বেশি তেলেভাজা বা মিষ্টি খাওয়া স্বাস্থ্যের পক্ষে যে ভাল নয়, তা ইদানিং প্রায় সব গরিব ও প্রান্তিক মানুষও বোঝেন। সুতরাং এই প্রতিবেদনের উদ্দেশ্য চপ-সিঙাড়া খেতে উৎসাহ দেওয়া নয়। তবে প্রশ্ন তুলতেই হবে, বেছে বেছে শুধু এগুলোর কেন পিছনে পড়ল সরকার?

কেবল জিলিপি-সিঙাড়ায় স্বাস্থ্যের কোপ কি সঙ্গত?
শেষ আপডেট: 15 July 2025 15:10
ধরা যাক রাম একজন দিন মজুর। তাঁর সন্ধের টিফিন বলতে রেলস্টেশনের পাশে থাকা ঠেলাওয়ালার কাছ থেকে কেনা ১০ টাকার সিঙাড়া আর সঙ্গে এক কাপ চা। অথবা আপনিই হয়তো কোনও এক সরকারি অফিসে কাজ করেন। ক্যান্টিনে একটা সিঙাড়া খেতে গিয়ে দেখলেন, চোখের সামনে ঝলমলে বোর্ড ঝুলছে। তাতে যা লেখা রয়েছে তা স্পষ্টতই বোঝাচ্ছে যে ‘আপনার হাতের সিঙাড়াটা সিগারেটের মতোই ক্ষতিকর’।
অথচ অফিস বা রেল স্টেশন থেকে দু’পা দূরে যে চকচকে সুপারমার্কেট রয়েছে, তাতে প্রসেসড ফুড তথা প্রক্রিয়াজাত খাবারের পাহাড়! রঙিন মোড়কে মোড়া চিপস, চিনিভরা সিরিয়াল, সফ্ট ড্রিঙ্ক, ইনস্ট্যান্ট নুডলস, মিষ্টি ময়দার পাঁউরুটি—কী নেই! কিন্তু সেখানে কোথাও নেই কোনও স্বাস্থ্য-সতর্কতা। তাহলে বিপদ কোনটা? বা কোনটায় বিপদটা বেশি?
সম্প্রতি কেন্দ্রীয় স্বাস্থ্য মন্ত্রক সিঙাড়া, জিলিপি, পকোড়া, লাড্ডু, বড়াপাওয়ের মতো একাধিক ‘অস্বাস্থ্যকর’ খাবারের পাশে বিধিবদ্ধ সতর্কীকরণ জুড়তে বলেছেন। নাগপুরে অল ইন্ডিয়া ইনস্টিটিউট অফ মেডিকেল সায়েন্সেস (এইমসে) থেকে এই প্রচার শুরু হয়েছে। ঠিক যেমন সিগারেটের প্যাকেটের উপর সতর্কবার্তা লেখা থাকে, সিগারেট খেলে ফুসফুসের ক্ষতি, তেমনই সিঙাড়া-জিলিপির ব্যাপারেও এইরকম সতর্কবার্তা ঝোলানো হয়েছে। বলা হয়েছে, সিঙাড়ার তেল ও জিলিপির চিনি শরীরে কতটা ক্ষতি করে, সেই নিয়ে। কারণ কী? মানুষকে সচেতন করা।
স্বাস্থ্যসচেতনতা সবসময়ই গ্রহণযোগ্য। তবে সেই সচেতনতা সমস্ত ‘অস্বাস্থ্যকর’ খাবারের জন্যই তো থাকা উচিত। বস্তুত, সিঙাড়া, জিলিপি, পকোড়া, লাড্ডু, বড়া পাও, তালের বড়া, মন্ডা, আলুর চপ, বড়া— এসব খাবার বহু যুগ ধরে একপ্রকার ভারতীয় সংস্কৃতির অঙ্গ হয়ে উঠেছে। এগুলো রাস্তার পাশের ছোট ব্যবসায়ীরাই মূলত তৈরি করেন। কোটি কোটি সাধারণ মানুষের জন্য এগুলো সস্তা, সহজে পাওয়া যায়, এবং অনেক সময় তা একমাত্র পেট ভরানোর উপায়।
এখন, বেশি তেলেভাজা বা মিষ্টি খাওয়া স্বাস্থ্যের পক্ষে যে ভাল নয়, তা ইদানিং প্রায় সব গরিব ও প্রান্তিক মানুষও বোঝেন। সুতরাং এই প্রতিবেদনের উদ্দেশ্য চপ-সিঙাড়া খেতে উৎসাহ দেওয়া নয়। তবে প্রশ্ন তুলতেই হবে, বেছে বেছে শুধু এগুলোর কেন পিছনে পড়ল সরকার? আসল বিপদকে কি আড়াল করা হচ্ছে? বহুজাতিক কোম্পানিগুলোর প্রক্রিয়াজাত খাবার নিয়ে কেন নীরব স্বাস্থ্যমন্ত্রক?
