পোলিওয় আক্রান্ত হয়ে দুই পা হারালেও লড়াই থামাননি যুবক। হুইলচেয়ারে বসেই জাতীয় মঞ্চে দেশের জন্য রুপো জিতে নজির গড়লেন।

হুইলচেয়ারে প্যারাঅলিম্পিকে রুপো
শেষ আপডেট: 18 February 2026 18:41
দ্য ওয়াল ব্যুরো: ছয় বছর বয়স তখন। হঠাৎ জ্বর। গ্রামের ডাক্তার একটি ইনজেকশন দিলেন। পরের দিন সকালে ঘুম ভেঙে ছোট্ট বাচ্চাটি বুঝল পা আর নড়ছে না। কোনওভাবে উঠে দাঁড়ানো সম্ভব হচ্ছে না। ডাক্তারের কাছে গিয়ে জানা গেল, পোলিও কেড়ে নিয়েছে সবটা। বল নেই পায়ে। আদৌ আর কোনওদিন ঠিক হবে না সে।
সেই এক অদম্য লড়াইয়ের শুরুয়াত হল। এই গল্প ২৭ বছরের মায়াভাই ভাম্মারের, যিনি আজ জাতীয় স্তরের প্যারা পাওয়ারলিফটার (Para Powerlifter)। অনেকের কাছে অনুপ্রেরণার প্রতীকও।
বন্দিদশা ও জীবনের পরিবর্তন
পোলিও-পরবর্তী চার বছর তিনি বাড়িতেই ছিলেন। পরিবার হতভম্ব। ভবিষ্যৎ অন্ধকারে। কিন্তু একদিন তাঁর বাবা-মা জানতে পারেন ভেরাভলে প্রতিবন্ধী শিশুদের জন্য একটি আবাসিক বিদ্যালয় রয়েছে। সেখানে ভর্তি হলে বাচ্চার আর কিছু না হোক পড়াশোনাটা হবে। খোঁজ নিয়ে তাঁরা সেখানে ভর্তি করেন মায়াভাইকে।
ফ্রিতে থাকা-খাওয়া ও পড়াশোনা—অর্থনৈতিকভাবে দুর্বল কৃষক পরিবারের জন্য এটা আশীর্বাদের চেয়ে কিছু কম ছিল না। ভাভনগরের এই ছেলে পাঁচ ভাইবোনের মধ্যে সবচেয়ে ছোট। বাবা ও দুই দাদা তখন কৃষিকাজ করে। ছোট ছেলেকে এসবে আনতে চায়নি তারা। তাই শুরু হয় লেখাপড়া।
আবাসিক স্কুলে প্রথম থেকে অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত পড়ে। তারপর গান্ধীনগরের উভারসাদে দ্বাদশ শ্রেণি পর্যন্ত। এরপর আমদাবাদের এল. ডি. আর্টস কলেজে সমাজতত্ত্ব নিয়ে স্নাতক।
দ্বিতীয় পরিবার: BPA-র হাত ধরে আত্মবিশ্বাস
কলেজ জীবনে তাঁর পরিচয় হয় ব্লাইন্ড পিপল'স অ্যাসোসিয়েশনের। দেশের অন্যতম বৃহৎ এনজিও, যারা বিভিন্ন ধরনের প্রতিবন্ধী মানুষের জন্য প্রশিক্ষণ ও পুনর্বাসনের কাজ করে। পরিচয় থেকে এটাই পরে হয়ে ওঠে মায়াভাইয়ের দ্বিতীয় পরিবার। হস্টেলে থাকেন, বন্ধু পান, শেখেন নতুন নতুন জিনিস, দক্ষতা অর্জন করেন নিমেষেই।
BPA-র আইটিআই কোর্সে তিনি টেইলারিং, স্টেনোগ্রাফি ও ডেস্কটপ পাবলিশিং (DTP)-য়ের কোর্স করেন। এখন সেখানেই অন্য ছাত্রদের ডিজাইন ও DTP শেখান। স্টাইপেন্ড পান। ‘পড়াতে ভাল লাগে। যা শিখি তাই শেখাই’,হাসিমুখে বলেন তিনি।
পা নয়, কাঁধই ভরসা: পাওয়ারলিফটিং শুরু
২০১৯ সালে, বয়স তখন ২০। BPA-র অন্যদের খেলাধুলো করতে দেখে তাঁরও ইচ্ছে হয়। জানতে পারেন, পাওয়ারলিফটিং তাঁর জন্য উপযুক্ত।
