সাধারণভাবে এই সব বাজি ব্যবহার করার কারণে বাতাসে দূষণের মাত্রা এমন ভয়ঙ্কর জায়গায় পৌঁছোয় যে সেই বিষাক্ত ধোঁয়া আমাদের চোখের রেটিনাকে ভীষণভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করে অকাল অন্ধত্ব ডেকে আনতে পারে । ফুসফুস আক্রান্ত হতে পারে ।

ছবি সংগৃহীত
শেষ আপডেট: 14 October 2025 14:47
দীর্ঘদিন যাবৎ আমরা পরিবেশ আকাদেমির পক্ষ থেকে বিভিন্ন সংশ্লিষ্ট মহল এবং সাধারণভাবে সকলের কাছে এই আবেদন নিবেদন করে এসেছি যেন দীপাবলি ও কালীপুজো সহ অন্যান্য উৎসবগুলি পালিত হয় কেবলমাত্র প্রদীপ ও মোমবাতির আলোয়। এতো দিনে আমরা সকলেই জেনে গেছি চোখ ঝলসানো আতশবাজি এবং বিশেষ করে শব্দবাজি কী কী ভাবে আমাদের ক্ষতি সাধন করে ।
সাধারণভাবে এই সব বাজি ব্যবহার করার কারণে বাতাসে দূষণের মাত্রা এমন ভয়ঙ্কর জায়গায় পৌঁছোয় যে সেই বিষাক্ত ধোঁয়া আমাদের চোখের রেটিনাকে ভীষণভাবে ক্ষতিগ্রস্থ করে অকাল অন্ধত্ব ডেকে আনতে পারে । ফুসফুস আক্রান্ত হতে পারে । শব্দবাজির ফলে উদ্ভূত শব্দদূষণের কারণে কানের পর্দা ফেটে গিয়ে কেউ সারাজীবনের জন্য বধিরও হয়ে পড়তে পারেন । স্নায়ুতন্ত্র আক্রান্ত হয়ে মস্তিষ্ক বিকল হতে পারে। মাত্রারিক্ত আওয়াজের ফলে আমাদের হার্টৈর মারাত্মক ক্ষতি হয়। এমনকী হার্ট ফেল করে মৃত্যুও অসম্ভব নয় ।

প্রসঙ্গত, পশ্চিমবঙ্গের বুকে বহু বেআইনি বাজি কারখানা এখনও বিদ্যমান। সংগৃহীত তথ্যের ভিত্তিতে বলা যেতে পারে যে নুঙ্গি, বজবজ, চম্পাহাটি, হারাল, সোনারপুর, বালি, বেলুর, চণ্ডীতলা, বেগমপুর, নৈহাটি, নীলগঞ্জ, বারাসত প্রভৃতি অঞ্চলে বেশ কিছু এই ধরণের বেআইনি বাজি তৈরির কারখানা রয়েছে। বার বার আবেদন নিবেদন করা সত্বেও এই বেআইনি কারখানাগুলি কাজ করে চলেছে। এইসব কারখানায় বিস্ফোরণের ফলে কেবলমাত্র এই রাজ্যেই এখনও পর্যন্ত প্রায় সত্তর জনের মতো মানুষ মারা গেছেন । এছাড়াও বাজি তৈরিতে শিশু শ্রমিকদের বেআইনি ভাবে ব্যবহার করা হয়। বাজির মশলায় এই শিশুরা বিভিন্ন রকমের রোগের শিকার হয়। ফুসফুসের সমস্যা, শ্বাসকষ্ট, চর্মরোগ, পেটের গোলমালসহ একাধিক অসুখে তারা আক্রান্ত হয় ।
যে 'সবুজ বাজি'-র কথা গতবছর বলা হয়েছিল, তা তৈরির জন্য লাইসেন্স প্রাপ্ত কোন কারখানার সন্ধান অন্তত এই রাজ্যে আমরা পাইনি। এমতাঅবস্থায় কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় আমাদের মনে রাখতে এবং কঠোরভাবে পালন করা দরকার।
১] উৎসবের আনন্দকে বজায় রাখতে নিয়ম মেনে সাউন্ড লিমিটার সহ মাইক্রোফোন ব্যবহার করতে হবে ।
২] শব্দ বর্জিত অঞ্চলে কোন প্রকার শব্দদূষণ কঠোরভাবে নিষিদ্ধ । শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, আদালত ও হাসপাতালের চারদিকে ১০০ মিটার পর্যন্ত এলাকা শব্দ বর্জিত অঞ্চল হিসাবে চিহ্নিত করা হয়েছে। এই অঞ্চলে হর্ণ বাজানো সম্পূর্ণরূপে নিষিদ্ধ ।
৩] নির্ধারিত সময়সীমা এবং প্রশাসনের অনুমতি ব্যতীত মাইক্রোফোন ব্যবহার করা যাবে না। রাত দশটার পর ও সকাল ছটার আগে মাইক্রোফোন ব্যবহার নিষিদ্ধ ।
৪] উচ্চ বিস্ফোরক শব্দ যুক্ত বাজি বা পটকার (চকলেট বোমা, দোদোমা, কালিপটকা প্রভৃতি) উৎপাদন ও ব্যবহার সম্পূর্ণভাবে নিষিদ্ধ ।
সংবেদনশীল নাগরিকদের সঙ্গে এই বিষয় গুলিতে সদর্থক প্রশাসনিক পদক্ষেপও একান্তভাবেই জরুরি । আমাদের সকলকে এটা নিশ্চিত করতে হবে, পশ্চিমবঙ্গের বুকে সবুজ বাজি ছাড়া অন্য কোন,ও ধরনের বাজি যেন না পোড়ানো হয়। একই সঙ্গে একথাও আমাদের মনে রাখতে হবে যে পশ্চিমবঙ্গের বুকে সমস্ত রকমের শব্দবাজি সম্পূর্ণভাবে নিষিদ্ধ। আমরা যেন কোনমতেই ঘরের বাচ্চাদের হাতে অন্য কোনরকমের নিষিদ্ধ বাজি তুলে দিয়ে তাদের স্বাস্থ্যকে মারাত্মক ক্ষতির মুখে ফেলে না দিই। কোনও কোনও মহল থেকে বেশ কিছু বিভ্রান্তিমূলক কথা ছড়ানো হচ্ছে। প্রাণঘাতী বাজির কারণে এই রাজ্যে সত্তর জনের মতো মানুষের মৃত্যুর পরও যাঁরা সাধারণ বাজি এবং শব্দবাজির সমর্থনে এই ধরনের কথা বলেন বা বলতে পারেন তাঁদের 'গণশত্রু' ছাড়া আর কী'ই বা বলা যায়?
আমরা আশা করব সকলের মিলিত প্রয়াসে আসন্ন কালীপুজো এবং দীপাবলীকে আমরা বায়ুদূষণ ও শব্দদূষণের হাত থেকে রক্ষা করতে পারবো। আসুন আমাদের এবং আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মের স্বার্থে সকল শুভবুদ্ধি ও বোধসম্পন্ন মানুষ একত্রিত হই। একজনের আনন্দ যেন কোনমতেই অন্যের দুঃখের কারণ হয়ে না ওঠে।
লেখক:
পরিবেশ আকাদেমি, চন্দননগরের সভাপতি। মতামত ব্যক্তিগত