সরস্বতী পুজোর পরের দিন শীতল ষষ্ঠীতে কেন গোটা সেদ্ধ খাওয়ার রীতি আছে? জেনে নিন ধর্মীয় বিশ্বাস, লোকাচার ও ঋতুবদলের সঙ্গে যুক্ত এই প্রথার নেপথ্যের কারণ।

গোটা সেদ্ধ
শেষ আপডেট: 23 January 2026 12:17
দ্য ওয়াল ব্যুরো: সরস্বতী পুজো পালিত হচ্ছে রাজ্যজুড়ে। হলুদ শাড়ি, বাসন্তী পাঞ্জাবি গায়ে ক্যাম্পাস থেকে পাড়া—এদিক-ওদিক ঘোরাঘুরি, বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডা, ছবি তোলা-আলাদা উন্মাদনা সকলের মধ্যে। প্রায় প্রত্যেক বাঙালি বাড়িতেই হয় সরস্বতী পুজো। কিন্তু পুজোর উন্মাদনা কাটতে না কাটতেই পরদিনই আসে আর এক চেনা রীতি—শীতল ষষ্ঠী (Sheetal Shashthi)। আর তার সঙ্গে অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িয়ে রয়েছে গোটা সেদ্ধ (Gota Seddho)।
সরস্বতী পুজোর পরের দিন, ষষ্ঠী তিথিতে, বাড়ির মেয়েরা শীতল ষষ্ঠীর ব্রত পালন করেন। এই দিনে বাড়িতে সারাদিন উনুন জ্বালানো হয় না। আগের রাতে রান্না করা খাবারই খাওয়া হয়। সেই খাবারের নামই গোটা সেদ্ধ। যুগের পর যুগ ধরে চলে আসা এই রীতির নেপথ্যে আছে ধর্মীয় বিশ্বাস, লোকাচার এবং ঋতুচক্রের সঙ্গে শরীরের সামঞ্জস্য—সব মিলিয়ে এক গভীর বাঙালি সংস্কৃতি।
সরস্বতী পুজোর দিন সকাল থেকেই বাজারমুখো হন গৃহস্থরা। চড়া দাম উপেক্ষা করেও গোটা সেদ্ধর জন্য বেছে বেছে কেনা হয় শিষ পালং, গোটা মুগ, গোটা বেগুন, গোটা শিম, গোটা কড়াইশুঁটি, টোপা কুল, সজনে ফুল। কোনও সবজি কাটা যাবে না—এই নিয়মেই সব উপকরণ কিনে আনা হয়। পুজো মিটে গেলে বিকেলের দিকে পরিষ্কার হাঁড়িতে শুরু হয় রান্না। কোনও সবজি না কেটে, সবটাই গোটা অবস্থায় সেদ্ধ করা হয় বলেই এর নাম গোটা সেদ্ধ। কারও বাড়িতে মশলা দিয়ে রান্না হয়, আবার কারও বাড়িতে সম্পূর্ণ নিরামিষ, মশলাহীন।
পরের দিন সকালে, ষষ্ঠী তিথিতে, হয় ষষ্ঠী পুজো। ফুল, প্রসাদ দিয়ে বাড়ির শিল-নোড়া (Sil-Nora) পুজো করা হয়। শিল-নোড়ার গায়ে দেওয়া হয় দইয়ের ফোঁটা। পুজো শেষে সেই দই-ই আগের দিনের রান্না করা গোটা সেদ্ধর ওপর ছিটিয়ে দেওয়া হয়। এই দিন সকাল থেকে আগুন জ্বালানোর কোনও নিয়ম নেই। অনেকটাই অরন্ধনের (Arandhan) মতো এই পার্বণ সরস্বতী পুজোর পরদিনের আবহকে আলাদা করে তোলে।
লোকাচার অনুযায়ী, শীতল ষষ্ঠীর দিনে শিল-নোড়াকে বিশ্রাম দেওয়া হয়। তাই রান্নাবান্না বন্ধ থাকে। ব্রত ভাঙা হয় গোটা সেদ্ধ খেয়েই। বিশ্বাস করা হয়, শীতের শেষে বসন্তের শুরুতে এই গোটা সেদ্ধ শরীরের পক্ষে খুবই উপকারী। সবজি সেদ্ধ থাকায় তার পুষ্টিগুণ বজায় থাকে, যা জীবাণুর সঙ্গে লড়াই করতে সাহায্য করে। ঠান্ডা খাবার খাওয়ার মধ্যেও রয়েছে শরীর ঠান্ডা রাখার ভাবনা।
আজকের ব্যস্ত জীবনে অনেক বাড়িতেই এই রীতিতে ছেদ পড়েছে। তবু যাঁদের বাড়িতে এখনও শীতল ষষ্ঠীর গোটা সেদ্ধ হয়, তাঁরা জানেন—মা বা ঠাকুমার হাতে বানানো সেই গোটা সেদ্ধর স্বাদ শুধু খাবার নয়, স্মৃতি। যুগ বদলালেও, সরস্বতী পুজোর পরের দিন শীতল ষষ্ঠী আর গোটা সেদ্ধ বাঙালির ঘরোয়া সংস্কৃতির এক অমূল্য অংশ হয়েই থেকে গেছে।