমি তো আর সিনেমা বা থিয়েটার করতে যাব না, তাই ডাক্তারিই আমার প্রচারের অস্ত্র।"

'কোনও মুসলিমও যদি এসে জয় শ্রী রাম...'

আমজনতাকে নিজের আদর্শে প্রভাবিত করে ‘পলিটিক্যাল গেম চেঞ্জার’ বা ‘মোটিভেটর’ হতে চান তিনি। এমনকি ভবিষ্যতে ‘জয় শ্রী রাম হসপিটাল’ বা এই নামে বিশেষ ক্যাম্প করার পরিকল্পনাও তাঁর রয়েছে।

চিকিৎসা পেশার নিরপেক্ষতা লঙ্ঘনের অভিযোগ প্রসঙ্গে তিনি জানান, "নিরপেক্ষতা পুরোপুরি বজায় আছে। আমি নির্দিষ্ট কোনও দলের রোগী দেখব না, এমনটা কোথাও বলিনি। আমার কাছে সবাই আসতে পারেন এবং আমি অনেককে বিনামূল্যেও চিকিৎসা করি। এমনকি কোনও ইসলাম ধর্মাবলম্বী মানুষও যদি এসে ‘জয় শ্রী রাম’ বলেন, তবে তিনিও এই ছাড় পাবেন। না বললে পাবেন না। অনেক রাষ্ট্রবাদী মুসলিম যেমন বন্দে মাতরম বা জয় শ্রী রাম বলেন, আমি তাঁদের সবার জন্যই কাজ করি।"

ডাঃ হাজরা স্পষ্ট করে দিয়েছেন যে, তিনি কোনও ক্ষতি করছেন না, বরং মানবসেবার মাধ্যমেই বিজেপির হয়ে প্রচার করছেন। প্রয়োজনে আগামী দিনে দলের প্রার্থী হতেও তিনি প্রস্তুত এবং নির্বাচন মিটে গেলেও তাঁর এই বিশেষ ছাড়ের ব্যাপারটি জারি থাকবে বলে তিনি জানিয়েছেন।

নীতি বিরোধী: প্রতিক্রিয়া চিকিৎসক মহলের

চিকিৎসকদের একটা বড় অংশ এই ঘটনায় স্তম্ভিত। তাঁদের মতে, একজন হৃদরোগ বিশেষজ্ঞ যখন দেখেন তাঁর কাছে আসা রোগী যন্ত্রণায় ছটফট করছেন, তখন তাঁর পরিচয় কেবলই ‘রোগী’। সেখানে রাজনীতির অনুপ্রবেশ ঘটানো চিকিৎসা শাস্ত্রের অমর্যাদা।

ডাঃ নারায়ণ বন্দ্যোপাধ্যায় ও ডাঃ সুবর্ণ গোস্বামী উভয়েই এই পদক্ষেপের তীব্র নিন্দা জানিয়েছেন। ডাঃ নারায়ণ বন্দ্যোপাধ্যায়, যিনি নিজেও ব্যক্তিগতভাবে বিজেপির আদর্শকে সমর্থন করেন এবং কিছু দিন আগেই বিজেপির ব্রিগেড সমাবেশে গিয়ে বিতর্কের মুখে পড়েছিলেন, তিনি স্পষ্ট জানিয়েছেন যে, ব্যক্তি হিসেবে মতামত দেওয়া গেলেও চিকিৎসার পেশাকে কখনওই রাজনৈতিক অস্ত্র করা উচিত নয়। তাঁর মতে রোগী ও চিকিৎসকের সম্পর্ক অত্যন্ত পবিত্র এবং ধর্ম বা স্লোগান দিয়ে চিকিৎসার ফি নির্ধারণ করা মানবিকতার পরিপন্থী, কারণ একজন চিকিৎসকের চোখে সব ধর্মের মানুষই সমান।

