রাহুল গান্ধী (Rahul Gandhi) এবার স্বচ্ছ ভোটের (Clean Vote) দাবিতে পথে নামছেন। রবিবার থেকে তেজস্বী যাদবকে সঙ্গে নিয়ে বিহারে আগামী ১৬ দিনে ১৩০০ কিলোমিটার পথ হেঁটে অতিক্রম করবেন তাঁরা। উদ্দেশ্য স্বচ্ছ ভোট নিশ্চিত করা।

ফাইলে
শেষ আপডেট: 17 August 2025 13:22
রাহুল গান্ধী (Rahul Gandhi) এবার স্বচ্ছ ভোটের (Clean Vote) দাবিতে পথে নামছেন। রবিবার থেকে তেজস্বী যাদবকে সঙ্গে নিয়ে বিহারে আগামী ১৬ দিনে ১৩০০ কিলোমিটার পথ হেঁটে অতিক্রম করবেন তাঁরা। উদ্দেশ্য স্বচ্ছ ভোট নিশ্চিত করা।
ভারতে বিরোধী (Opposition Parties in India) দলগুলি, এমনকী বিজেপিও (BJP) যখন ক্ষমতার বাইরে ছিল, তারা মূলত ইভিএম কেলেঙ্কারি (EVM manipulation)) নিয়ে সরব থেকেছে। যদিও ইভিএমে কারচুপির বিশ্বাসযোগ্য কোনও দৃষ্টান্ত বিরোধীরা হাজির করতে পারেনি। ভোটের ফল প্রকাশের পর তারা ইভিএমের দিকে আঙুল তুলে পরাজয়ের গ্লানি আড়াল করেছে। দীর্ঘদিন ভোট এবং নির্বাচন কমিশনের খবরাখবর করার সুবাদে আমার মনে হয়, বিরোধীরা এতদিনে আসল জায়গাটি ধরেছে। সেটা হল, ভোটার তালিকায় কারচুপি।
গত শতকের নয়ের দশকের মাঝামাঝি সময় থেকে নির্বাচন কমিশন ভোটার তালিকা সংশোধনের কাজটি নিষ্ঠার সঙ্গে করে আসছিল। টিএন শেসন মুখ্য নির্বাচন কমিশনার হওয়ার পর ভারতের নির্বাচন ব্যবস্থায় যে ইতিবাচক পরিবর্তন সাধন করেন স্বচ্ছ ভোটার তালিকা তারমধ্যে অন্যতম। তাঁর হাত দিয়েই স্বচিত্র ভোটার কার্ড চালু হয়। ভোট ঘিরে সরকার তথা প্রশাসনের অনাচারগুলিরও একে একে অবসান হতে থাকে তাঁর সময় থেকে।
দুর্ভাগ্যের হল, সেই টিএন শেসনকে ‘স্বৈরাচারি’ কথাটি শুনতে হয়েছে তাঁর কিছু সিদ্ধান্তের কারণে। যদিও কমিশনের সাংবিধানিক গণ্ডির মধ্যে থেকেই সিদ্ধান্তগুলি নিয়েছিলেন তিনি। আবার সৌভাগ্যের হল, শেসন পরবর্তী নির্বাচন কমিশনার, মুখ্য নির্বাচন কমিশনারেরা এই পূর্বসূরির ইতিবাচক সিদ্ধান্তগুলির বাস্তবায়নে আন্তরিক থেকেছেন। যেমন ২০০১ সাল থেকে কমিশন ‘অপারেশন ক্লিন রোল’ অভিযান চালাচ্ছে। অর্থাৎ ভুয়ো ভোটার মুক্ত তালিকা তৈরি।
গুজরাত দাঙ্গার পর রাজ্য প্রশাসন মুসলিম ভোটারদের নাম নির্বিচারে বাদ দেওয়ায় তৎকালীন মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জেএম লিংডো বিধানসভার নির্বাচন পিছিয়ে দিয়েছিলেন। রাজ্যের তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর তখন লিংডো এবং কমিশনকে আক্রমণ এক কুৎসিত নজির হয়ে আছে। বিবাদ সুপ্রিম কোর্টে গড়ালে শীর্ষ আদালত বলে, সংবিধানের ৩২৪ নম্বর অনুচ্ছেদ অনুযায়ী ভোটার তালিকা তৈরি, সংশোধন, নির্বাচনের দিনক্ষণ নির্ধারণে কমিশনই শেষ কথা। এটা তাদের সার্বভৌম ক্ষমতা।
