
শেষ আপডেট: 29 October 2021 13:31
'আচ্ছা? দাশু কি সত্যি সত্যিই পাগল? না কেবল মিচকেমি করে?'
অতি সংক্ষিপ্ত সাহিত্য জীবনে সুকুমার রায় যা যা সৃষ্টি করে গেছেন, তাতে অনেক অতি দীর্ঘ জীবন ও সাহিত্যজীবনপ্রাপ্ত সাহিত্যিকদের যথেষ্ট পরিমাণ হিংসা উদ্রেক হওয়ার কারণ আছে। এমনকি ঘোর ইংরেজি মিডিয়াম শিক্ষিত/শিক্ষিতা বাঙালি বাচ্চাদের মধ্যেও এমন খুব কম সংখ্যক আছে, যারা একেবারেই সুকুমার রায় পড়েনি। আবোলতাবোল, হযবরল এবং শেষমেশ কিন্তু সবথেকে গুরুত্বপূর্ণ, পাগলা দাশু।
পাগলা দাশু, সুকুমার রায়ের অন্য অনেক বইয়ের মতই তিনি পরলোক গমন করার পর প্রকাশিত হয়েছিল। কিন্তু, অসাধারণ সাহিত্য এমন এক মুক্তকেশীর শক্ত বেড়া, তার কাছেতে যম ঘেঁষে না। প্রায় শতবর্ষ পরেও তাই দাশু বা দাশরথী অমর। তার লেখকের ঘুমের ঘোর ঘনিয়ে এলেও, তার গানের পালা সে সাঙ্গ হতে দেয়নি।
বইয়ের নাম 'পাগলা দাশু' হলেও আরও অনেক গল্প আর উদ্ভট চরিত্র এ বইতে আছে। 'উদ্ভট' বললেও, পাঠক পাঠিকারা আশ্চর্যজনকভাবে স্বীকার করবেন, এই জাতীয় চরিত্রদের সঙ্গেই তাঁরা বড় হয়েছেন। স্কুলে কলেজে অন্তত একজন অতি বিটকেল কবিতা লেখক/লেখিকা, চালিয়াৎ, ঢপবাজ, নিদেনপক্ষে প্রবল বাড়িয়ে কথা বলে, বেশি কেরামতি দেখাতে গিয়ে 'কেস খাওয়া' চরিত্র ছিলই। এদের আমরা চিনি। এরাই আমাদের স্কুল কলেজের সহপাঠী/পাঠিনীদের মধ্যে ছিল। কিংবা আমরাই কিছুটা ওরকম ছিলাম। তাই পড়তে গিয়ে কৈশোরের বড় হওয়ার দিনগুলো মনে করে আমরা হেসে গড়িয়ে পড়ি।
কিন্তু, দাশু? দাশরথি? যার নামে বই? যার উপাধি 'পাগল' বা 'পাগলা'? বইয়ের প্রথম চারটে গল্পই যার?
পাগলা দাশু বই হিসেবে যখন লেখা হচ্ছিল টিন-এজ সাইকোলজি নিয়ে ব্যাপক গবেষণা তখনও শুরু হয়নি। যে কোনও মানুষ যে সামাজিক 'স্বাভাবিক' ব্যবহারে খাপ খায় না ব্রিটেন বা আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্রে চোখ বুজে তাদের জেলখানার থেকেও ভয়াবহ 'পাগলা গারদে' পাঠানো খুবই স্বাভাবিক ঘটনা ছিল। কেউ ভাবত না সেখানে তারা মরল, না বাঁচল।
মানসিক স্বাস্থ্য এখনও, এই একবিংশ শতাব্দীতেও ট্যাবু। অফিসে চাকরি যেতে পারে। কারও 'ডিপ্রেশন' আছে বলাটা বন্ধুমহলে অপরাধ, কারণ, সেটা 'ফুটেজ খাওয়ার জন্য'। (মেয়ে হলে আরও। বিয়ে হবে না। বিয়ে হলে, মা হওয়ার অযোগ্য ঘোষণা করবেন 'স্বামী'।) সবাই বলবে, আরেহ, মুড ঠিক কর, একটু হাস, সব ঠিক হয়ে যাবে। যদি কেউ 'সোনার কেল্লা'র মুকুলের মতো বলে বসে, "আমার হাসি পাচ্ছে না।" সবাই ধরে নেবে "ধুর, মাথায় জঞ্জাল ভর্তি।" যারা 'ভালো চায়', এই ধরুন পার্টনার, তারাও বলে দেবে, "মাথার জঞ্জাল আগে দূর কর। তারপর সংসার করার কথা ভাবিস।"
আর কেউ যদি, বাই চান্স, এই সব কিছুর পরেও নিজের জীবনের পথ নিয়ে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ হয়, যে, সে নিজে যাই হোক, তার নিজের সত্তাকে সে ঘৃণা করে না? কৈশোর থেকেই সে জানে, সে আর চার পাঁচজনের মত নয়। অসীম বুদ্ধি, অসীম ভালোবাসার ক্ষমতা তার। কিন্তু সমাজ শুধু তার 'অন্যরকম' হওয়াটাই দেখবে! বুলি করবে! হাসবে!
