দ্য ওয়াল ব্যুরো: নিজামুদ্দিনের দরগায় তবলিঘিদের জামাত-জমায়েত যে দেশে করোনা সংক্রমণ বাড়িয়ে তোলার কারণ হয়ে উঠেছে, এটি তথ্যলব্ধ সত্য। কারণ দেশে সংক্রমণের সংখ্যা যে পাঁচ হাজার ছাড়িয়েছে, তার এক তৃতীয়াংশেই মিলেছে এই জামাত-যোগ। এ নিয়ে সমালোচনার ঝড় বয়েছে দেশজুড়ে। কিন্তু একইসঙ্গে চারিয়ে গিয়েছে একটি বিশেষ সম্প্রদায়ের প্রতি বিদ্বেষও। সেই সম্প্রদায়েরই শিক্ষিত ও অগ্রণী অংশ এমনটাই অভিযোগ তুলেছেন সাম্প্রতিক এই ঘটনার জেরে। তাঁদের দাবি, যেটা ভুল বা অন্যায়, সেটা সেই চোখেই দেখা হোক। বিশেষ সম্প্রদায়ের প্রতি ঘৃণার চেখে নয়।
জমিয়ত উলেমা-ই-হিন্দের প্রেসিডেন্ট আরশাদ মদানির কথায়, "দেশের অধিকাংশ মানুষের চোখে এখন প্রতিটি মুসলমান ব্যক্তি যেন শত্রু হয়ে উঠেছে। এমনটা বাঞ্ছনীয় নয়।" তাঁর অভিযোগ, "একশ্রেণির মানুষ চাইছে যে প্রতিটা হিন্দু যেন ভাবেন, মুসলমানদের থেকে বিপদ আসতে পারে তাঁদের। সেই একশ্রেণির মানুষ সাধারণ মানুষকে উৎসাহিত করছে মুসলমানদের ঘৃণা করতে, দূরত্ব বজায় রাখতে।"
নয়াদিল্লির নিজামুদ্দিন এলাকার ওই ইসলামি সভাকে অজুহাত করে ভারতের পুরো মুসলিম সম্প্রদায়ের ওপরেই একরকম আক্রমণ হানা হচ্ছে বলে দাবি করেছে জমিয়ত উলেমা-ই-হিন্দ। একইসঙ্গে, দেশজুড়ে ইসলামবিরোধী প্রচারণা বন্ধের আহ্বান জানিয়েছে তারা। মঙ্গলবার ওই সংগঠনের তরফে সুপ্রিম কোর্টে একটি পিটিশনও দায়ের করা হয়েছে। হাইকোর্টকে তারা জানিয়েছে, মুসলমানদের শত্রুর চেহারা দেওয়া হচ্ছে। এতে রীতিমতো হুমকির মুখে পড়েছে মুসলিম সমাজ। মুসলিমদের বিরুদ্ধে বিদ্বেষ ছড়ানোর উদ্দেশে কোনও সংবাদমাধ্যম যদি ভুয়ো খবর প্রচার করে, তাদের বিরুদ্ধে যেন শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়, এই আবেদনও জানিয়েছে ওই সংগঠন।
আরশাদ মদানি আরও বলেন, "যখনই কোথাও কোনও জঙ্গি হানা হয়, তখনও সেই জঙ্গি হানার সঙ্গে মুসলমানদের যোগ খুঁজে বার করে গোটা মুসলিম সমাজকে কাঠগড়ায় দাঁড় করানো হয়। এখনও ঠিক সেটাই হচ্ছে। এমন ভাবে বিষয়টি দেখানো হচ্ছে, যেন গোটা দেশে করোনা-বিপর্যয় ঘটেছে শুধু ইসলম ধর্মে বিশ্বাসী মানুষদের জন্যই। দুর্ভাগ্যজনক বিষয় হল, এত বড় মহামারী চলছে দেশজুড়ে, তখনও একাংশের মানুষ হিন্দু-মুসলিম ইস্যু তৈরিতে ব্যস্ত থাকছেন।"
