
যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে অশান্তি।
শেষ আপডেট: 3 March 2025 15:16
যাদবপুর কাণ্ডে যাঁরা সরব হয়েছেন, তাঁরা স্পষ্টত দু-টি ভাগে বিভক্ত। একদল বিচার চাইছেন শিক্ষা মন্ত্রীর গাড়ির চাকার ধাক্কায় আহত ছাত্রের হয়ে। আরেকদল বিচার চাইছেন অধ্যাপকদের একটি সংগঠনের সভায় ঢুকে যে-ছাত্ররা হামলা চালিয়েছে, অধ্যাপকদের নিগ্রহ করেছে, তাদের শাস্তির দাবিতে। বন্ধু-পরিজনদেরও কেউ কেউ যেই পক্ষ নিচ্ছেন, অমনি আরও কিছু বন্ধুজন সমাজ মাধ্যমে তাঁদের আক্রমণ করছেন, ‘আনফ্রেন্ড’ও করছেন। প্রশ্ন হল, এভাবে পক্ষ কি নিতেই হবে? পক্ষ না নিয়ে কি ঘটনাটিকে দেখা সম্ভব নয়?
একটি কথা ঠিক। শনিবার সাধারণত এ রাজ্যের বিশ্ববিদ্যালয়গুলিতে ক্লাস হয় না। যাদবপুরেও না। কাজেই এরকম একটি দিনে যদি ওয়েবকুপা তাদের বার্ষিক সাধারণ সভাটি অনুমতিক্রমে যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে আয়োজন করে, তাতে দোষের কিছু নেই। এই সভার আয়োজনে পড়াশোনার পরিবেশ ব্যাহত হওয়ার কথা নয়। কাজেই এই প্রশ্ন যদি কারোর মনে জাগে যে, শিক্ষামন্ত্রী তাঁর দলের সমর্থক অধ্যাপকদের একটি সভায় হাজির হওয়ায় সেখানেই তাঁকে ডেপুটেশন দেওয়ার প্রয়োজন কী ছিল এক শনিবার–সে প্রশ্নকে ছোটো করে দেখার কারণ নেই। এই ডেপুটেশন তো সত্যিই আলাদাভাবেও শিক্ষামন্ত্রীর কাছে দেওয়া যেতে পারত অন্যদিনে। এ কথা যেমন সত্য, তেমনই একথাও সত্য যে, দীর্ঘদিন ধরে রাজ্যের কলেজগুলিতে ছাত্রসংসদের নির্বাচন হচ্ছে না। রাজনীতি সচেতন ছাত্রদের এ বিষয়ে ক্ষোভ ও উৎকণ্ঠা থাকা খুবই স্বাভাবিক। তাই হয়তো তারা শিক্ষামন্ত্রীকে হাতের কাছে পেয়ে ডেপুটেশন দিতে চেয়েছে।
তবে ঘটনা পরম্পরা থেকে আমার একটি জিনিস মনে হয়েছে। দীর্ঘদিন ধরেই যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয় লাল-দুর্গ হিসেবেই পরিচিত। বিজেপি বা তৃণমূল কংগ্রেস কোনও দিক থেকেই যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালযয়ে তাদের উল্লেখযোগ্য উপস্থিতি জাহির করতে পারেনি। কিছুদিন আগেও সেখানে সমবায় নির্বাচনে বামেরাই জয়ী হয়েছে। এই প্রথম যাদবপুরে নিজেদের সগর্ব উপস্থিতি জাহির করার একটি উদ্যোগ তৃণমূল কংগ্রেসের অধ্যাপকদের সংগঠনটি নিয়েছিল। সেটি হয়তো মেনে নেওয়া যাদবপুরের বিভিন্ন বাম মতাবলম্বী ছাত্র-ছাত্রীদের পক্ষে অসুবিধেজনক মনে হয়েছে। একটা জিনিস মনে রাখা দরকার, ঘটনা পরম্পরা যেদিকে গড়াচ্ছে তাতে আগামীতে ওয়েবকুপা আবারও যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয় সভার আয়োজন করবে। গণতন্ত্র কিন্তু ভিন্নমতের