আমার মনে হয়, ভারতে নির্বাচন কমিশনের ভূমিকা নিয়ে বিগত কয়েক বছরে ক্রমবর্ধমান বিতর্কের মূলে রয়েছে তাদের এই অসীম, প্রশ্নাতীত সার্বভৌম ক্ষমতাই। দিনের শেষে প্রতিষ্ঠানের ক্ষমতায় বলিয়ান ব্যক্তিরা ঠিক করেন কী করবেন, কী করবেন না। ২০১৯ থেকে ভারতের নির্বাচন কমিশনের ভূমিকা আমূল বদলে যেতে বসেছে। অথচ এমন নয় যে তারা নতুন কোনও সাংবিধানিক বিধান বা আইনে তা অতিরিক্ত ক্ষমতায় বলিয়ান হয়েছে।
সব সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানেরই কাজের মূল লক্ষ্য বা উদ্দেশ্য স্থির করা থাকে। নির্বাচন কমিশনের কাজ হল, আঠারো উত্তীর্ণ বৈধ ভারতীয় নাগরিকদের নাম ভোটার তালিকায় নথিভুক্ত করে তাদের ভোটদানে উৎসাহিত করা। অর্থাৎ নাম তোলার সময় নাগরিকত্বের প্রমাই যাচাইবাছাই করা তাদের প্রাথমিক কর্তব্যের মধ্যেই পড়ে। কিন্তু বিহার দিয়ে ভোটার তালিকার যে বিশেষ নিবিড় সংশোধনীর কাজ তারা শুরু করেছে তা কমিশনের নির্ধারিত কাজের অংশ নয়। তারা তালিকায় নাম থাকা ভোটারদেরও নাগরিকত্ব প্রমাণ করতে বলছে।
ভারতের ভোটার তালিকায় বিদেশির নাম থাকলে বাদ দেওয়া কমিশনের কাজ। কিন্তু সেই কাজটা তাদের করার কথা পুলিশ, গোয়েন্দা, কিংবা কোনও সহ-নাগরিকের কাছ থেকে কোনও ভোটারের নাগরিকত্ব চ্যালেঞ্জ করা হলে। কমিশনের কাজ সেই রিপোর্ট বা অভিযোগ খতিয়ে দেখা। তাই বলে কোনও একটি নির্বাচনের মুখে নাগরিকত্ব যাচাই কমিশের মুখ্য কর্মসূচি হতে পারে না। কমিশনের এই ভূমিকা তাদের মূল লক্ষ্য বা আদর্শের পরিপন্থী।
বিহারে স্পেশ্যাল ইন্টেনসিভ রিভিসন বা স্যার (SIR) চালুর সিদ্ধান্ত ঘোষণার পর অনেকেই ভেবেছিলেন এরফলে শুধু মুসলিম অনুপ্রবেশকারীদের নাম বাদ যাবে। সেদিনই ‘দ্য ওয়াল’-এ একটি ভিডিও-তে আমি বলেছিলাম, শুধু সংখ্যালঘুরাই নয়, প্রান্তিক, আর্থিক-সামাজিক-শিক্ষাগতভাবে পশ্চাৎপদ অংশের নাম বাদ যাওয়ার আশঙ্কা বেশি।
ভারতে নাগরিকদের বড় অংশ নথিবিহীন। গরিব মানুষের এই সমস্যা আরও বেশি। বিহার-সহ গোটা দেশেই তথাকথিত নিম্নজাত আর গরিবি সমার্থক। বিহারে সন্দেহভাজন ৬৫ লাখ ভোটারের নব্বই ভাগই নিম্নবর্গের এবং নিম্ন শ্রেণির মানুষ। আর্থিক ও সামাজিকভাবে অগ্রবর্তী অংশের নাম বাদ গেলে যে প্রতিক্রিয়া, প্রতিঘাত হবে, তা গরিব-দলিত-ওবিসি-সংখ্যালঘুর ক্ষেত্রে হবে না, বিজেপি ও কমিশন সেটা জানে। ভোটের মূল্য সবার সমান। বিজেপি গরিবের ভোট বাতিল করে নিজেদের কোর ভোটব্যাঙ্কের ভরসায় ক্ষমতা ধরে রাখতে চাইছে। কারণ পদ্ম শিবির