তাঁর কথায়, “আমার কাছে তো বামপন্থী নেতারাও চিকিৎসা করেন, তৃণমূলের নেতারাও ভর্তি থাকেন, বিজেপির নেতাদেরও চিকিৎসা করি। সেখানে আমার কাছে কোনও ভেদাভেদ নেই কারও প্রতি। রোগী দেখতে গিয়ে অনেকের সঙ্গে রাজ্য-রাজনীতি নিয়ে আলোচনাও হয়, মতাদর্শ বিনিময়ও হয়, কিন্তু এভাবে কোনও নির্দিষ্ট দলীয় স্লোগান সামনে রেখে ডাক্তারি করাটা একেবারেই এথিক্যাল মনে করছি না।”

'লজ্জায় মাথা কাটা যাচ্ছে'

বামপন্থী চিকিৎসক ডাঃ সুবর্ণ গোস্বামীও এই ঘটনাকে চিকিৎসার এথিক্স-বিরোধী ও সাম্প্রদায়িকতার অনুপ্রবেশ হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। তিনি হিটলারের আমলের নাৎসি মতাদর্শী চিকিৎসকদের কলঙ্কিত ইতিহাসের উদাহরণ টেনেছেন এবং জানিয়েছেন যে, রোগীর কোনো জাত বা ধর্ম হয় না, তাই ডাঃ হাজরার মতো বলিষ্ঠ চিকিৎসকের এমন কাজ অত্যন্ত লজ্জাজনক ও নিন্দনীয়।

তিনি সরাসরি বলেন, "একজন চিকিৎসকের এই সিদ্ধান্তকে তীব্র ঘৃণা করি। রাগে গা রি রি করছে। ডাঃ হাজরার মতো একজন সিনিয়র চিকিৎসক যা করেছেন তাতে লজ্জায় মাথা কাটা যাচ্ছে। তীব্র প্রতিবাদ জানাই।"

শপথের অবমাননা! তোপ শান্তনু সেনের

এই খবর প্রকাশ্যে আসতেই চিকিৎসকদের পেশাদার নৈতিকতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন ডাঃ শান্তনু সেনও। তিনি নিজেও তৃণমূলের নেতা। পাশাপাশি, একজন সাধারণ নাগরিক এবং চিকিৎসক হিসেবে এই পদক্ষেপের তীব্র প্রতিবাদ জানিয়ে তিনি বলেন, "রাজনীতি করার অধিকার প্রত্যেকের আছে। কিন্তু চিকিৎসা একটা অত্যন্ত পবিত্র পেশা। এমবিবিএস পাশ করার পর প্রত্যেককে শপথ নিতে হয় যে প্রতিটি মানুষকেই সমানভাবে পরিষেবা দেব। বিভিন্ন রোগীকে কখনওই কোনও ধর্মের বা রাজনৈতিক দলের চশমা পরে দেখা উচিত নয়।"

ইন্ডিয়ান মেডিক্যাল অ্যাসোসিয়েশনের প্রাক্তন সর্বভারতীয় সভাপতি তথা বর্তমান রাজ্য সম্পাদক হিসেবে ডাঃ সেন স্পষ্ট করেছেন যে, চিকিৎসার মতো পরিষেবাকে রাজনৈতিক বা ধর্মীয় স্লোগানের মাধ্যমে শ্রেণিভুক্ত করা চিকিৎসাবিদ্যার শপথ বা নীতির পরিপন্থী।

সব মিলিয়ে ডক্টর হাজরার উল্টোদিকে যে কথাটি উঠে আসছে, সেটি হল, আর্তের সেবায় চিকিৎসকের একমাত্র ধর্ম হলো মানবিকতা। কিন্তু এই ‘স্লোগান বনাম ডিসকাউন্ট’ রাজনীতি সেই চিরাচরিত ধ্রুবসত্যকে এক নজিরবিহীন চ্যালেঞ্জের মুখে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে। প্রশ্ন উঠছে, চেম্বারের দরজায় রাজনীতির এই কাঁটাতার কি ভবিষ্যতে সাধারণ মানুষের শেষ আশ্রয়স্থলকেও বিভাজনের রঙে রাঙিয়ে দেবে!


```