প্রচার এবং প্রসারের অনুকূল পরিবেশ তৈরি করতেই চায়। এটি গণতন্ত্রের আবশ্যিক শর্ত। শাসক এবং বিরোধী সমস্ত দল এবং সেই দলগুলির সমর্থক অধ্যাপক, শিক্ষাকর্মী এবং ছাত্রছাত্রীদের এই শর্তটিকে মনে রাখতে হবে। ভিন্নমতকে সম্মান করার অভ্যেস রপ্ত করতেই হবে। ২৬-এর নির্বাচন আসছে। এই অভ্যেস রপ্ত না করলে রাজ্যের উচ্চশিক্ষাঙ্গনগুলি আগামীতে আরও উত্তপ্ত হবে।
যে-ছেলেটির চোখ এবং পা আহত হয়েছে বলে সে নিজে জানিয়েছে এবং আঘাত স্পষ্টতই দৃশ্যমান, সে গাড়ির নীচে চাপা পড়েছে কি না তা নিয়ে শুরু হয়েছে বিতর্ক। ছাত্রটি নিজে কিন্তু বলছে যে, সে গাড়ির তলায় পড়ে গিয়েছিল। যে-ভিডিও সামনে এসেছে, সেই ভিডিও দেখেও প্রাথমিকভাবে তেমনটাই মনে হয়েছে। যদিও সেই ভিডিওর ফ্রেম বাই ফ্রেম চুলচেরা বিশ্লেষণ করে অনেকেই প্রমাণ করতে চাইছেন যে, ছাত্রটি আদৌ শিক্ষামন্ত্রীর গাড়ির চাকায় আহত হয়নি। কিন্তু, যেটুকু দেখেছি এই ফ্রেমগুলি, তা থেকেও পরিষ্কার কোনও সিদ্ধান্তে আসতে আমার মতো অনেকেই হয়তো পারছেন না। এই সত্যটি তবে কেউই অস্বীকার করতে পারবেন না যে, শিক্ষামন্ত্রীর গাড়িটি যদি ওইভাবে ক্যাম্পাস না ছাড়ত, তাহলে ছাত্রটি আহত হত না।
আবারও একইসঙ্গে এও সত্য, ওইদিন ওয়েবককুপার সমাবেশে অংশ নিয়েছিলেন আমার পরিচিত অনেক শিক্ষকবন্ধু এবং ছাত্র-ছাত্রী, যাঁরা এখন শিক্ষক। এঁরা কেউ কেউ আহত হয়েছেন, কেউ কেউ ভীষণ ভয় পেয়ে গেছেন। ওয়েবককুপার সদস্যদের ওপর চড়াও হওয়ার কি সত্যিই কোনও প্রয়োজন ছিল ছাত্রদের? আমরা যাঁরা দুই ছাত্রের আহত হওয়ার ঘটনার নিন্দে করছি, শিক্ষকদের ছাত্রদের দ্বারা নিগৃহীত হওয়ার ঘটনাটিরও কি তারা একইভাবে নিন্দে করব না? ছাত্র আন্দোলন করার অর্থ কি শিক্ষকদের নিগ্রহ করা? কেউ কেউ বলার চেষ্টা করছেন যে, শিক্ষকরাও মারমুখী হয়ে উঠেছিলেন। এরকম কোনও ফুটেজ আমি অবশ্য এখনও দেখতে পাইনি। তা যদি হয়ে থাকে তা অবশ্যই নিন্দনীয়। কিন্তু কোনও যুক্তিতেই মন্ত্রীর গাড়ির চাকার তলায় পিষ্ট হয়ে বা গাড়ির ধাক্কায় ছিটকে পড়ে স্কুটারে মাথা লেগে একজন ছাত্র আহত হলে সেই ঘটনাকে যেমন সমর্থন করা যায় না, তেমনই ছাত্রছাত্রীদের দ্বারা শিক্ষক নিগ্রহকেও সমর্থন করা যায় না। একইভাবে কিন্তু এই প্রশ্নও ওঠে যে, ওয়েবকুপার সাধারণ বার্ষিক সভার জন্য স্থানীয় তৃণমূলের কর্মীদের যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাসে প্রবেশের কী প্রয়োজন ছিল? তাঁরা যে ক্যাম্পাসে হাজির ছিলেন, একাধিক প্রতিবেদনে সে কথা উল্লেখিত হয়েছে।
