এই গবেষণা ইঙ্গিত দিচ্ছে, ভবিষ্যতে ঘুমের বিশ্লেষণ শুধু বিশ্রামের মান মাপার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে না (AI predicts disease risk from sleep data), বরং তা হয়ে উঠতে পারে রোগ প্রতিরোধ ও আগাম সতর্কতার এক শক্তিশালী হাতিয়ার।

ছবি - এআই
শেষ আপডেট: 7 January 2026 18:54
দ্য ওয়াল ব্যুরো: এক রাতের ঘুম থেকেই জানা যেতে পারে ভবিষ্যতে কোন কোন রোগে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে - এমনই এক চমকপ্রদ এআই (AI) মডেল তৈরি করলেন গবেষকরা (AI predicts disease risk from sleep data)। ‘SleepFM’ নামের এই এআই মডেলটি ঘুম সংক্রান্ত তথ্য বিশ্লেষণ করে শতাধিক রোগের সম্ভাব্য ঝুঁকি আগাম অনুমান (sleep data health prediction) করতে সক্ষম, দাবি গবেষকদের।
এই গবেষণায় যুক্ত ছিলেন আমেরিকার স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকরাও। প্রায় ৬ লক্ষ ঘণ্টার ঘুমের ডেটা, যা সংগ্রহ করা হয়েছে ৬৫ হাজার মানুষের কাছ থেকে, সেই বিপুল তথ্যভাণ্ডারের ওপর ভিত্তি করে এআই মডেলটিকে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে (AI in healthcare)। গবেষণার বিস্তারিত তথ্য প্রকাশিত হয়েছে আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন বিজ্ঞান বিষয়ক জার্নাল Nature Medicine-এ।
শুরুতে SleepFM-কে ঘুম বিশ্লেষণের প্রচলিত কিছু কাজে ব্যবহার করা হয়, যেমন ঘুমের বিভিন্ন স্তর শনাক্ত করা বা স্লিপ অ্যাপনিয়ার তীব্রতা নির্ণয়। পরীক্ষায় এই কাজগুলিতে মডেলটির দক্ষতা প্রমাণিত হওয়ার পর, গবেষকরা আরও এক ধাপ এগিয়ে যান।
এরপর ঘুমের তথ্যের সঙ্গে একটি স্লিপ ক্লিনিক থেকে পাওয়া স্বাস্থ্য সংক্রান্ত রেকর্ড মিলিয়ে ভবিষ্যতে কোন রোগের সূচনা (disease prediction) হতে পারে, তা অনুমান করার কাজে ব্যবহার করা হয় এই এআই মডেলকে।
কতগুলো রোগের ঝুঁকি ধরতে পারল AI?
গবেষকদের দাবি অনুযায়ী, স্বাস্থ্য রেকর্ডে থাকা হাজারেরও বেশি রোগের শ্রেণি বিশ্লেষণ করা হয়। এর মধ্যে ১৩০টি রোগ এমন, যেগুলির ঝুঁকি শুধুমাত্র রোগীর ঘুমের ডেটা ব্যবহার করেই যুক্তিসঙ্গত নির্ভুলতায় অনুমান করা সম্ভব হয়েছে (sleep data analysis)।
স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের স্লিপ মেডিসিন বিভাগের অধ্যাপক এবং এই গবেষণার সিনিয়র লেখক এমানুয়েল মিগনো বলেন, “ঘুম নিয়ে গবেষণা করার সময় আমরা অসাধারণ পরিমাণ তথ্য সংগ্রহ করি। আট ঘণ্টা ধরে একজন মানুষের শরীরের নানা শারীরবৃত্তীয় সংকেত একসঙ্গে পাওয়া যায়। এই ডেটা অত্যন্ত সমৃদ্ধ।”
কীভাবে কাজ করে SleepFM?
