Date : 14th Apr, 2026 | Call 1800 452 567 | info@thewall.in
IPL 2026: পয়লা ওভারেই ৩ উইকেট, স্বপ্নের আইপিএল অভিষেক! কে এই প্রফুল্ল হিঙ্গে?ইরান-মার্কিন বৈঠক ব্যর্থ নেতানিয়াহুর ফোনে! ট্রাম্পের প্রতিনিধিকে কী এমন বলেছিলেন, খোলসা করলেন নিজেইWeather: পয়লা বৈশাখে ঘামঝরা আবহাওয়া! দক্ষিণবঙ্গে তাপপ্রবাহের হলুদ সতর্কতা, আবার কবে বৃষ্টি?হরমুজ ঘিরে ফেলল মার্কিন সেনা! ইরানের 'শ্বাসরোধ' করতে ঝুঁকির মুখে আমেরিকাও, চাপে বিশ্ব অর্থনীতি'ভয় দেখিয়ে মুখ বন্ধ করা যাবে না', আইপ্যাক ডিরেক্টরের গ্রেফতারিতে বিজেপিকে হুঁশিয়ারি অভিষেকেরভোটের মুখে ইডির বড় পদক্ষেপ! কয়লা পাচার মামলায় গ্রেফতার আইপ্যাক ডিরেক্টর ভিনেশ চান্ডেলমহাকাশে হবে ক্যানসারের চিকিৎসা! ল্যাবের সরঞ্জাম নিয়ে পাড়ি দিল নাসার ‘সিগনাস এক্সএল’সঞ্জু-রোহিতদের পেছনে ফেলে শীর্ষে অভিষেক! রেকর্ড গড়েও কেন মন খারাপ হায়দ্রাবাদ শিবিরের?আইপিএল ২০২৬-এর সূচিতে হঠাৎ বদল! নির্বাচনের কারণে এই ম্যাচের ভেন্যু বদলে দিল বিসিসিআইWest Bengal Election 2026 | হার-জিত ভাবিনা, তামান্না তো ফিরবেনা!

দেবী ভোগ রাঁধেন, তিনি কি চুলও বাঁধেন লক্ষ্মী-সরস্বতীর! চিল্কিগড়ের কনকদুর্গা যেন রহস্যগল্প

চিল্কিগড়ের কনক দুর্গা মন্দিরে (Chilkigad Kanak Durga Temple) মহাষ্টমীর ভোগ নাকি রাঁধেন স্বয়ং মা দুর্গা (Maa Durga)। পাঁচশো বছরের পুরোনো এই শক্তিপীঠ ঘিরে আজও রহস্য, কিংবদন্তি আর গা ছমছমে কাহিনি।

দেবী ভোগ রাঁধেন, তিনি কি চুলও বাঁধেন লক্ষ্মী-সরস্বতীর! চিল্কিগড়ের কনকদুর্গা যেন রহস্যগল্প

চিল্কিগড়ের কনক দুর্গা।

নিশান্ত চৌধুরী

শেষ আপডেট: 22 September 2025 16:12

দ্য ওয়াল ব্যুরো: ঝাড়গ্রাম শহর থেকে প্রায় ১৪-১৫ কিলোমিটার দূরে, ঘন অরণ্য আর ডুলুং নদীর ধারে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে এক অদ্ভুত রহস্যে মোড়া মন্দির— চিল্কিগড়ের কনক দুর্গা মন্দির (Chilkigad Kanak Durga Temple)। প্রায় ৫০০ বছরের পুরোনো এই শক্তিপীঠ ঘিরে প্রচলিত আছে অগণিত কাহিনি, কিংবদন্তি ও অলৌকিক কিস্‌সা। 

কথায় বলে, যিনি রাঁধেন তিনি চুলও বাঁধেন। অর্থাৎ তিনি আদর্শ ঘরণী। বাংলা ও বাঙালির মননে মা দুর্গাও তাই। মা কনক দুর্গা মেয়ে লক্ষ্মী ও সরস্বতীর চুল বেঁধে দেন কিনা, এমন অবশ্য কোনও লোককথা নেই। তবে স্থানীয়রা বলেন, মহাষ্টমীর রাতে এখানে যে ভোগ নিবেদন করা হয়, তা রাঁধেন স্বয়ং মা দুর্গা! এই বিশ্বাসই আজও হাজার হাজার মানুষকে আকর্ষণ করে নিয়ে আসে গভীর অরণ্যের বুক চিরে তৈরি এই মন্দিরে।

