
শেষ আপডেট: 1 May 2019 15:50
তোমবাজির দেখা পায়ের ছাপ।[/caption]
এর প্রায় ১০০ বছর পরে, ২০১৯ সালের ৯ এপ্রিল ফের ইয়েতি নামক কাল্পনিক তুষারদৈত্যর উপস্থিতির দাবি তুলেছে ভারতীয় সেনা। তারা টুইট করে জানিয়েছে, মাকালু অভিযানে গিয়ে বিশালাকৃতি প্রাণীর পায়ের ছাপ দেখেছেন তাঁরা। পায়ের ছাপের ছবিও পোস্ট করেছেন। তাঁদের এই দাবির পরেই ফের আলোড়ন পড়েছে ইয়েতি নিয়ে। পক্ষে-বিপক্ষের মতামতে সরগরম হয়ে উঠেছে পর্বতারোহী মহল, নেট-দুনিয়া। আর সেই দাবি খতিয়ে দেখতে গিয়েই উঠে এসেছে ১৯২৫ সালের এই ঘটনা।
তবে ইতিহাসের দিক থেকে ১৯২৫ প্রথম হলেও, তারও অনেক আগে থেকে, এমনকী বুদ্ধদেবেরও জন্মের আগে থেকে হিমালয়ের বিভিন্ন এলাকায় পাহাড়ি গ্রামে বসবাসকারী মানুষদের মনের মধ্যে বিশ্বাস ছিল ইয়েতির উপস্থিতির। তাঁরা মানতেন, বরফের রাজ্যে বাস করেন পাহাড়ের ঈশ্বর। তাঁকে চটালে ভয়াল রূপ ধরেন তিনি। সেই রূপেরই নাম ইয়েতি।
তবে ১৯২৫ এবং ২০১৯-এর দু'রকম দাবির মাঝামাঝি, ইয়েতি নিয়ে সব চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দাবিটি উঠেছিল ১৯৫৩ সালে। আর তা তুলেছিলেন স্বয়ং এডমন্ড হিলারি। পৃথিবীর উচ্চতম শৃঙ্গ এভারেস্টে প্রথম আরোহণের কৃতিত্বের অধিকারী হিলারি তাঁর আত্মজীবনীতে লেখেন, এভারেস্টের পথে তুষার মানবের বিশাল বড় বড় পায়ের ছাপ দেখেছিলেন তিনি এবং তাঁর সহ-আরোহী তেনজিং নোরগে। যদিও হিলারি লিখেছিলেন, তিনি ইয়েতির উপস্থিতিতে বিশ্বাস করেন না। কিন্তু তেনজিং জোর দিয়ে বলেছিলেন, ওটাই ইয়েতির পায়ের ছাপ।
তবে এ সব অভিজ্ঞতা তো প্রত্যক্ষ। এর বাইরে টিনটিনের কমিক্সে হোক বা কাকাবাবুর গল্পে-- বারবার ফিরে এসেছে এই ইয়েতির কথা। সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের লেখা 'কাকাবাবুর ইয়েতি অভিযান' পড়ার পর থেকেই বাঙালির কাছে বেশ ভাল রকমের আলোচ্য হয়ে উঠেছিল পাহাড়ের এই অদেখা ভয়।
সেই ভয়ই যেন আবার উস্কে দিয়েছে ভারতীয় সেনার টুইট। ৩২ ইঞ্চি লম্বা পায়ের ছাপের ছবি শেয়ার করে শুধু বাঙালি নয়, সারা দেশেই ফের ইয়েতি নিয়ে ভয়, রহস্য ও কল্পনার উপাদান জোগান দিয়েছে তারা। মাকালু অভিযানে গিয়ে বরুণ জাতীয় উদ্যানের কাছাকাছি নাকি এই অদ্ভুত কাল্পনিক প্রাণি ইয়েতির পায়ের ছাপ মিলেছে বলে জানিয়েছে তারা। বহু কাল ধরে লোকসাহিত্যে, গল্পে, উপন্যাসে, এবং মানুষের মুখে মুখে এই কাল্পনিক তুষারমানবের গল্প শোনা গেলেও আজ অব্দি একে দেখতে পাননি কেউই, নেই ছবিও। কেবল মাঝে মাঝেই বিশালাকার পায়ের ছাপ ও টুকরো কিছু জিনিস কৌতূহল বাড়িয়ে তুলেছে।
