
শেষ আপডেট: 20 July 2023 16:28

১৯৬৯ সালের ২০ জুলাই! পৃথিবীর জন্য ঐতিহাসিক একটি ক্ষণ। কিন্তু ঘটনাস্থল পৃথিবী থেকে ৩,৮৪,৪০০ কিলোমিটার দূরে। সেদিন আর্মস্ট্রং ও অলড্রিন চাঁদে নামলেও কলিন্সের নামা হয়নি। বলা হয়, চাঁদের মাটিতে পা রেখে তাঁরা বদলে দিয়েছিলেন মানবসভ্যতার ইতিহাস (1969 moon landing)।
একটি পত্রিকা পরদিন ব্যানার লিড নিউজ করে মাত্র একটি শব্দে ‘চন্দ্রপদতলে’! পৃথিবী থেকে উৎক্ষেপণ এবং ফের পৃথিবীতে অবতরণ— এই মিশনটা সম্পূর্ণ হতে মোট সময় লেগেছিল ৮ দিন ৩ ঘণ্টা এবং ১৮ মিনিট।
৫০ বছরেরও বেশি হয়ে গেল সেই অভিযানের। সেদিন অজানা এক রোমাঞ্চকর অভিজ্ঞতায় চাঁদে হেঁটেছিলেন নাসার ‘অ্যাপোলো-১১’ অভিযানের দুই মহাকাশচারী নিল আর্মস্ট্রং ও এডুইন (বাজ) অলড্রিন।

কিন্তু একাকী নভোচারী কলিন্সের কেমন লেগেছিলো পুরো সময়টা? একা একা নভোযানে বসে চাঁদের কক্ষপথ প্রদক্ষিণ করে চলেছিলেন মহাকাশচারী মাইকেল কলিন্স।
১৯৭০ সালে সত্যজিৎ রায়ের ‘প্রতিদ্বন্দ্বী’ সিনেমায় ধৃতিমান চাকরির পেছনে হন্যে হয়ে ঘুরে বেড়ানো এক তরুণ যুবক। হতাশায় কাবু, তবু চাকরির ভাইভা বোর্ডে গিয়ে সে আদর্শে অটল। ইন্টারভিউতে প্রশ্ন করা হয়েছিল 'চাঁদের ওজন কত?' সহজ সরল কিন্তু বিরক্ত ধৃতিমান জিজ্ঞেস করে বসল, 'এর সাথে চাকরির কী সম্পর্ক?' এটা শুনেই প্রশ্নকর্তারা তাকে ইন্টারভিউ বোর্ড থেকেই বের করে দেয়।
বছর খানেক আগে চন্দ্রজয়ী কলিন্সের মৃত্যুর খবরে অভিনব শিরোনাম দিয়েছিলো বিবিসি অনলাইন লিখেছিল Unsung hero of the first Moon landing. আনসাং হিরো বলতে বোঝানো হয় নেপথ্যের নায়ককে, জনসাধারণ যার বন্দনা গায় না। কলিন্স যেহেতু চাঁদে গিয়েও চাঁদে নামতে পারেননি, তাই তাঁর বীরগাথা বাকি দুই অভিযাত্রীর থেকে কিছুটা কম প্রচারণায়। সিএনএন স্মৃতিচারণা করেছে এই বলে যে, Collins was often called “the loneliest man” once he returned to Earth, but he didn’t feel that way — even when he lost contact with Mission Control during his flybys on the far side of the moon. আরেকটু এগিয়ে গিয়ে কলিন্সের মৃত্যু সংবাদে লেখা হয়, 'It was a happy home. I liked Columbia'. এটি একাকী মহাকাশচারী কলিন্সের নভোযানকেই ঘর ভাবার প্রতীকী তাৎপর্য।
চাঁদের এই রকম ক্ষয় ও বৃদ্ধির চক্রাকারে পূর্ণিমা কাটিয়ে কখনও কখনও ঘন অমানিশা অপেক্ষা করে, সেটা প্রকৃতিই জানে। চাঁদ পৃথিবীর চারিদিকে প্রায় গোলাকার পথে ঘুরে বেড়ায়। ক্লান্তিহীন সে ঘুরছে। পূর্ণিমা সন্ধ্যার রজনীগন্ধায় আকাশ ভরা চাঁদের হাসি আর বাঁধভাঙ্গা আলো আমাদের পথ দেখায়। নজরুলকে বলতে শুনি- ‘চাঁদনি রাতে.. মনের আঁধার কেন গেল না’। চন্দ্রজয়ের দিনে শুধু মনে বাজছে কিছু কথা। চাঁদ যেমন একা; একটা মৌলিক একাকিত্ব মানুষ মাত্রেরই থাকে। কবি আবুল হাসান যেমন লিখেছিলেন, ‘মানুষ তার চিবুকের কাছেও একা।’ কলিন্সও সেদিন একা একা মহাকাশে নভোযানের গতি ও মতি ঠিকঠাক না রাখলে পরিণতি খুব সুখকর হত না। লেখক কমলকুমার মজুমদার বলেছিলেন, ‘আমরা এখন সব আল দেওয়া জমির মতো একা।’ একাকী চাঁদ এই বিভ্রান্তির মহাসমুদ্রে আমাদের পথ দেখায়। চাঁদ কখনও অসহায় মানুষের ক্ষুধার রাজ্যে গদ্যময় পৃথিবী। চাঁদ কখনও ইদের আনন্দচিহ্ন। চাঁদ কখনও কলঙ্কের উপমা। চাঁদ কখনও সৌন্দর্যের রূপক। জীবনানন্দের চাঁদ পাশে শুয়ে থাকা বধূ আর শিশু থাকার পরেও, প্রেম আর আশা থাকার পরও জ্যোৎস্নায় মরার ভূত দেখায় গৃহস্থকে! চন্দ্রজয়ের এই দিনে ঘুম ঘুম চাঁদ, ঝিকিমিকি তারা, আসুক মর্ত্যবাসী সকলের কাছে!
চলতি জুলাই মাসেই চাঁদের উদ্দেশে পাড়ি দিল ভারতীয় মহাকাশ গবেষণা সংস্থা ইসরোর চন্দ্রযান-৩। শ্রীহরিকোটার সতীশ ধওয়ান স্পেস সেন্টারের লঞ্চিং প্যাড থেকে চন্দ্রযান-৩ উৎক্ষেপণ করা হয়। ৪০ দিন পর, আগামী ২৩ থেকে ২৪ অগস্টের মধ্যে চাঁদের বুকে নামতে পারে চন্দ্রযান। চন্দ্রজয়ের অর্ধশতক পরে চাঁদ আমাদের আরও নিকটে আসুক, এটাই প্রত্যাশা!
লেখক সহযোগী অধ্যাপক
যোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়
‘এ কোন দেশ? লজ্জা লাগছে!’ শীঘ্রই কয়েকজন মুখ্যমন্ত্রীকে নিয়ে মণিপুরে যেতে পারি: মমতা