তাহলে, অভিনন্দন! আপনিই সেই অমর চরিত্র।
পাগলা দাশু। যে নিজের জীবনের রাশ যেভাবেই হোক, নিজের হাতে রাখবে ঠিক করেছে। কিন্তু, নিজের পদ্ধতিতে।
এবার, দাশুকে ঘেঁটে দেখা যাক। কে সে বইতে? আমাদের হাতে চারটে গল্প আছে। পাগলা দাশু, দাশুর খ্যাপামি, চীনেপটকা, দাশুর কীর্তি। প্রথম গল্পে আমরা দাশুকে কেমন দেখতে তার কিছু বর্ণনা পাচ্ছি। বয়সের তুলনায় রোগা। কিন্তু তুলনামূলকভাবে মাপে বড় মাথা (আমরা ধরে নিতে পারি, সমমাত্রিক বড় মস্তিষ্ক, যার প্রয়োগের প্রমাণ একাধিকবার পাব আমরা। যার শেষ, লেখকের সেই প্রশ্নে যা আজও পাঠককে হন্ট করে বলাই ভাল।) বড় বড় কান, যা অনেকেই বুদ্ধিদীপ্ততার লক্ষণ বলে ভাবেন। এবং বড় বড় গোল গোল চোখ। এগারো বারো বছরের আদর্শ প্রি-ম্যাসকুলিন ফিগার মোটেই নয়। অর্থাৎ, 'অন্যরকম'। শুধুমাত্র চেহারার জন্যই দাশু তার গ্রুপে একঘরে হতে পারত। কিন্তু, দাশু, ঠিক একঘরে নয়। সত্যি বলতে কি, গোটা গল্পে দাশু স্কুলের সবথেকে পরিচিত চরিত্র, লেখকের নিজের ঘোষণায়।
কেন? একটা কারণ খুব প্রকট। দাশুর উদ্ভট চলাফেরা। অদ্ভুত জামাকাপড় পরা। এবং অবশ্যই, 'অন্যরকম' দেখতে হওয়া। এই অন্যরকম দেখতে হওয়া নিয়ে অন্য কেউ দাশুকে কিছু বলার আগেই দাশু নিজেকে ক্লাস কমেডিয়ান হিসেবে বিখ্যাত করে ফেলে এবং 'কাক তাড়াতে' লোকে তাকে জ্যান্ত কাকতাড়ুয়া হিসেবে ব্যবহার করে, ইত্যাদি হাসির গল্প নিজেকে নিয়েই বলে বেড়ায়।
কারণ সে জানে, সামনে না বললেও তার সহপাঠীরা পেছনে একই বিষয় নিয়ে হাসাহাসি করবে। 'গেম অফ থ্রোনস'-এর টিরিয়ন ল্যানিস্টার যিনি পান করেন ও দুনিয়া বোঝেন, বলেছেন, "যদি অন্যরকম হও, কখনও ভুলো না, তুমি কে। কারণ, সমাজ তোমাকে ভুলতে দেবে না। তাই, অন্যরকম হওয়াকেই তোমার বর্ম হিসেবে ব্যবহার কর।"
জর্জ আর আর মার্টিন জন্মানোর আগে দাশরথী করে দেখিয়েছে সেটা কীরকম!
দাশুর পরিচিত হওয়ার এবং সম্ভবত স্কুলে চিনেপটকা ফাটিয়েও ছাড় পাওয়ার আরেকটা কারণ, হাসির হুল্লোড়ে আর উদ্ভট ঘটনাচক্রে একটু পর্দার আড়ালে চাপা পড়ে যায় যেন।
দাশু অসম্ভব ভালো ছাত্র। অসম্ভব বুদ্ধিমান। অঙ্কে, ইংরেজিতে, সংস্কৃতে এবং আমরা ধরে নিতে পারি অন্য বিষয়েও। ক্লাসে এসেই এবং পরেও যে দুজন সবথেকে বেশি দাশুকে বুলি করে, তারা দুজন প্রাক্তন সর্বোচ্চ নম্বর অধিকারী। জগবন্ধু ও রামপদ। এর মধ্যে জগবন্ধু টিপিকাল ফার্স্ট বয়। রামপদ প্রিভিলেজড হাই স্কোরার যার নম্বর ছাড়াও সাপোর্ট করার মত দাদা, মামা ইত্যাদি আছে। সম্ভবত বাড়িতে টিউটরও। কিন্তু দাশু জিনিয়াসের কাছে এরা দুপক্ষই হেরে ভূত। সেটা পরীক্ষার নম্বরই হোক বা শিক্ষকদের কাছে ইমেজ, বা ক্লাসের বন্ধুদের কাছে ইমেজ।
