আলিয়া ভাটের সেই প্রারম্ভিক সম্ভাষণ কোনও তাৎক্ষণিক দেশপ্রেম বা সংস্কৃতির টান থেকে উঠে আসেনি। একজন দক্ষ অভিনেত্রী হিসেবে তিনি কেবল তাঁর সামনে রাখা টেলিপ্রম্পটারে ভেসে ওঠা নির্দেশ পাঠ করেছেন মাত্র।

বিশ্বমঞ্চে আলিয়া ভাট
শেষ আপডেট: 24 February 2026 12:08
বিশ্বের আঙিনায় ভারতীয় সংস্কৃতির জয়গান আজ নতুন কিছু নয়। কিন্তু আধুনিক ‘ইনফ্লুয়েন্সার’ যুগে সাফল্যের সংজ্ঞা ও ‘গ্লাস সিলিং’ বা কাচের ছাদ ভাঙার মাপকাঠি যে কতটা লঘু হয়ে গিয়েছে, ব্রিটিশ অ্যাকাডেমি ফিল্ম অ্যাওয়ার্ডস বা বাফটা-র (BAFTA) মঞ্চে আলিয়া ভাটের (Alia Bhatt) উপস্থিতি ও তাঁর করা একটি সম্ভাষণ তা আবারও প্রমাণ করে দিল। আলিয়ার মুখে স্রেফ একটি হিন্দি শব্দ ‘নমস্কার’ শোনা মাত্রই সোশ্যাল মিডিয়া ও সংবাদমাধ্যমের একাংশ দাবি করে বসল— এক মহাজাগতিক ইতিহাস সৃষ্টি হয়েছে! কিন্তু ভাবাবেগের কুয়াশা সরিয়ে যদি আমরা পেশাদার সাংবাদিকের কলমে বাস্তবটা খতিয়ে দেখি, তবে ধরা পড়বে এক অন্য চিত্র। যেখানে শিল্পের চেয়ে টিআরপি (TRP) এবং সাহসিকতার চেয়ে সুপরিকল্পিত পিআর (PR) কৌশলই বেশি প্রকট।
আলিয়া ভাটের সেই প্রারম্ভিক সম্ভাষণ কোনও তাৎক্ষণিক দেশপ্রেম বা সংস্কৃতির টান থেকে উঠে আসেনি। একজন দক্ষ অভিনেত্রী হিসেবে তিনি কেবল তাঁর সামনে রাখা টেলিপ্রম্পটারে ভেসে ওঠা নির্দেশ পাঠ করেছেন মাত্র। বাফটা-র লেখকরা খুব অঙ্ক কষেই এই ‘দেশি’ ছোঁয়াটুকু স্ক্রিপ্টে রেখেছিলেন, কারণ তাঁরা জানতেন ভারতের বিশাল ডিজিটাল বাজারকে আকৃষ্ট করতে গেলে এর চেয়ে মোক্ষম অস্ত্র আর হয় না।
আমরা যদি ইতিহাসের দিকে তাকাই, তবে দেখব বিদেশের মঞ্চে নিজের ভাষাকে গর্বের সঙ্গে তুলে ধরা কোনও নতুন বিষয় নয়। ১৯৯৯ সালে অস্কারের মঞ্চে রবার্তো বেনিনি ইতালীয় ভাষায় আবেগঘন বক্তৃতা দিয়েছিলেন। ২০০৯ সালে পেনেলোপে ক্রুজ নিজের মাতৃভাষা স্প্যানিশে কথা বলে বিশ্বজয় করেছিলেন। এমনকি ২০২০ সালে দক্ষিণ কোরীয় পরিচালক বং জুন হো দোভাষীর সাহায্য নিয়ে কোরিয়ান ভাষায় দীর্ঘ ভাষণ দিয়ে বুঝিয়ে দিয়েছিলেন যে, শিল্পই শ্রেষ্ঠ ভাষা। সেই তুলনায় আলিয়ার একটি মাত্র পূর্ব-নির্ধারিত শব্দ উচ্চারণকে ‘যুগান্তকারী’ তকমা দেওয়াটা কেবল অতিশয়োক্তি নয়, বরং প্রকৃত কৃতিদের কৃতিত্বকে খাটো করা।
আলিয়াকে নিয়ে যে ‘দেশি’ উন্মাদনা তৈরি হয়েছে, তার মূলে রয়েছে এক গভীর স্ববিরোধিতা। জনৈক সমালোচক অত্যন্ত যুক্তিপূর্ণ প্রশ্ন তুলেছেন— ইতালীয় ডিজাইনারের পোশাকে সজ্জিত একজন ব্রিটিশ নাগরিক যখন বিলেতের মাটিতে দাঁড়িয়ে ভারতকে প্রতিনিধিত্ব করার দাবি করেন, তখন সেই গর্বের ভিত্তি কতটা মজবুত? আলিয়ার এই উপস্থাপনার চেয়ে ব্রিটিশ গায়ক এড শিরানের আরমান মালিকের সঙ্গে হিন্দি গান গাওয়া বরং অনেক বেশি আন্তরিক ও স্বতঃস্ফূর্ত মনে হয়েছিল। আমাদের জাতীয় আত্মসম্মান কি এতটাই ঠুনকো যে, আন্তর্জাতিক মঞ্চে স্রেফ একটা হিন্দি অভিবাদন পেলেই আমরা গলে জল হয়ে যাব?
