বর্তমান প্রেক্ষাপটে কৃত্রিম মেধা (এআই) এবং ডেটা বিজ্ঞান রূপান্তরমূলক শক্তি হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছে, যা পরিবহণ ও লজিস্টিক ব্যবস্থাকে নতুন রূপ দিয়েছে এবং খরচ সাশ্রয় করছে।

শেষ আপডেট: 16 February 2026 00:24
পরিবহণ ও লজিস্টিক হল আর্থিক অগ্রগতির চালিকাশক্তি। আমরা যে পণ্য ব্যবহার করি, আমরা যে পথ ধরে চলি এবং যে শহরে আমরা বসবাস করি, প্রতিটি ক্ষেত্র নির্ভর করে মানুষের অবাধ চলাচল, পণ্য এবং পরিষেবার ওপর। তথাপি গোটা বিশ্বে, বিশেষত ভারতের মতো দ্রুত উন্নয়নশীল অর্থনীতির দেশে পরিবহণ ব্যবস্থা শহরের যানজট, দুর্ঘটনার হার বৃদ্ধি, জ্বালানির দাম বৃদ্ধি, কার্বন নিঃসরণ এবং ক্রমবর্ধমান জটিল সরবরাহ শৃঙ্খলের মতো চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হয়ে থাকে। প্রথামাফিক পরিকল্পনা এবং পরিচালন পদ্ধতি এই ব্যাপক মাত্রার জটিলতা সামাল দেওয়ার পক্ষে এখন আর যথেষ্ট নয়। এই প্রেক্ষাপটে কৃত্রিম মেধা (এআই) এবং ডেটা বিজ্ঞান রূপান্তরমূলক শক্তি হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছে, যা পরিবহণ ও লজিস্টিক ব্যবস্থাকে নতুন রূপ দিয়েছে এবং খরচ সাশ্রয় করছে।
পরিবহণ ক্ষেত্রে এআই এবং ডেটা বিজ্ঞান : এক আমূল পরিবর্তন
আজকের পরিবহণ ব্যবস্থায় গাড়ির সেন্সর, জিপিএস-যুক্ত যানবাহন, ইলেক্ট্রনিক টোল ব্যবস্থা, নজরদারি ক্যামেরা, আবহাওয়া সংক্রান্ত তথ্য এবং লজিস্টিক ম্যানেজমেন্ট নেটওয়ার্ক থেকে অসংখ্য তথ্য প্রতিনিয়ত সন্নিবেশিত হচ্ছে। কৃত্রিম মেধা এবং ডেটা বিজ্ঞান এই বিপুল তথ্যভাণ্ডারকে কাজে পরিণত করে, পরিবহণ ব্যবস্থাকে মসৃণ, গ্রহণযোগ্য এবং সুস্থিতিশীল করে তোলে। এই পরিবর্তন ভারতে বিশেষভাবে পরিলক্ষিত হচ্ছে। এখানে ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম এবং নতুন পরিকাঠামো প্রকল্পগুলি পরিবহণ এবং লজিস্টিক ক্ষেত্রকে নতুন রূপ দিচ্ছে।
শহরাঞ্চলে এবং মহাসড়কে যানবাহন চলাচলকে ইন্টেলিজেন্ট ট্রান্সপোর্টেশন সিস্টেম (আইটিএস) ব্যবস্থার মাধ্যমে নিয়ন্ত্রণ করা হয়। যান চলাচল এবং টোল আদায়ের ক্ষেত্রে এর প্রয়োগ বেড়েই চলেছে। এর একটি উল্লেখযোগ্য দৃষ্টান্ত হল, ফাস্ট্যাগ, যার মাধ্যমে জাতীয় সড়কগুলিতে টোল সংগ্রহ করা হয়ে থাকে। এর ফলে যানজট সামাল দেওয়ার পাশাপাশি যান চলাচলে গতি আনা এবং তথ্যভিত্তিক পরিকাঠামো পরিকল্পনা করা সম্ভব হচ্ছে। এআই নিয়ন্ত্রিত ট্রাফিক সিগন্যাল ব্যবস্থা ভারতের বেশ কয়েকটি শহরে চালু করা হয়েছে। এর ফলে একদিকে সিগন্যালের সময়সীমার সর্বোত্তম ব্যবহারের পাশাপাশি সময়ের অপচয়ও কমছে।
পণ্য পরিবহণের ক্ষেত্রে, এআই-নিয়ন্ত্রিত সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হল, ইউনিফায়েড লজিস্টিক্স ইন্টারফেস প্ল্যাটফর্ম (ইউএলআইপি)। রেল, বন্দর, সড়ক পরিবহণ এবং কাস্টমস থেকে সংগৃহীত ডেটার সুসংহতকরণের মাধ্যমে ভারতের লজিস্টিক পরিমণ্ডলের ক্ষেত্রে একটি সম্মিলিত ডিজিটাল কাঠামো তৈরি করেছে ইউএলআইপি।
