প্রতিষ্ঠা লগ্ন থেকে বিগত ৪৬ বছর যাবত বিজেপির রাজনীতির অন্যতম এজেন্ডা অনুপ্রবেশ। নির্বাচন এলে যা নিয়ে পদ্ম শিবিরের নেতারা সদলবলে বিরোধীদের বিরুদ্ধে নেমে পড়েন। পশ্চিমবঙ্গের এবারে নির্বাচনেও বিজেপির অন্যতম ইস্যু বাংলাদেশি অনুপ্রবেশ।
.jpeg.webp)
নরেন্দ্র মোদী
শেষ আপডেট: 12 April 2026 17:51
অনুমতি বা পাসপোর্ট, ভিসা ছাড়া ভারতে আসা সকলকে বিজেপি এক দৃষ্টিতে দেখে না। দলটির জন্মলগ্ন থেকেই এই ব্যাপারে অবস্থান স্পষ্ট। মুসলিমদের তারা অনুপ্রবেশকারী এবং অন্যান্য ধর্মাবলম্বীদের শরণার্থী বিবেচনা করে থাকে। এই ভাবনা থেকেই ২০১৯-এ সিএএ বা সংশোধিত নাগরিকত্ব আইনের জন্ম।
প্রতিষ্ঠা লগ্ন থেকে বিগত ৪৬ বছর যাবত বিজেপির রাজনীতির অন্যতম এজেন্ডা অনুপ্রবেশ। নির্বাচন এলে যা নিয়ে পদ্ম শিবিরের নেতারা সদলবলে বিরোধীদের বিরুদ্ধে নেমে পড়েন। পশ্চিমবঙ্গের এবারে নির্বাচনেও বিজেপির অন্যতম ইস্যু বাংলাদেশি অনুপ্রবেশ।
বিজেপি এবং বর্তমান কেন্দ্রীয় সরকারের অবস্থানকে বিবেচনায় রেখে বলা যায়, বাংলায় সরকার গড়তে পারলে রাজ্যকে অনুপ্রবেশকারী মুক্ত করা হবে বলে অমিত শাহ যে কথা বলছেন তার অর্থ তারা বিপথে আসা মুসলমানদের দেশ ছাড়া করবেন।
অনুপ্রবেশের সমস্যা বোঝাতে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী এবং অমিত শাহ বিগত কয়েক বছর যাবত সীমান্তবর্তী রাজ্য ও জেলাগুলিতে জনবিন্যাসের গুরুতর পরিবর্তনের কথা বলে আসছেন। বিজেপি বলছে, সীমান্ত এলাকায় মুসলমানরা ইতিমধ্যে কিছু এলাকায় হিন্দুদের ছাপিয়ে গিয়েছে এবং অচিরেই বিশাল এলাকায় সংখ্যাগরিষ্ঠ হিন্দুরা সংখ্যালঘুতে পরিণত হবেন।
অনুপ্রবেশের অভিযোগ মিথ্যে নয়। দুটি অসম অর্থনীতির দেশের মধ্যে বিস্তীর্ণ অরক্ষিত সীমান্ত থাকলে একদিকের মানুষ জীবিকার সন্ধানে আর এক দিকে যাবে এটাই স্বাভাবিক। ক্ষুধা, জীবিকা সীমান্ত মানে না। বহু বাংলাদেশি নথিপত্র ছাড়া ভারতে বছরের পর বছর বসবাস করছেন এই তথ্যে কোন ভুল নেই।
অনুপ্রবেশ নিয়ে বিতর্কের কারণ যদিও ভিন্ন। প্রথমত বিজেপি এই সমস্যাকে যতটা বড় করে রাজনৈতিক মঞ্চ থেকে পরিবেশন করে সরকারি তথ্য পরিসংখ্যান-সহ তা প্রমাণে ব্যর্থ। সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলির বক্তব্য, পরিসংখ্যান ইত্যাদি শাসক দলের রাজনৈতিক অবস্থানের সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ নয়।
সীমান্ত রক্ষী বাহিনী এবং সীমান্ত নিরাপত্তার সঙ্গে জড়িত অন্যান্য এজেন্সিগুলির রিপোর্ট থেকে অন্তত এমন আভাস মেলেনি যে অমিত শাহের ভাষায় 'ওরা (বাংলাদেশি অনুপ্রবেশকারীরা)
উইপোকার মতো ভারতে ঢুকে পড়ছে।'
শাহ এই মন্তব্য করেছিলেন শেখ হাসিনা বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী থাকার সময়। লক্ষ্য করা গিয়েছিল বিজেপির অন্য মন্ত্রী ও শীর্ষ নেতারা কেউই শাহের ওই মন্তব্যের সঙ্গে গলা মেলাননি। তাই শুধু নয়, নরেন্দ্র মোদীর বিশ্বস্ত এই নেতা নিজেও এরপর বেশ কয়েক বছর অনুপ্রবেশ নিয়ে তেমন একটা মুখ খুলছিলেন না।
পরিস্থিতির বদল ঘটে শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর। গত বছর ঝাড়খণ্ডের বিধানসভা নির্বাচনে বিজেপির অন্যতম ইস্যু ছিল অনুপ্রবেশ। তাৎপর্যপূর্ণ হল প্রচারে নেতৃত্বে ছিলেন স্বয়ং প্রধানমন্ত্রী এবং স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। এ থেকে বোঝা গিয়েছিল অনুপ্রবেশের সমস্যাটিকে বিজেপি যত না দেশের স্বার্থ বিপন্নতার দৃষ্টিকোণ থেকে দেখে তুলনায় নির্বাচনে লাভ-লোকসানের অঙ্ক অনেক বেশি প্রাধান্য পায়।