লোককথা বলছে, এই জনপদের নাম একসময়ে ছিল তিহার দ্বীপগড়, পরে সেটি হয়ে ওঠে চিল্কিগড়। শোনা যায়, সামন্ত রাজা গোপীনাথ সিংহ এক স্বপ্নাদেশে মায়ের মন্দির নির্মাণের নির্দেশ পান। রানির হাতের সোনার কাঁকন এবং প্রায় ন’শো সের সোনা দিয়ে তিনি নির্মাণ করেন দেবীর প্রতিমা। সেই থেকেই নাম হয় ‘কনক দুর্গা’।

প্রথমে ছিল পাথরের প্রতিমা, পরে স্বর্ণমূর্তি। তবে ইতিহাসে লিপিবদ্ধ আছে— বহুবার সেই মূর্তি চুরি গিয়েছে। আজ মন্দিরে যে মূর্তিতে পূজা হয়, তা অষ্টধাতুর তৈরি নবনির্মিত প্রতিমা। দেবীকে এখানে দেখা যায় অশ্বারোহিণী চতুর্ভূজা রূপে।

গা ছমছমে রীতি: বলি আর ‘বিরাম ভোগ’

এই মন্দিরের পুজো শুধু প্রাচীন নয়, বরং লোকবিশ্বাসে মোড়া। ষষ্ঠীর দিন রাজবাড়ি থেকে খড়্গ ও পূর্ণঘট শোভাযাত্রার মাধ্যমে আনা হয় মন্দিরে। মহাষ্টমীতে হয় পাঁঠাবলি। এক সময়ে নরবলির প্রচলন ছিল শোনা যায়, যা সময়ের সঙ্গে বন্ধ হয়েছে। এখন পালিত হয় মোষ বলির প্রথা।

কিন্তু সবচেয়ে রহস্যময় হলো নবমীর ভোগ— ‘বিরাম ভোগ’। বলা হয়, বলির মাংস নতুন মাটির হাঁড়িতে রেখে শালপাতা দিয়ে মুখ বন্ধ করে উনুনে চাপিয়ে দেওয়া হয়। ঘরের দরজা বাইরে থেকে তালা বন্ধ করে দেওয়া হয়। পরে নির্দিষ্ট সময়ে যখন হাঁড়ি খোলা হয়, দেখা যায় রান্না সম্পূর্ণ হয়ে গেছে। ভক্তদের বিশ্বাস, এ রান্না করেছেন স্বয়ং মা দুর্গা। এই অলৌকিক বিশ্বাসই কনক দুর্গার আসল রহস্যকে আজও অক্ষত রেখেছে।

এখানকার ভোগেও রয়েছে ভিন্নতা। প্রতিদিন দেবীকে নিবেদন করা হয় হাঁসের ডিম, মাছ, এমনকি পান্তাভাতও। স্থানীয় সংস্কৃতিতে পেঁয়াজ, রসুন, মুসুর ডালকেও ধরা হয় আমিষ ভোগের অন্তর্গত। বিজয়া দশমীর দিনে বিশেষভাবে দেওয়া হয় পান্তাভাত, শাকভাজা আর মাছ পোড়া।

মন্দিরের সৌন্দর্য শুধু দেবী পূজার আচারেই সীমাবদ্ধ নয়, চারপাশের অরণ্যও যেন রহস্যে ভরা। প্রায় ৭০ একর জুড়ে রয়েছে ঔষধি গাছের বনভূমি। প্রায় ৪৩৩ প্রজাতির ভেষজ গাছ পাওয়া যায় এখানে। বলা হয়, রাজা গোপীনাথের উত্তরসূরীরাই প্রথম এই ঔষধি বনাঞ্চল তৈরি করেছিলেন। আজও সারা ভারত থেকে গবেষকরা আসেন এই অরণ্যে।

মন্দিরে পৌঁছতে হলে জঙ্গলের আঁকাবাঁকা পথ ধরে হেঁটে যেতে হয়। দু’পাশে রেলিং দেওয়া পথ, মাঝে মাঝে বাঁদরের উৎপাত— পুরো যাত্রাই যেন এক রোমাঞ্চকর অভিজ্ঞতা।