ঘুম সংক্রান্ত গবেষণায় সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য পদ্ধতি হিসেবে পরিচিত পলিসমনোগ্রাফি। এই পদ্ধতিতে নানা ধরনের সেন্সরের মাধ্যমে বেশ কিছু তথ্য সংগ্রহ করা হয়, যেমন -
গবেষকরা জানান, SleepFM এই বহুমাত্রিক ডেটা স্ট্রিমগুলোকে একসঙ্গে বিশ্লেষণ করতে পারে এবং বুঝতে পারে, একটির সঙ্গে আরেকটির কী সম্পর্ক রয়েছে।
এছাড়া, এআই-কে প্রশিক্ষণ দেওয়ার জন্য তাঁরা একটি নতুন কৌশল তৈরি করেছেন, যার নাম ‘leave-one-out contrastive learning’। এই পদ্ধতিতে ডেটার কোনও একটি অংশ বা সংকেত ইচ্ছাকৃতভাবে লুকিয়ে রাখা হয়, এবং বাকি তথ্য ব্যবহার করে এআই-কে সেই অনুপস্থিত অংশটি পুনর্গঠন করতে বলা হয়। এর ফলে মডেলটির বিশ্লেষণ ক্ষমতা আরও শক্তিশালী হয়েছে।
কোন কোন রোগে সবচেয়ে ভাল ফলাফল?
গবেষণায় দেখা গেছে, কিছু রোগের ক্ষেত্রে SleepFM-এর ভবিষ্যদ্বাণী ক্ষমতা বিশেষভাবে শক্তিশালী। এই মডেলটি যেসব ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য সাফল্য দেখিয়েছে, সেগুলি হল -
এই সব ক্ষেত্রেই AI মডেলটি পেয়েছে ০.৮-এর বেশি ‘C-index’ স্কোর।
C-index বা Concordance Index হল এআই-এর পূর্বাভাস দেওয়ার দক্ষতা মাপার একটি গুরুত্বপূর্ণ মানদণ্ড। এটি দেখায়, কোনও গোষ্ঠীর মধ্যে দু’জন ব্যক্তির ক্ষেত্রে কে আগে কোনও নির্দিষ্ট ঘটনার শিকার হতে পারেন, তা এআই কতটা সঠিকভাবে অনুমান করতে পারছে।
এক রাতের ঘুমেই মিলছে বহু রোগের ইঙ্গিত
গবেষণাপত্রে লেখকরা জানান, “এক রাতের ঘুমের ডেটা ব্যবহার করেই SleepFM অন্তত ১৩০টি রোগের ঝুঁকি নির্ভুলভাবে অনুমান করতে পারে, যেখানে C-index ০.৭৫ বা তার বেশি।”
এই তালিকায় রয়েছে -
গবেষকদের মতে, সব রোগের ক্ষেত্রে ফলাফল একরকম না হলেও, টিউমার, গর্ভাবস্থার সমস্যা, হৃদ্রোগ ও মানসিক ব্যাধির ক্ষেত্রে SleepFM অত্যন্ত আশাব্যঞ্জক ফল দেখিয়েছে।
এছাড়াও, পার্কিনসনস ডিজিজের ঝুঁকি নির্ধারণে এই এআই মডেলের পারফরম্যান্স উল্লেখযোগ্য বলে জানিয়েছেন গবেষকরা। পার্কিনসনের ক্ষেত্রে ঘুম সংক্রান্ত সমস্যাকে প্রাথমিক লক্ষণ হিসেবে ধরা হয়। পাশাপাশি, শিশুদের বিকাশগত দেরি ও স্নায়বিক সমস্যার পূর্বাভাস দিতেও SleepFM কার্যকর বলে উঠে এসেছে গবেষণায়।
এই গবেষণা ইঙ্গিত দিচ্ছে, ভবিষ্যতে ঘুমের বিশ্লেষণ শুধু বিশ্রামের মান মাপার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে না, বরং তা হয়ে উঠতে পারে রোগ প্রতিরোধ ও আগাম সতর্কতার এক শক্তিশালী হাতিয়ার।