দ্য ওয়াল ব্যুরো: দুপুর তখন ১২টা। পাড়ার উঠতি বয়সে একটা ছেলে তাঁর কাছে এসেছিল চুলে ‘মোহক’ করাতে। অদ্ভূতুড়ে স্পাইক করা স্টাইল বানানোর বিস্তর দাবিদাওয়া সামলে কোনও রকমে চুলকাটা শেষ করেছেন এলাকার পরিচিত নাপিত মহম্মদ শাহজাদ। হঠাৎই ফোন বাজল তাঁর। আল হিন্দ হাসপাতাল থেকে কল করেছেন এক চিকিৎসক। কিন্তু নাপিতের সঙ্গে চিকিৎসকের কী দরকার!
২৪ ফেব্রুয়ারি দুপুরে ডাক্তারের জরুরি তলবের কারণ স্পষ্ট হয়ে যায় তখনই। একের পর এক আহত মানুষ ঢুকছেন আল হিন্দ হাসপাতালে। কারও মাথা ফেটে গেছে, কারও কানের পাশ দিয়ে রক্ত গড়াচ্ছে। কারও বা থেঁতলে গেছে খুলি। এখুনি দরকার চিকিৎসার। আর তার জন্য দরকার মাথার চুল কামানো। নইলে ভালভাবে ড্রেসিং করা সম্ভব হবে না, সম্ভব হবে না সংক্রমণ এড়ানোও।
বিপদ বুঝেছিলেন মুস্তাফাবাদ এলাকার বাসিন্দা এবং সেলুনমালিক শাহজাদ। বুঝেছিলেন, একা সামাল দিতে পারবেন না এত রোগীর চাপ। তাই সঙ্গে সঙ্গে ডেকে নিয়েছিলেন কাছেই আর একটি ছোট সেলুনের নাপিত ওয়াসিমকে।
তার পরে ঝড়ের মতো পেরিয়ে গেছিল সময়। এত দিন ধরে সেলুন চালিয়ে আসা দুই নাপিত কখনও দুঃস্বপ্নেও ভাবতে পারেননি, এত এত রক্তাক্ত মাথা কামাতে হতে পারে তাঁদের। ভাবতে পারেননি, তাঁদের কাজটা কখনও এত জরুরি হয়ে উঠতে পারে মানুষের প্রাণ বাঁচাতে।
গত রবিবার রাত থেকে উন্মত্ত জনতার হামলায় বিধ্বস্ত উত্তর-পূর্ব দিল্লি। পাথর, ছুরি, লাঠি, গুলি নিয়ে হামলা চলেছে এলোপাথাড়ি। জ্বালিয়ে দেওয়া হয়েছে একের পর এক মহল্লা। প্রাণ বাঁচাতে পাগলের মতো ছুটেছেন মানুষ। নিহত হয়েছেন প্রায় ৫০ জন। আর আহতের সংখ্যা ছাড়িয়েছে কয়েকশো। রক্ত, ক্ষত, ভাঙচুরের কোনও সীমা-পরিসীমা নেই। মুস্তাফাবাদ এলাকা এই আক্রমণেই বিধ্বস্ত হয়ে যায়। আর এলাকার একমাত্র হাসপাতাল এই আল হিন্দ। ফলে সেখানে যে কী চাপ পড়েছে রোগীর, তা বলাই বাহুল্য।
২৫ বছরের যুবক শাহজাদ বলছিলেন, “মাথায় চোট নিয়ে একের পর এক রোগী আসছিলেন। আমরা রবিবার রাত থেকেই জানতাম, গোলমাল চলছে চার দিকে। কিন্তু আমরা আল হিন্দ পৌঁছনোর আগে ভাবতে পারিনি, ঠিক কতটা খারাপ অবস্থা চারপাশে।”