[caption id="attachment_100164" align="aligncenter" width="683"]
দিন কয়েক আগে ভারতীয় সেনার দেখা পায়ের ছাপ।[/caption]
নেপালের মানুষের মুখেমুখে ফেরা লোককথায় এই ইয়েতিকে ‘ভয়ঙ্কর তুষারমানব' বলেই বর্ণনা করা হয়েছে। মনে করা হয়েছে, তাকে খানিক বনমানুষের মতো দেখতে। তবে আকারে অনেক বড়। যার সঙ্গে অস্ত্র হিসেবে থাকে একটা বিশাল পাথর, এবং পাহাড়ে শিস দিয়ে ঘুরে বেড়ায় সে। বিশালাকার এই প্রাণি হিমালয়, সাইবেরিয়া, মধ্য ও পূর্ব এশিয়ায় বাস করে বলে নেপালের পাহাড়ি মানুষজন বিশ্বাস করেন। কিন্তু ওই বিশ্বাসই সার। প্রমাণ? নেই।
তোমবাজি থেকে শুরু করে এমন্ড হিলারি, এবং হাল আমলের সেনা পর্বতারোহী দল-- হিমালয়ের অভিযাত্রীদের অনেকেই বারেবারেই হিমালয়ের বরফের মধ্যে একটি বন্য লোমশ জন্তুর গল্প শুনিয়েছেন। ১৯২৫ সালের পর থেকে নেপালের এই হিমালয় পর্বতমালাকে ঘিরে এবং তার গভীরে দেখা না-যাওয়া ভয়ের এই কল্প-প্রাণীর গল্প সাধারণ মানুষের কাছে আজও বেশ জনপ্রিয়। বেশ কয়েক বছর ধরেই, ইয়েতির পায়ের ছাপ, লোমের অংশ এসব দেখা গিয়েছে বলে দাবি উঠেছে বারবার। কিন্তু সেই দাবিই সার। দাবির সপক্ষে আজ পর্যন্ত কেউই এই ধরনের কোনও প্রাণির কোনও বিশ্বাসযোগ্য ছবি দেখাতে পারেননি।
তিব্বতি ভাষায়, ইয়েতিকে ‘মিচে' বলা হয়, যার অর্থ ‘মানুষ ভাল্লুক'। অনেকে আবার ইয়েতিকে ‘ডিজু-তেহ' হিসাবেও উল্লেখ করেছে, যার অর্থ ভাল্লুক বা হিমালয়ের বাদামী ভালুক। এর অন্য নামগুলোর মধ্যে রয়েছে মিগই (বনমানুষের তিব্বতি নাম), বান মঞ্চি (জংলি মানুষের নেপালি নাম), মিরকা এবং কাং আদমি। কিন্তু যে নামেই ডাকা হোক না কেন, তার উপস্থিতি কখনওই ক্যামেরার লেন্সে ধরা পড়েনি আজ অবধি।
তবে ২০০৮ সালে আমেরিকার দুই অভিযাত্রী দাবি করেন যে, তাঁরা একটি অর্ধ মানুষ, অর্ধেক বানরের দেহাবশেষ খুঁজে পেয়েছেন। সেই দেহাবশেষের অংশও প্রমাণ হিসেবে দেখান তাঁরা। যদিও পরে পরীক্ষা করে জানা যায় যে, ওটি আসলে একটি রবারের তৈরি লোমশ পোশাকের অংশ। কোনও অভিযাত্রী হয়তো কোনও কারণে পরেছিলেন সেটা।
[caption id="attachment_100670" align="aligncenter" width="3600"]
হিমালয়ের বাদামি ভালুক।[/caption]
গবেষকেরা অবশ্য নিরন্তর লেগে থেকেছেন। কিন্তু এত বছরে ইয়েতির অস্তিত্বের প্রমাণ খুঁজে পেয়েছেন বলে দাবি করতে পারেননি তাঁরা। ২০১৭ সালে আন্তর্জাতিক গবেষকদের একটি দল হিমালয়ের বিস্তৃত এলাকা জুড়ে সংগৃহীত একাধিক প্রত্নতাত্ত্বিক নমুনা নিয়ে ফিল্ড-ওয়ার্কও করেন। এবং অবশেষে জানান, ওই সমস্তই আসলে পাহাড়ি ভালুকের।