ল্যানসেটের (Lancet) গবেষণা বলছে, শহুরে ভারতীয়রা আজ অর্ধেকের বেশি ক্যালোরি গ্রহণ করে আল্ট্রা-প্রসেসড ফুড থেকে। ২০০৫ সালে এই হার ছিল মাত্র ১১%। ভারতে ২০ থেকে ৩০ শতাংশ প্রাপ্তবয়স্ক নাগরিক অতিরিক্ত ওজনের শিকার, যার প্রধান কারণ—প্যাকেটজাত ফাস্ট ফুড, সফট ড্রিঙ্কস ও প্রক্রিয়াজাত মিষ্টি খাবার।
সেন্টার ফর সায়েন্স অ্যান্ড এনভায়রনমেন্টের (Centre for Science and Environment - CSE) এক রিপোর্ট অনুযায়ী, ভারতে বিক্রি হওয়া ৯৪% প্রক্রিয়াজাত খাবারে লবণ, চিনি ও স্যাচুরেটেড ফ্যাটের মাত্রা অনুমোদিত সীমা ছাড়িয়ে গেছে। অথচ এসব খাবারে কোনও ‘তীব্র সতর্কতা’ নেই। কেউ কিচ্ছু বলে না।
অনেকের মতে, ছোট ব্যবসায়ীদের চপ, সিঙাড়া, জিলিপিকে ‘সিগারেট’-এর মতো ক্ষতিকর বলে দাগিয়ে দিয়ে মোদী সরকার আসলে কোটি কোটি মানুষের জীবিকাকেই বিপন্ন করে তুলছেন। আসলে এই অভিযান ‘জনস্বাস্থ্য সচেতনতা’ নয়, বরং গরিবের জীবিকা ও খাদ্যাভ্যাসকে কলঙ্কিত করার চেষ্টামাত্র। কর্পোরেটদের ছোঁয়া যাচ্ছে না, তাই সিঙাড়া-জিলেপিকে টার্গেট করো।
সত্যিই যদি দেশের সাধারণ মানুষের স্বাস্থ্য নিয়ে ভাবা হতো, তাহলে সরকারের যা করা উচিত ছিল তা হল— আল্ট্রা-প্রসেসড ফুডে ফ্রন্ট অফ প্যাক লেবেলিং বাধ্যতামূলক, যেমন মেক্সিকো, চিলি, ইজরায়েলে হয়। তরিতরকারি, ডাল, ফলমূলের দাম কমিয়ে তা আরও বেশি করে খাওয়ায় উৎসাহ দেওয়া। স্কুলে প্রক্রিয়াজাত খাবারের বিজ্ঞাপন নিষিদ্ধ করা। স্থানীয় কৃষি ও দেশীয় খাবারের সংস্কৃতি রক্ষা করা। প্রতিটি প্যাকেটজাত খাবারে সতর্কতা, লাল চিহ্ন, লবণ-চিনির পরিমাণ স্পষ্ট করে দেওয়া।
অথচ এসবের কিছুই করল না সরকার। এখন প্রশ্ন উঠতে পারে, কোন খাবার ‘জাঙ্ক’ আর কে ঠিক করবে সেটা?
সিঙাড়ার কথাই ধরা যাক। তার গায়ে কোনও লেবেল নেই, বারকোড নেই। সেটি ‘আল্ট্রা প্রসেসড’ নয়। তাজা ময়দা, আলু, ঘরোয়া মশলা দিয়েই তৈরি। একবার তেলে ভাজা হয় ঠিকই, তবে তা মানুষ নিজ হাতেই তৈরি করে। তাই সেটি সিগারেটের মতো ‘বিপজ্জনকট— এই তুলনা নিছক হাস্যকর।
উল্টোদিকে শিশুদের জন্য বানানো চকোলেট বারে বা ‘হেলদি’ বলে বাজারজাত করা প্রক্রিয়াজাত ফাস্ট ফুডে কেউ কিছু বলে না।
আসল বিপদ তাহলে কোথায়? সবচেয়ে বড় বিপদ হল, সরকারের এই পদক্ষেপ স্বাস্থ্যনীতি নয়, লোকদেখানো নাটক। এতে সমস্যার শিকড় ধরা হচ্ছে না, বরং গরিব মানুষের সস্তা খাবার ও তাদের জীবিকাকে অপরাধী বানানো হচ্ছে।
খতিয়ে দেখলে বোঝা যাবে, জিলিপি-সিঙাড়া নয়, আসল বিপদ কর্পোরেটের মোড়কে ঢাকা খাবারে। আর সেই বিপদের পেছনে দাঁড়িয়ে আছে মুনাফার খেলোয়াড়রা, যাঁদের গায়ে কোনও সতর্কতা সাঁটা হয় না।