বৈদিক যুগে সরস্বতী নদী রূপে বহমান ছিল। তারই দুপাশে, তারই জলে পরিপুষ্ট হয়ে গড়ে উঠেছিল সিন্ধু সভ্যতার মতো প্রাচীন সভ্যতা।

শেষ আপডেট: 22 January 2026 23:29
শ্বেতশুভ্রা দেবী সরস্বতী আমাদের বিদ্যার দেবী। 'সরস'শব্দের অর্থ চলমান বা বহমান। বৈদিক যুগে সরস্বতী নদী রূপে বহমান ছিল। তারই দুপাশে, তারই জলে পরিপুষ্ট হয়ে গড়ে উঠেছিল সিন্ধু সভ্যতার মতো প্রাচীন সভ্যতা। কিন্তু কালের করাল গ্রাসে এই নদী ক্ষীণস্রোতা হয়ে একসময় অদৃশ্য হল। নদী শুকিয়ে যাওয়ার ফলে তার দুপাশ গড়ে ওঠা জনপদবাসীরা অন্যত্র চলে যেতে বাধ্য হন। আর সেই নদীর প্রতি ভালোবাসায় তাঁরা নদীরূপ কে দেবীরূপে বন্দনা করলেন। এই হল দেবী সরস্বতীর বন্দনার কাহিনি।
পুরাণে এই দেবীর উৎস ও কাহিনি ভিন্ন
ব্রহ্মপুরাণে দেবী সরস্বতীর নদীরূপ প্রাপ্তি বিষয়ে এক বিচিত্র কাহিনি বর্ণনা করা হয়েছে। স্বয়ং ব্রহ্মা দেবর্ষি নারদকে এই কাহিনি বর্ণনা করেছেন। প্রাচীনকালে একবার বিষ্ণু ও ব্রহ্মার মধ্যে কে বড় তা নিয়ে তর্ক শুরু হল। তর্ক যখন প্রচণ্ড বিবাদে পরিণত হল তখন বিষ্ণু ও ব্রহ্মার মধ্যে উজ্জ্বল জ্যোতিরূপে শিব আবির্ভূত হলেন।সেই জ্যোতিরূপ বজ্র কন্ঠে দুজনকে তিরস্কার করে বলে উঠলেন, ‘'আপনারা দুজনেই দেব ও মানবের কাছে প্রণম্য ও বন্দিত। কিন্তু আপনারাই যদি এহেন বিবাদে লিপ্ত হন তবে সকলে বিস্মিত হবে।তাঁরা কী করে আপনাদের শ্রদ্ধা বা পূজা করবে?’' বিষ্ণু ও শিব পরস্পর এতটাই বিবাদে লিপ্ত হয়েছিলেন যে শিবের কথা তাঁদের শান্ত করতে পারল না। তাঁরা নিজেদের শ্রেষ্ঠ প্রতিপন্ন করার চেষ্টা করে জ্যোতির্ময় শিবকে বলে বসলেন, ‘ হে পিনাকপাণি, আমাদের মধ্যে কে শ্রেষ্ঠ তা আপনিই এবার বিচার করুন।"
জ্যোতিরূপ শিব উত্তর দিলেন,’‘ আপনাদের মধ্যে যে আমার এই জ্যোতিরূপের আদি ও অন্ত খুঁজে পেতে সক্ষম হবেন তাঁকেই আমি শ্রেষ্ঠ বলব। জগতও তাঁকে শ্রেষ্ঠ রূপে বন্দনা করবে।’ শিবের কথা শেষ হওয়ামাত্র বিষ্ণু ঊর্ধ্বমুখ হয়ে জ্যোতির আদি খুঁজতে চললেন ,আর ব্রহ্মা অধোমুখী হয়ে জ্যোতির অন্ত অন্বেষণ করতে অগ্রসর হলেন। বিষ্ণু বহুক্ষণ উর্ধ্বমুখে চলেও জ্যোতির আদি খুঁজে পেলেন না। তিনি তাই নিশ্চেষ্ট হয়ে যে স্থান থেকে শুরু করেছিলেন সেই স্থানে উপস্থিত হয়ে জ্যোতিরূপ শিবকে বললেন, ‘আমার পক্ষে আপনার আদি স্থান নির্দিষ্ট করা সম্ভব হল না।আপনি অনাদি এই জেনে আপনার কাছেই ফিরে এলাম।’