চিল্কিগড়ে আজও শোনা যায় একাধিক কাহিনি। একসময়ে এক প্রৌঢ় বজ্রবিদ্যুৎ-সহ প্রবল বর্ষণকে দেবী মহামায়ার আশীর্বাদ হিসেবে ব্যাখ্যা করেছিলেন। আবার অন্য গল্পে শোনা যায়, এক পুরোহিতকে দেবী প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন— অন্ধকার জঙ্গলে ফিরতে হলে তিনি যেন পিছন ফিরে না তাকান। বহু বছর ধরে পুরোহিত সেই নির্দেশ মেনে নিরাপদে ফিরেছিলেন, আর এভাবেই ছড়িয়ে পড়ে দেবীর অলৌকিক সুরক্ষার কাহিনি।

মন্দিরটির স্থাপত্যে ওড়িশার মন্দির শৈলী আর স্থানীয় লোকঐতিহ্যের প্রভাব সুস্পষ্ট। দৈনন্দিন জীবনের নানান দৃশ্য খোদাই করা আছে মন্দিরের গায়ে, যদিও সময়ের সঙ্গে সেগুলি ক্ষয়প্রাপ্ত হয়েছে। স্থাপত্য বিশেষজ্ঞরা বলেন, মন্দিরটি অন্তত তিন-চারশো বছরের পুরোনো। কারও কারও মতে, এটি কোনারকের সূর্য মন্দিরের সঙ্গে মিল খুঁজে দেয়।

মন্দিরের সামনে রয়েছে একটি তিনশো বছরেরও পুরোনো বটগাছ। স্থানীয়রা একে পবিত্র মনে করেন। গাছের ছায়াতেই প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে চলে আসছে নানান আচার। বানরদেরও এ অঞ্চলে দেবীর দূত হিসেবে মানা হয়।

চিল্কিগড় রাজবাড়ির ইতিহাস ধলভূম রাজবংশের সঙ্গে জড়িয়ে আছে। গোপীনাথ সিংহ থেকে শুরু করে পরবর্তী রাজারা এই মন্দিরের রক্ষণাবেক্ষণ করতেন। স্থানীয় সমাজে ব্রাহ্মণ, সাঁওতাল, বাগদি, বাউরিস— সবাই মিলে এক সাংস্কৃতিক মেলবন্ধন তৈরি করেছে। দুর্গাপুজোর সময় সেই মেলবন্ধন যেন আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে।

আজ কনক দুর্গা মন্দির শুধু পূজার স্থান নয়, পর্যটনেরও বড় আকর্ষণ। ডুলুং নদীর ধারে শাল-পলাশ-অর্জুনের অরণ্যে ঘেরা এই মন্দিরে প্রতিবছর পুজোর সময় হাজার হাজার মানুষ ভিড় করেন। স্থানীয় প্রশাসনের উদ্যোগে তৈরি হয়েছে অতিথি নিবাস, শিশুদের পার্ক, নৌযান— সব মিলিয়ে এটি আজ পরিবেশ পর্যটনের একটি কেন্দ্র।

তবে ভক্তদের কাছে আসল টান সেই অলৌকিক ভোগ আর অরণ্যের রহস্যময় আবহ। মহাষ্টমীর নিশিপুজো কিংবা নবমীর বিরাম ভোগ— প্রতিটি আচারে যেন গা ছমছমে শিহরণ জড়িয়ে থাকে।

চিল্কিগড়ের কনক দুর্গা মন্দির কেবল একটি প্রাচীন শক্তিপীঠ নয়, বরং এটি বাংলার এক জীবন্ত ইতিহাস। রাজকথা, অলৌকিক কাহিনি, নরবলির প্রথা, অরণ্যের রহস্য— সব মিলিয়ে এই মন্দির আজও বিস্ময় আর ভক্তির কেন্দ্র। স্থানীয়রা বিশ্বাস করেন, এখানে দেবী সত্যিই জাগ্রত, আর মহাষ্টমীর ভোগ আজও স্বয়ং মা দুর্গাই রাঁধেন।

অতীতের গহ্বর আর বর্তমানের ভক্তির মেলবন্ধনে কনক দুর্গা তাই আজও রহস্যময়, অদ্ভুত, আর গা ছমছম করা এক তীর্থক্ষেত্র।


```