মার্চ মাসের মাঝামাঝি দিল্লির নিজামুদ্দিন দরগায় যে তবলিঘিদের জমায়েত হয়, তাতে বিদেশ থেকে বহু মানুষ এসে যোগ দিয়েছিলেন। দেশের নানা প্রান্তের হাজার তিনেক মানুষ জড়ো হয়েছিলেন সেখানে। যদিও কোনও জমায়েত তখনও দেশে নিষিদ্ধ বলে ঘোষিত হয়নি তখন, তবু পরবর্তীকালে করনো সংক্রমণের হটস্পট হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে এই জমায়েতই।
দিল্লির জামা মসজিদের শাহি ইমাম সৈয়দ আহমেদ বুখারি বলেন, "তবলিঘিদের আরও সতর্ক ও সচেতন হওয়া অবশ্যই উচিত ছিল, কিন্তু এটা দোষারোপের সময় নয়। সমস্যা কী করে সমাধান হবে, সেদিকেই জোর দেওয়া উচিত এখন।"
"তবলিঘিদের জমায়েতকে কেউ সমর্থন করছে না, কেউ না। আমরাও করছি না। কিন্তু ওই একই সময়ে দেশে বহু নেতা-মন্ত্রী সংসদে জমায়েত করেছেন, কেউ কেউ বিয়েবাড়িতেও গেছেন। সেগুলো যতটা অন্যায়, তবলিঘিদের জমায়েতটাও ততটাই অন্যায়। তাঁরা দেশের বিরুদ্ধে কোনও ষড়যন্ত্র করেছেন, এমনটা তো নয়। অথচ বিষয়টিকে এমনই চেহারা দেওয়া হচ্ছে।"-- মন্তব্য করেন জামাত-ই-ইসলামি হিন্দের সাধারণ সম্পাদক ইজাজ আসলাম।
আসাউদ্দিন ওয়াইসিও এদিন টুইটে লেখেন, "অপরিকল্পিতভাবে লকডাউনের সমালোচনা এড়াতে এবং নতুন করে কোভিড ১৯-এর সংক্রমণে ব্যর্থ সরকার মানুষের দৃষ্টি অন্যদিকে ঘোরাতেই এসব করছে। বিজেপি প্রচারকদের জানা উচিত যে এভাবে হোয়াটসঅ্যাপ ফরোয়ার্ডের মাধ্যমে করোনাভাইরাসকে হারানো সম্ভব নয়। ... মুসলিমদের বলির পাঁঠা বানালেই করোনার ওষুধ মিলবে না।"
https://twitter.com/asadowaisi/status/1247579244714004480
আর এক ইসলামি সংগঠনের মুখপাত্র মাহমুদ মাদানি বলেন, "এই জমায়েতকে অজুহাত করে মুসলিমদের বিরুদ্ধে এমনই সমস্ত প্রচারণা চলছে, যাতে সামাজিক ভাবে মারাত্মক অপমানের মুখে পড়তে হচ্ছে। বহু এলাকায় মুসলিমদের ঢুকতেই দেওয়া হচ্ছে না। মুসলিম গর্ভবতী মহিলারা চিকিৎসা পাচ্ছেন না দেশের নানা প্রান্তে। বিদ্রুপে ও আক্রমণে এক মুসলিম ব্যক্তির আত্মহত্যা করার ঘটনাও ঘটেছে। এসবের মধ্যেও দেশে করনা সংক্রমণ যেভাবে বাড়ছে, তাতে আজ হোক বা কাল এমন অনেক সংক্রমণের খবর মিলবে, যেগুলির সঙ্গে কোনও ভাবেই জামাত যোগ নেই। তখন কি তাঁদেরও অপরাধী করা হবে এভাবেই?"
একইসঙ্গে মুসলিম সম্প্রদায়ের মুখপাত্ররা সকলেই বলেন, সরকার যা করছে, মানুষের জন্যই করছে। এই মহামারী পরিস্থিতিতে সরকারি নিষেধাজ্ঞা ও নির্দেশ পালন করাই উচিত। কোনও সম্প্রদায়ের কেউ যদি তা ভঙ্গ করেন, তবে তা নিন্দনীয় ও শাস্তিযোগ্য অপরাধ। এমনকি কেউ যদি ধর্মের নামে বা প্রার্থনার নামেও নিয়ম ভাঙেন, তবে সেটাও অপরাধ।