এদিকে ব্রহ্মাও জ্যোতির অন্ত অন্বেষণ করতে করতে পাতালে প্রবেশ করলেন। কিন্তু তিনিও অন্ত খুঁজে না পেয়ে যে স্থান থেকে শুরু করেছেন, সেই স্থানেই ফিরে এলেন। এই সময় তিনি দূর থেকে দেখলেন বিষ্ণু আগেই বসে আছেন শিব সম্মুখে। তিনি ভাবলেন, বোধহয় আমার আগেই বিষ্ণু ভগবান শিবের আদিরূপ দেখে ফিরে এসেছেন। এখন আমি যদি গিয়ে বলি জ্যোতিরূপের অন্ত দেখা আমার পক্ষে সম্ভব হয়নি, তবে তো পরাজয় অবশ্যম্ভাবী। কিন্তু পরাজিত হলে তো চলবে না। আমিও অন্ত:রূপ দেখেছি - এমনটাই বলব। কিন্তু দেবাদিদেবের সম্মুখে এই চতুর্মুখে মিথ্যা বলব কী করে? বিশেষ করে যে চারমুখে যে আমি বেদ উচ্চারণ করি,সেই চার মুখে মিথ্যা বললে বেদ বিরাগ হবেন। তাহলে কী করে পরিস্থিতিকে আমার অনুকূলে নিয়ে আসব? বেদজ্ঞ ব্রহ্মা তখন চিন্তা করলেন তিনি চতুর্মুখে বেদ উচ্চারণ করেন, তিনি যদি আরেকটি মুখ সৃষ্টি করেন তবে কেমন হয়?পঞ্চম মুখে তিনি কখনই বেদ উচ্চারণ করেননি। সেই মুখে মিথ্যা বললে কোনো দোষ হবে না। এই চিন্তা করেই ব্রহ্মা নিজের গর্দভ আকৃতির পঞ্চম মুখ সৃষ্টি করে উপস্থিত হলেন শিবের কাছে সেখানে বিষ্ণু আগে থেকেই উপস্থিত।
তাঁকে দেখে জ্যোতিরূপ শিব জিজ্ঞাসা করলেন, 'হে কমলযোনি ব্রহ্মা! আপনি তো আমার অন্ত অন্বেষণে গিয়েছিলেন। সে বিষয়ে আপনার অভিজ্ঞতা কেমন হল? ব্রহ্মা উত্তর দিলেন, 'হে পিনাকপাণি, আমি আপনার অন্ত দর্শন করে আসতে সক্ষম হয়েছি।' ব্রহ্মার কথা উচ্চারিত হওয়া মাত্রই ঘোর অমাবস্যার অন্ধকার নেমে এল। শিব ও বিষ্ণু চন্দ্র আর সূর্যের মিলিত রূপের মতো একরূপ প্রাপ্ত হল। তাঁদের অভিন্ন রূপ দেখে ব্রহ্মা অবাক হলেন এবং ভীত হলেন। তিনি বুঝতে পারলেন তাঁর কথা যে মিথ্যা তা দুজনেই বুঝতে পেরেছেন। সঙ্গে সঙ্গে ব্রহ্মা তাঁদের উদ্দেশে স্তবগাথা উচ্চারণ করতে শুরু করলেন। তখন ব্রহ্মাকে ধিক্কার দিয়ে এক কণ্ঠ ব্রহ্মার কণ্ঠে বিরাজিত বাগদেবী বাণীকে বলে উঠলেন, ‘ হে দুষ্টা, মিথ্যা ভাষণের মতো পাপ আর নেই। ব্রহ্মার কণ্ঠে বাস করে তুই মিথ্যা উচ্চারণ করেছিস সুতরাং তুই নিম্নগামী হবি, আর অদৃশ্য হয়ে বয়ে যাবি।’’
দেবতাদের এই অভিশাপে বাগদেবী বিচলিতা হলেন। তিনি কণ্ঠতে বিরাজ করেন বটে কিন্তু মিথ্যা উচ্চারণের ইচ্ছা তো প্রজাপতি ব্রহ্মার মনের ইচ্ছায় জন্মেছিল। তবে তিনি কেন অভিশপ্ত হবেন? তাঁর আকুতি আর যুক্তি শুনে দেবতাদ্বয়ের মনে করুণা হল। তাঁরা বললেন, উচ্চারিত অভিশাপ ফিরিয়ে নেওয়া যায় না। তবে বাণী বা সরস্বতী নদী যখন গঙ্গার সঙ্গে মিলিতা হবেন তখনই তিনি শাপমুক্ত হবেন। দেবতাদের সেই বাক্য উচ্চারণের সঙ্গে সঙ্গে বাগদেবী নদী হয়ে মর্তে বহমান হলেন।