ইস্যুর সংকটে ভুগছে। রামন্দির নির্মাণ, অভিন্ন দেওয়ানি বিধি চালু, ৩৭০ নম্বর অনুচ্ছেদের মতো হিন্দুত্ব চালিত কর্মসূচি বাস্তবায়নের পর তারা দেশপ্রেমকে আরও বেশি করে আঁকড়ে ধরতে চাইছে। বিজেপির দৃষ্টিতে নাগরিকত্বের ইস্যুটিতে দেশপ্রমের সঙ্গে মিশে আছে হিন্দুত্বও। নাগরিকত্ব এমন একটা বিষয় যা রাতের ঘুম কেড়ে নেওয়ার জন্য যথেষ্ট। বিজেপি কৃত্রিম অনিশ্চিয়তা, উৎকণ্ঠা তৈরি করে দেশবাসীকে চাপে রাখার কৌশল নিয়েছে।
নরেন্দ্র মোদী দিল্লির মসনদে তাঁর ও দলের ইংনিংস দীর্ঘায়িত করতে যে সব প্রতিষ্ঠানকে হাতিয়ার করেছেন তার অন্যতম হল নির্বাচন কমিশন। আমি ইতিপূর্বে একাধিক লেখায় বলেছি, ২০১৯-এর লোকসভা ভোটের সময় থেকে নির্বাচন কমিশন বিজেপির গোলকিপারে পরিণত হয়েছে। বিরোধীরা যাতে বিজেপির গোল পোস্টে বল ঠেলতে না পারে মূলত সেটা নিশ্চিত করাই তাদের কাজ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
তাই টিএন শেসন যদি হন ভারতের নির্বাচন কমিশনের অন্যতম সংস্কারক, অবাধ ভোট নিশ্চিত করার রেফারি, আড়াই-তিন দশক পর সেই একই প্রতিষ্ঠানে তাঁর বিপরীত ভূমিকায় হাজির হয়েছিলেন সুনীল অরোরা। ২০১৯-এর পর থেকে এ পর্যন্ত দু’জন নির্বাচন কমিশনার মাঝপথে সরে গিয়েছেন, ১৯৫১ সালে কমিশন গঠনের পর যা কখনও হয়নি। অরুণ গোয়েলের সঙ্গে মতবিরোধের কারণে সরে যান অশোক লাভাসা। ’১৯-এর লোকসভা নির্বাচনের প্রচারে প্রধানমন্ত্রী ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বিরুদ্ধে বিধিভঙ্গের অভিযোগে ব্যবস্থা নিতে চেয়েছিলেন তিনি। মুখ্য নির্বাচন কমিশনার অরোরা-সহ বাকি দুই কমিশনার রাজি হননি। যদিও অভিযোগগুলির সত্যতা নিয়ে জনমনে তেমন একটা কোনও সংশয় ছিল না।
২০২৪-এর লোকসভা নির্বাচনের নির্ঘণ্ট প্রকাশের মুখে অরুণ গোয়েল আচমকাই কমিশনারের পদ থেকে সরে যান। জানা যায়, পশ্চিমবঙ্গ-সহ কয়েকটি রাজ্যে দীর্ঘ ভোটগ্রহণ প্রক্রিয়া নিয়ে আপত্তি তুলেছিলেন তিনি।
লক্ষণীয়, ২০১৯-এর পর কমিশনার, মুখ্য নির্বাচন কমিশনার নিয়োগের পদ্ধতি পরিবর্তনের দাবি জোরদার হয় কমিশনে মোদী জমানার অভিভাবকদের শাসক দলের প্রতি মাত্রা ছাডা আনুগত্য প্রকাশ্যে আসায়। সুপ্রিম কোর্ট তাই নিয়োগ প্যানেলে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে শীর্ষ আদালতের প্রধান বিচারপতি এবং লোকসভার বিরোধী দলনেতাকে যুক্ত করতে রায় দিয়েছিল। মোদী সরকার সংসদে বিল এনে সেই রায় খারিজের পাশাপাশি নিয়োগ কর্তাদের নতুন যে প্যানেল তৈরি করেছে তাতে সর্বদা সরকারের অনুগতরাই নির্বাচন কমিশনের দণ্ডমুণ্ডের কর্তা হবেন। এখন তিনজনের নিয়োগ কমিটিতে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে একজন সিনিয়র মন্ত্রীকে রাখা হয়েছে। ফলে বিরোধী দলনেতার কথা কানে তোলার প্রয়োজনই থাকছে না।