সেই শুরু। পরপর তিন বছর গুজরাত স্টেট প্যারা পাওয়ারলিফটিং চ্যাম্পিয়নশিপে দ্বিতীয় স্থান। ২০২৩ সালে খেলো ইন্ডিয়া প্যারা গেমসে জাতীয় স্তরে ব্রোঞ্জ। ২০২৬ সালের জানুয়ারিতে আরও বড় সাফল্য। ২৩তম সিনিয়র ন্যাশনাল প্যারা পাওয়ারলিফটিং চ্যাম্পিয়নশিপে ৪৯ কেজি বিভাগে ১১৫ কেজি ওজন তুলে রুপো জেতেন। অফিসিয়াল তালিকায় তাঁর নাম, ভাম্মার মায়াভাই লোমাভাই। এখন তাঁর লক্ষ্য একটাই—ভারতের হয়ে সোনা জেতা। দেশের নাম আরও উজ্জ্বল করা।
শৃঙ্খলা, ডায়েট ও প্রতিদিনের যুদ্ধ
পাওয়ারলিফটিং শুধু জিমে ঘাম ঝরানো নয়, কঠোর ডায়েটও। ওজন ৪৬ কেজির আশপাশে রাখতে হয়। ক্যাটেগরি বদলালে প্রতিযোগিতার সমীকরণ বদলে যায়। এর জন্য প্রিয় মিষ্টি, ভাজা একেবারে ছেড়ে দিয়েছেন। স্প্রাউটস, সবজি, ফল—বিশেষ করে আপেল ও কলা খেয়ে দিন কাটাচ্ছেন। পাতে থাকছে পনিরও।
BPA হস্টেলের রান্নাঘর তাঁর জন্য আলাদা ব্যবস্থা করে। লুচি বা তেলেভাজা জাতীয় কিছু হলে বিকল্প খাবার দেওয়া হয়।
ভোরে দু’ঘণ্টা জিম। বাইসেপ, ট্রাইসেপ, ওয়েটলিফ্টিং। BPA-তেও অনুশীলন। প্রতিযোগিতার খরচ সংস্থাই বহন করে।
কোভিডের সময় বন্ধ ছিল জিম। তখন বাড়ির গাছে উঠে পুল-আপ, ইটভর্তি বস্তা তোলা, সিমেন্ট দিয়ে নিজেই ডাম্বেল বানানো- এসব করেন তিনি। পরে সব কিছু স্বাভাবিক হলে আবার জিমে ফিরে যান।
তাঁর মতে, এই দায়বদ্ধতা না থাকলে জাতীয় মঞ্চে ওঠা যায় না। তাই এটুকু দরকারই।
জোম্যাটো ডেলিভারি পার্টনার: স্বনির্ভরতার আরেক অধ্যায়
খেলোয়াড়ের জীবনে অর্থ বড় বিষয়। ২০২১ সালে আমদাবাদে জোম্যাটোর প্রথম প্রতিবন্ধী ডেলিভারি পার্টনার হন তিনি। রাত ৭টা থেকে ১০টা পর্যন্ত কাজ করেন। কাস্টমাইজড ব্যাটারি-চালিত স্কুটার, যাতে তাঁর ফোল্ডেবল হুইলচেয়ার ও খাবারের বক্স রাখা যায়। মাসে সেখান থেকে প্রায় ৫,০০০ টাকা আয় হয়। সেই অর্থই বিশেষ ডায়েটের খরচ জোগায়।
গ্রাহকদের ফোন করে বলেন, তিনি শারীরিকভাবে চ্যালেঞ্জড। অনুরোধ করেন নাচে নেমে খাবার নিতে। অধিকাংশ মানুষ সহযোগিতা করেন। যারা করেন না তাঁদের প্রতি মায়াভাইয়ের কোনও ক্ষোভ নেই। তিনি সবটাই বোঝেন।
মানুষটি শুধু খেলোয়াড় নন
মায়াভাই গান ভালবাসেন। BPA-তে সংগীত শিখেছেন। বন্ধুরা বলেন, হুইলচেয়ারে বসেই নাচতেও পারেন দারুণ।
কীভাবে এত মানসিক জোর পান? মায়াভাইয়ের কথায়, ‘আমি যখন ওজন তুলি, তখন প্রতিবন্ধকতার কথা ভাবি না। অন্যরা পারলে আমি কেন পারব না?’ এই প্রশ্নটাই এগিয়ে দেয়।
মায়াভাই ভাম্মারের গল্প আমাদের শেখায়—প্রতিবন্ধকতা শরীরে থাকতে পারে, মনের ভিতর নয়। একটি ইনজেকশন তাঁর পা কেড়ে নিয়েছিল। কিন্তু সেই দিনই শুরু হয়েছিল অন্য এক যাত্রা—হুইলচেয়ার থেকে জাতীয় মঞ্চে ওঠার। আজ তিনি শুধু একজন প্যারা পাওয়ারলিফটার নন। তিনি প্রমাণ—অদম্য ইচ্ছাশক্তি থাকলে সীমাবদ্ধতাও শক্তিতে পরিণত হয়।