মাথায় চোট নিয়ে কোনও রোগী আসা মাত্র তাঁদের মাথা কামিয়ে অপারেশনের জন্য তৈরি করছিলেন শাহজাদ ও ওয়াসিম। কারও কারও অবশ্য ড্রেসিংয়েই কাজ হয়ে যাচ্ছিল। ওয়াসিম বলছিলেন, “প্রথম যাঁর মাথা কামালাম, তিনি মুস্তাফাবাদেরই মানুষ। দাঙ্গাকারীরা ওঁর মাথায় লোহার রড দিয়ে একাধিক বার মেরেছিল। এত রক্তের মধ্যে আমি কখনও কারও মাথার চুল কাটিনি! চুল কাটতে কাটতেই শুনলাম, মানুষটি চাঁদবাগে ওঁর স্ত্রীর সঙ্গে দেখা করতে যাচ্ছিলেন। সে সময়েই পড়ে যান গুন্ডাদের মুখে। আমি কোনও দিন ভুলতে পারব না এই চুলকাটার কথা।”
বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে রোগীর সংখ্যা বাড়তে থাকে। তখন আর শুধু মাথা কামানো নয়, পাশাপাশি ফার্স্ট এইডও দিতে শুরু করেন দুই নাপিত। স্বাভাবিক ভাবেই রোগীর সংখ্যার তুলনায় চিকিৎসক যথেষ্ট ছিলেন না ছোট্ট ওই হাসপাতালে। শাহজাদ বলতেন, “ছোটখাটো ফার্স্ট এইড আমরা সকলেই জানি। যেটা জানতাম না, সেটাও এক ঘণ্টার মধ্যে শিখে নিলাম। শিখে নিতে বাধ্য হলাম। উপায় ছিল না কোনও।”
কিন্তু রাত বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে এত জখম মানুষ আসতে থাকেন, রীতিমতো ভয় পেয়ে যান শাহজাদ ও ওয়াসিম। চিরকাল শান্তিপূর্ণ এলাকায় বড় হয়েছেন তাঁরা, ব্যবসা করেছেন নিজের। কখনও কোনও গন্ডগোল হয়নি। আর সেখানেই আজ এমন রক্তের স্রোত!
আল হিন্দ হাসপাতালের চিকিৎসক মিরাজ একরাম বললেন, “ওরা সময়মতো এসে আমাদের পাশে না দাঁড়ালে যে কী বিপদে পড়তাম! ওরা চুল কাটার জন্য এলেও, পরে ওদের বেসিক ফার্স্ট এইড শিখিয়ে দিলাম। সিপিআর-ও দিতে শিখল ওরা। ওরা আসলে যে কোনও সাহায্য করার জন্য রেডি ছিল।”
সেই রবিবার রাত থেকে টানা এক সপ্তাহ বাড়ি যাওয়া হয়নি চিকিৎসক একরামের। মাথা তুলতে পারেননি রোগীদের উপর থেকে। এই ক’দিনে হাজারেরও বেশি রোগী দেখেছেন। প্রায় দু’লাখ টাকার ওপরে ওষুধ বিলি করেছেন। বিনা পয়সায় চিকিৎসা করে গিয়েছেন। “আমাদের কিছু ভাবার সময় ছিল না। মানুষ মরে যাচ্ছিল।”—বললেন চিকিৎসক। মুস্তাফাবাদের সব দোকানপাট বন্ধ থাকলেও, খোলা ছিল হাসপাতালসংলগ্ন ওষুধের দোকান।
একটানা দাঁড়িয়ে থেকে অসংখ্য মানুষের মাথা কামিয়ে আর ড্রেসিং করিয়ে ক্লান্ত হয়ে গিয়েছেন শাহজাদ আর ওয়াসিম। আর দাঁড়িয়ে থাকার ক্ষমতা নেই তাঁদের। এবার হয়তো চিকিৎসা প্রয়োজন তাঁদের নিজেদেরই।
কিন্তু এত দিন কেবল চুল কেটেছেন শাহজাদ ও ওয়াসিম। ভাবতে পারেননি, কখনও তাঁরা এভাবে এত মানুষের প্রাণও বাঁচাবেন। এই অনুভূতির কোনও তুলনা হয় না, বলছেন দু’জনেই। শারীরিক কষ্ট, মানসিক যন্ত্রণা তুচ্ছ হয়ে যায় মানুষের বিপদে পাশে দাঁড়াতে পারার তৃপ্তিতে।