মোদী সরকার কমিশনের মুখ চেয়ে গত বছর ১৯৬১ সালের নির্বাচনী বিধি সংশোধন করেছে। তাতে বুথের ভিতরে সিসি ক্যামেরা এবং ওয়েবকাস্টিংয়ের ফুটেজ দেখার অধিকার কেড়ে নিয়ে অনিয়ম ধাপাচাপা নিশ্চিত করা হয়েছে।
ফিরে আসি সংবিধানের ৩২৪ নম্বর অনুচ্ছেদের প্রসঙ্গে। এই অনুচ্ছেদে কমিশনকে শেষ কথা বলার যে অধিকার দিয়েছে তা কি তারা সঠিক উদ্দেশ্যে প্রয়োগ করছে? পশ্চিমবঙ্গে চার অফিসারকে বরখাস্তের প্রসঙ্গেই আসা যাক। রাজ্য সরকারের পূর্ণ অধিকার আছে কমিশনের সুপারিশ খতিয়ে দেখার। মনে রাখতে হবে কমিশন যেমন একটি সাংবিধানিক সংস্থা, তেমনই সরকার জনগণের দ্বারা নির্বাচিত প্রতিষ্ঠান। সরকার পরিচালনায় তারাও সার্বভৌম ক্ষমতার অধিকারী। রাজ্য সরকারি কর্মচারীরা ওয়েস্ট বেঙ্গল সার্ভিস রুল, ১৯৮০ দ্বারা পরিচালিত হন। কর্মচারীদের বরখাস্ত করার বিধিমালা সেখানে বলা আছে। কমিশনের কথা শিরোধার্য করে সাসপেন্ড করার অর্থ সার্ভিস রুল অগ্রাহ্য করা যা বিধানসভার অনুমোদন সাপেক্ষে কার্যকর হয়েছে।
নির্দেশ কার্যকর না হওয়ায় কমিশন মুখ্যসচিবকে কার্যত কয়েক ঘণ্টার নোটিসে দিল্লিতে তলব করে। মুখ্যসচিবের ব্যস্ততা সম্পর্কে কমিশনের ধারণা না থাকার কথা নয়। তাঁকে দিল্লিতে তলব করে হুঁশিয়ার করা এক ধরনের আমলাতান্ত্রিক দাদাগিরি, সার্বভৌম ক্ষমতার অপব্যবহার। যেমন রাজনৈতিক দলগুলির সঙ্গে আলোচনা ছাড়াই বিহারে আচমকা তালিকা সংশোধনের নয়া নিয়ম চালু করেছে তারা।
ভোটের মুখে থানার ওসি, পুলিশের ডিজি, স্বরাষ্ট্রসচিব, মুখ্যসচিবকে বিরোধীদের কথায় সরিয়ে দেওয়া কমিশমের রুটিন কাজ হয়ে দাঁড়িয়েছে যা অত্যন্ত নিম্নমানের রেফারিংয়ের নজির। ভোটের ময়দানে শাসকের মতো বিরোধীরাও একটি পক্ষ। রেফারি হিসাবে কমিশনের কাজ সকলের জন্য উপযুক্ত পরিবেশ তৈরি রাখা। ২০১৯-এর লোকসভা ভোটে বাংলায় প্রধানমন্ত্রীর সভা শেষ হওয়া মাত্র একদিন বাকি থাকতে কমিশন প্রচারে ইতি টেনে দিয়েছিল। কলেজ স্ট্রিট থেকে সাময়িক ১৪৪ ধারা প্রত্যাহার করে অমিত শাহের রোড শো’র ব্যবস্থা করে দিয়েছিল। যে রোড শো’য়ের জেরে বিদ্যাসাগরের মূর্তি ভাঙার ঘটনা ঘটে।
তাই বলে কমিশনের নিরপেক্ষতা নিয়ে অভিযোগ নতুন নয়। কিন্তু এখনকার মতো দু’কান কাটা, নির্লজ্জতার দৃষ্টান্ত বিরল। কমিশনের সার্বভৌম ক্ষমতার আধার সংবিধানের ৩২৪ নম্বর অনুচ্ছেদের পরিধি নিয়েও তাই ভাবনাচিন্তা জরুরি।