নতুন পরিকাঠামো উন্নয়নে এআই এবং ডেটা বিজ্ঞানের ভূমিকা আরও বেড়েছে। বিশ্বের উচ্চতম বাঁকানো সেতু চেনাব রেল ব্রিজের মতো উল্লেখযোগ্য প্রকল্পের ক্ষেত্রে সুরক্ষা ও দীর্ঘস্থায়িত্ব সুনিশ্চিত করতে সেন্সর ডেটা, কাঠামোর ওপর নিয়মিত নজরদারি চালাতে হয়। একইভাবে বন্দে ভারত ট্রেনগুলিতে উচ্চ কম্পাঙ্ক এবং ডেটা-সমৃদ্ধ পরিচালন ব্যবস্থা রাখা হয়েছে, যেখানে বিদ্যুৎ ব্যবহার, যাত্রীদের চাপ এবং রক্ষণাবেক্ষণের ক্ষেত্রে এআই-এর প্রয়োগ দেখা যায়। ভারত এখন উচ্চগতির রেল করিডরের পথে এগোচ্ছে। তাই সুরক্ষা, সময়ানুবর্তিতা এবং পরিচালনগত দক্ষতা বাড়াতে ডেটা নিয়ন্ত্রিত ব্যবস্থা আবশ্যিক হয়ে উঠেছে।
রেল, বিমান চলাচল এবং হাইওয়েগুলিতে এআই-এর প্রয়োগের অত্যন্ত কার্যকরী ভূমিকা রয়েছে। বিভিন্ন ট্র্যাক, সিগন্যালিং ব্যবস্থা, সেতু এবং বিমানের যন্ত্রাংশ থেকে প্রাপ্ত ডেটা বিশ্লেষণ করে এআই যে কোনও ধরনের বিপত্তির আগাম সংকেত সরবরাহ করতে পারে।
পরিবহণ এবং লজিস্টিক ক্ষেত্রে কেন বিশেষভাবে দক্ষ এআই পেশাদার প্রয়োজন
রেল, এক্সপ্রেসওয়ে, বন্দর, বিমানবন্দর এবং বহুমাত্রিক লজিস্টিক পার্কগুলিতে বিপুল বিনিয়োগের ফলে দক্ষ পেশাদারদের প্রয়োজন হয়ে পড়েছে, যাঁরা এআই পদ্ধতি এবং সুনির্দিষ্ট ক্ষেত্রের সীমাবদ্ধতাগুলিকে বুঝতে পারবেন। এই রূপান্তরের মূলে রয়েছে নতুন শ্রেণির ইঞ্জিনিয়ার, পেশাদারদের চাহিদা, যাঁরা শুধুমাত্র পরিসংখ্যান ও ডেটা বুঝবেন না, সেইসঙ্গে পরিবহণ নেটওয়ার্ক, লজিস্টিক ব্যবস্থা এবং পরিকাঠামো সম্পর্কে যাঁদের পর্যাপ্ত জ্ঞান রয়েছে।
জাতীয় এবং আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে এই প্রয়োজনীয়তার কথা মাথায় রেখে ভারতের পরিবহণ ও লজিস্টিক পরিমণ্ডলে ভবিষ্যৎ উপযোগী প্রতিভা তৈরির লক্ষ্যে গতি শক্তি বিশ্ববিদ্যালয় গড়ে তোলা হয়েছে। দেশে এই ধরনের বিশ্ববিদ্যালয় এই প্রথম, যা ভারতের পরিকাঠামো সম্প্রসারণ এবং সুসংহত পরিবহণ ব্যবস্থাকে ত্বরান্বিত করছে। এই বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি উল্লেখযোগ্য শক্তি হল, শিল্প ও শিক্ষার মধ্যে সুনিবিড় যোগাযোগ। রেল, হাইওয়ে, বন্দর, বিমান চলাচল এবং লজিস্টিক ক্ষেত্রের সঙ্গে ক্রমাগত যোগাযোগ এটাই সুনিশ্চিত করেছে যে, প্রকৃত পরিচালনগত চ্যালেঞ্জ নিহিত রয়েছে শিক্ষালাভের মধ্যে। এর ফলে ছাত্রছাত্রীরা লাইভ ডেটাসেট, সমসাময়িক পদ্ধতি এবং উদীয়মান প্রযুক্তিকে তাঁদের পেশাগত জীবনে প্রয়োগ করতে পারছেন।
পরিবহণ ও লজিস্টিকের ভবিষ্যৎ নির্মাণ
এআই এবং ডেটা বিজ্ঞান এখন আর অতিরিক্ত কোনও সংযোজন নয়, এগুলি হল পরিবহণ ও লজিস্টিক ক্ষেত্রের ভবিষ্যৎ-ভিত্তি। ভারত যেহেতু সুসংহত, দক্ষ এবং সুস্থিতিশীল পরিবহণ ব্যবস্থার দিকে এগোচ্ছে, তাই দক্ষ পেশাদারদের চাহিদা বাড়ছে, যাঁরা এই প্রযুক্তিকে এগিয়ে নিয়ে যেতে পারবেন। জাতীয় অগ্রাধিকারের ক্ষেত্রে বিশেষ ভবিষ্যৎ উপযোগী শিক্ষা ব্যবস্থার ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। এর সামনের সারিতে রয়েছে গতি শক্তি বিশ্ববিদ্যালয়। এই বিশ্ববিদ্যালয় ইঞ্জিনিয়ারদের শিক্ষাদান করছে, যাঁরা আগামীদিনের পরিবহণ ব্যবস্থার রূপরেখা চূড়ান্ত করবেন। ২০৪৭-এর মধ্যে দেশকে বিকশিত ভারতে পরিণত করার ভিত্তি হয়ে উঠবে। রক্ষণাবেক্ষণ ও সুরক্ষার জন্য পরিকল্পনা, রাজস্ব পরিচালন ব্যবস্থা এবং ভবিষ্যৎ প্রযুক্তি।
অধ্যাপক মনোজ চৌধারি গতিশক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য
ডঃ বিপুল মিশ্র গতিশক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের সহকারী অধ্যাপক