সমস্ত সহপাঠীদের মধ্যে লেখকের সঙ্গে দাশুর মোটামুটি ঝামেলাবিহীন সম্পর্ক, একমাত্র নাটকের সময় ছাড়া। শিশু বা প্রি-টিনদের রাবীন্দ্রিক নিষ্পাপ আলোকের বাইরে এসে দেখলে, সবাই জানে (কারণ সবাই মোটামুটি শিশু ও প্রি-টিন ছিল এককালে অন্তত) তারা সহপাঠীদের বুলি করতে সিদ্ধহস্ত। এমনকি, একটা এগারো বছরের বাচ্চার স্টেজে তরবারি আটকে যাওয়ার মতো টেকনিক্যাল ম্যালফাংশনও তারা ক্ষমা করে না। তাই পরের বছর দাশুকে নাটক থেকে নির্মমভাবে বাদ দেওয়ার প্ল্যান হয়। যদিও, দাশু শুধু রিহার্সাল দেখে, চার পাঁচটা পার্ট মুখস্থ করে ফেলার ক্ষমতা রাখে। এবং, আগের বছরের বকলস আটকানোটা অনিচ্ছাকৃত হলেও, এবারের গণ্ডগোল পাকানোগুলো নিঃসন্দেহে ইচ্ছাকৃত। তার কারণ দাশু নিজেই বলেছে গল্পের শেষে। সবাই পড়েছে।
কেউ কি বুঝেছে, তার পেছনে চোখ থেকে না বেরোনো জল ছিল? কারণ দাশু যে বর্ম পরে আছে। দাশুদের চোখের জল দেখাতে নেই। শুধু মন দিয়ে অঙ্ক কষে যেতে হয়। গ্রামার পড়তে হয়। ইতিহাস, ভূগোল কণ্ঠস্থ করতে হয়। বিজ্ঞান বুঝে জল করে ফেলতে হয়। কারণ 'পাগলা দাশু'দের ওটাই একমাত্র রাস্তা। THE ONLY WAY OUT. উপরে, আরও উপরে ওঠা। রামপদদের থেকে। জগবন্ধুদের থেকে। নাটকে না নেওয়া সহপাঠীদের থেকে।
গোটা চার গল্পের সিরিজে দাশু এমন একজনেরও ক্ষতি করেনি, যে অকারণ তার পেছনে লাগেনি, বডি শেম করেনি, বুলি করেনি। বেশিরভাগ সময়ই যখন সে নিজেকে নিয়ে ইয়ার্কি মারছে না বা দাবা খেলার মত জটিল কিন্তু নিষ্পাপ হাস্যকর বদলা নিচ্ছে না, আমরা তাকে বই পড়তে বা অঙ্ক করতে দেখি। দাশুকে কিছু কিছু জায়গায় রোয়াল্ড ডাল-এর ম্যাটিল্ডার সাথে তুলনা করতে ইচ্ছে হয়। ম্যাটিল্ডার মতই দাশুর সুপার পাওয়ার তার মগজাস্ত্র। হয়ত অন্যভাবে। কিন্তু, ফলাফল একই।
তাই বলে দাশুকে শারীরিকভাবে দুর্বল ভাবা খুব ভুল, তাও দাশু প্রমাণ করেছে। কিন্তু, সেটা শেষ সঞ্চিত অস্ত্র। একটা ক্লাস টেনের গাম্বাট ছেলেকে মেরে শুইয়ে দেওয়ার ক্ষমতা সে রাখে। কিন্তু, তার গায়ে হাত না দিলে সে কারও গায়ে হাত তোলে না। তাকে বিরক্ত না করলে সে কারোকে বিরক্ত করে না।
তবু, দাশু যে অন্যরকম! কেউ তাকে নিশ্চিন্তভাবে জি সি এম কষতে দেবে না। গ্রামার পড়তে দেবে না। তার যে, "ক্ষীণ দেহ খর্বকায় মুণ্ড তাহে ভারী। যশোরের কই যেন নরমূর্তিধারী।"
শতাব্দী অতিক্রান্ত হয়, আজও দাশরথি (মেয়ে হোক বা ছেলে) বর্ম পরে নেয় স্কুলে ঢোকার আগে, সহপাঠীদের সম্মুখীন হওয়ার আগে।
কবে সমাজ স্বীকার করতে শিখবে 'স্বাভাবিক' অনেকরকম হতে পারে? কবে আমরা, নিজেরা, সমাজের কাছে 'স্বাভাবিক' হওয়ার জন্য নিজের নিজস্বতা বলি দেব না? কেন আমাদের মুখোশ, বর্ম পরে ঘুরতে হয়? কেন? যাতে লোকে 'পাগলা' না বলে?
দাশু সেই দিনের জন্য অপেক্ষা করে আছে। যেদিন সে তার পাগলামির বর্ম খুলে রাখবে। তার 'বন্ধু'দের হাত ধরে বলবে, "অঙ্কটা ওভাবে করিস না। আয়, দেখিয়ে দি।"