সবচেয়ে বেদনার এটিই যে, আহত ছাত্র দু-টির পক্ষে যাঁরা কথা বলছেন, তাঁরা শিক্ষক-নিগ্রহ নিয়ে নীরব। শিক্ষক-নিগ্রহ নিয়ে যাঁরা কথা বলছেন, তাঁরা আবার আহত ছাত্র দু-টিকে নিয়ে নীরব। কেউ কেউ অবশ্য নীরব নন, যে-ইন্দ্রানুজ রায় বুদ্ধদেব ভট্টাচার্যকে কুৎসিত ভাষায় আক্রমণ করেছে, তাকে মহম্মদ সেলিম কেন দেখতে গেছেন, সেই প্রশ্নও তুলছেন। অসুস্থ মানুষকে দেখতে গেলেও কি তাহলে এরপর থেকে আগে তাঁর দল এবং মতাদর্শগত বা রাজনৈতিক অবস্থান জানতে হবে? আহত বা অসুস্থ মানুষের এই পরিচয়টিই কি সবচেয়ে বড়ো পরিচয় নয় যে, তিনি একজন আহত বা অসুস্থ মানুষ? তাঁর তো সবার আগে একটু মানবিক শুশ্রূষা প্রয়োজন।
পড়ে রইল গোটা ঘটনাটি নিয়ে মাননীয় শিক্ষামন্ত্রীর অবস্থান। ব্রাত্য বসুকে একসময় ব্যক্তিগতভাবে চিনতাম। মানুষ হিসেবে তাঁকে চিরকালই উদার, মহৎ হৃদয়ের এবং ভিন্নমতকে সম্মান দিতে জানা একজন নাগরিক হিসেবে দেখে এসেছি। এক্ষেত্রেও ভুলে গেলে চলবে না যে, ছাত্র সংগঠনগুলির ডেপুটেশন কিন্তু তিনি নিয়েছিলেন। প্রশ্ন জাগে এমন কী হল এরপরে যে, তাঁকে ওইভাবে গাড়ি করে ক্যাম্পাস ছাড়তে হল? তাঁর কি আরও একটু ধৈর্য ধরা উচিত ছিল না? উত্তেজিত মব ‘ফেস করা’ নিশ্চয়ই কঠিন কাজ। কিন্তু এই কাজটি তিনি করতে পারবেন এমনটা আমরা আশা করি বলেই তো তিনি মন্ত্রী।
হতে পারে যে, সে সময় হয়তো তাঁর নার্ভ সঠিকভাবে কাজ করেনি। কিন্তু গাড়ি থেকে নেমে এসে, ছাত্র ছাত্রীদের মুখোমুখি হলে নৈতিক জয় তাঁরই হত। কোথাও একটা মনে হয়েছে, তিনি খানিকটা বিহ্বল হয়ে গিয়েছিলেন। তা না হলে অন্তত কমবয়সি চালককে তিনি গাড়ি থামাতে বলতে পারতেন। তবে ঘটনাটির পর ব্রাত্য বসু এসএসকেএম হাসপাতালে গিয়েছেন বলে যাঁরা বলছেন উনি ‘নাটক’ করেছেন, তাঁরাও ঠিক বলছেন কি? অল্প হলেও তিনি আহত হয়েছেন। এরকম ঘটনায় একটা ট্রমাও কাজ করে। তাঁর অবশ্যই হাসপাতালে যাওয়ার অধিকার আছে। ভুলে গেলে চলবে না যে, তিনি কিন্তু হাসপাতাল থেকে বেরিয়ে এসে জানিয়েছেন যে, তিনি শারীরিকভাবে কুশল আছেন। কাজেই নাটক তিনি করেননি। এটিও উল্লেখ যে, মাননীয় শিক্ষামন্ত্রী আহত ছাত্রটির সঙ্গে এবং তার বাবা-মায়ের সঙ্গে কথা বলতে চেয়েছেন। এটি অত্যন্ত সাধু উদ্যোগ। তিনি দ্রুত এই কাজ করলে পরিস্থিতি খানিকটা শান্ত হতে পারে।
তবে নির্বাচনের আগে যাদবপুরকে শান্ত রাখতে গেলে, ছাত্র সংসদের নির্বাচনটি যাদবপুর দ্রুত আয়োজন করতে হবে। ছাত্ররা মাঠে নেমে রাজনীতি করবে (পশ্চিমবঙ্গে এটাই চিরকালের দস্তুর) অথচ কলেজ-ইউনিভার্সিটিতে ছাত্র সংসদের নির্বাচন হবে না বছরের পর বছর – এ হয় না। এইবার যাদবপুর কাণ্ডের মূলে রয়েছে ছাত্র সংসদের নির্বাচন দ্রুত আয়োজন করার দাবি। হকের দাবি। এটি।