আলিয়াকে নিয়ে যখন গোটা দেশ মত্ত, তখন আমাদের উদাসীনতার অন্ধকারে তলিয়ে গিয়েছেন মণিপুরি পরিচালক লক্ষ্মীপ্রিয়া দেবী। তাঁর ছবি ‘বুং’ বাফটার মঞ্চে সেরা শিশু ও পারিবারিক চলচ্চিত্রের শিরোপা জিতেছে। সেখানে পরিচালক নিজের মাতৃভাষায় ‘খুরুমজারি’ বলে বিশ্বকে স্বাগত জানিয়েছিলেন। কিন্তু সোশ্যাল মিডিয়ায় সেই মণিপুরি শব্দ বা সেই ঐতিহাসিক জয় নিয়ে কোনও ভাইরাল ট্রেন্ড দেখা গেল না। এই বৈপরীত্যই প্রমাণ করে যে, আমরা শিল্পের কদরের চেয়ে তারকার গ্ল্যামার আর তাঁর ইনস্টাগ্রাম অনুগামীদের সংখ্যা দিয়ে সাফল্যের বিচার করি।
আদতে বাফটা-র মতো মঞ্চগুলিতে ভারতীয় তারকাদের উপস্থিতি এখন অনেকটা ‘ব্রাউন বেটিং’ বা বাদামি চামড়ার দর্শকদের টোপ দেওয়ার শামিল। আলিয়ার প্রায় ৮৭ মিলিয়নের ইনস্টাগ্রাম অনুগামীই ছিল আয়োজকদের মূল লক্ষ্য। বাফটা কর্তৃপক্ষ পেয়েছে কাঙ্ক্ষিত ভিউ আর লাইক, আর বিনিময়ে আমাদের তারকারা পেয়েছেন সাময়িক একটু প্রচারের আলো। আলিয়াকে বিদেশি ভাষার ছবির পুরস্কার দিতে ডাকার নেপথ্যেও বোধহয় একটি প্রচ্ছন্ন কৌতুক ছিল— কারণ তিনি নিজেও তো বিলেতের নথিপত্রে একজন ‘বিদেশি’ (ব্রিটিশ নাগরিক)।
আলিয়ার এই ‘নমস্কার’ কোনও প্রথা ভাঙার গল্প নয়, বরং বিশ্বায়িত বাজারের কাছে আমাদের নতজানু হওয়ারই প্রতিফলন। বাফটার মঞ্চে আলিয়ার প্রতিভা কথা বলেনি, কথা বলেছে ভারতের জনশক্তি আর গ্রাহকসংখ্যা। ভারত তখনই প্রকৃত অর্থে বিশ্বমঞ্চে কাচের ছাদ ভাঙবে, যখন আলিয়ার গ্ল্যামারের চেয়ে লক্ষ্মীপ্রিয়া দেবীদের সৃজনশীলতা আমাদের আবেগকে বেশি আলোড়িত করবে। প্রতিনিধিত্ব আর বাণিজ্যিক প্রচারের মধ্যে যে সূক্ষ্ম কিন্তু গভীর ব্যবধান থাকে, তা চেনার দায়িত্ব এখন দর্শকেরই।