ঝাড়খণ্ডে প্রধানমন্ত্রী এবং স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর প্রচেষ্টা সফল হয়নি। পশ্চিমবঙ্গে এবারে সফল হবে কিনা তা নির্বাচনের ফল প্রকাশের আগে বলা মুশকিল।
কিন্তু অনেকেই মনে করছেন প্রধানমন্ত্রী শনিবার এই ইস্যুটিকে ভিন্নমাত্রা দিয়েছেন যা এক কথায় বিস্ময়কর। পশ্চিমবঙ্গে বাঙালি হিন্দুরা ক্রমশ সংখ্যালঘু হয়ে পড়ছে বলে বিজেপি বহু বছর ধরেই প্রচার করে আসে। দলের এই প্রচারে প্রধানমন্ত্রীও বারে বারে গলা মিলিয়েছেন। দিন কয়েক আগে ব্রিগেড প্যারেড ময়দানে সভায় তৃণমূলের বিরুদ্ধে তাঁর মূল অভিযোগ ছিল, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সরকারের জমানায় পশ্চিমবঙ্গে হিন্দু ধর্মাবলম্বীরা বিপন্ন।
আর শনিবার মুর্শিদাবাদে জঙ্গিপুরে সভায় প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, তারা বাঙ্গালিকে সংখ্যালঘু হতে দেবেন না। সংবাদ মাধ্যম এই বক্তব্য প্রচারের পর অনেকেই মনে করছেন নরেন্দ্র মোদী বোঝাতে চেয়েছেন বাংলাভাষী মানে হলো হিন্দু। অর্থাৎ উল্টো করে দেখলে এর অর্থ দাঁড়ায় অন্য ধর্মাবলম্বীরা বাঙালি নন।
মুর্শিদাবাদের জঙ্গিপুরের সভায় শনিবার তিনি বলেছেন, 'এই নির্বাচন বাংলার পরিচয় রক্ষার নির্বাচন। আপনাদের এলাকায় জনসংখ্যা দ্রুত বদলে যাচ্ছে। আপনাদের জমি, রোজগার চলে যাচ্ছে। ..... আমরা পশ্চিমবঙ্গে বাঙ্গালিদের সংখ্যালঘু হতে দেব না।' প্রধানমন্ত্রীর এই কথা শুনে অনেকেই মনে করছেন, নরেন্দ্র মোদী এটাই বলতে চেয়েছেন, পশ্চিমবঙ্গের মুসলিমদের তিনি বাঙালি গণ্য করছেন না। যদিও এ কথাও ঠিক নরেন্দ্র মোদী সবটা খোলসা করেননি। আর সবটা স্পষ্ট না করাটাই রাজনীতির সু অথবা কু-কৌশল।
২০২১-এর মতো পশ্চিমবঙ্গের এবারের বিধানসভা নির্বাচনেও তৃণমূলের প্রধান ইস্যু বাংলা ও বাঙালির বিপন্নতা। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সরকার বহু বছর যাবত, এই ব্যাপারে নরেন্দ্র মোদীর সরকারকে কাঠগড়ায় তুলে আসছে। বিগত কয়েকটি নির্বাচনের মত এবারও তৃণমূল তাদের প্রচারে দলনেত্রী তথা মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে বাংলা ও বাঙালির রক্ষক হিসেবে তুলে ধরছে।
প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যে স্পষ্ট তিনিও বিজেপির হয়ে বাংলা ও বাঙালি কার্ড খেলতে চাইছেন। যদিও এক্ষেত্রেও বিজেপির অতিপরিচিত বিভাজনের রাজনীতিকেই হাতিয়ার করেছেন তিনি। নরেন্দ্র মোদীর শনিবারের বক্তব্যের স্পষ্ট, পশ্চিমবঙ্গবাসীকে তারা শুধু হিন্দু আর মুসলমানের বিভাজন করেই ক্ষান্ত নন মুসলিম সমাজকে অবাঙালি বলে সাব্যস্ত করে তাদের বাদ রেখেই বাংলার ভবিষ্যৎ রচনা করতে চান।
বিজেপির পক্ষে হিন্দু বাঙালির ভোটকে একত্রিত করার এমন মরিয়া প্রচেষ্টা অতীতে দেখা যায়নি। বস্তুত বাংলাভাষীদের নিয়ে এমন অশুভ প্রচেষ্টা শেষবারের মতো হয়েছিল ৫৬ বছর আগে ১৯৭১ এ বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের সময়। যদিও উদ্দেশ্য এবং নিশানা ছিল ভিন্ন। কিন্তু মানসিকতা এবং কৌশল অভিন্ন।
পূর্ব পাকিস্তানের স্বাধীনতাকামী বাঙ্গালিদের লড়াইকে হিন্দু ও হিন্দুস্থানের চক্রান্ত বলে প্রচারের পাশাপাশি পাক বাহিনীর নিপীড়ন নির্যাতনের অন্যতম লক্ষ্য ছিল হিন্দু সম্প্রদায়। বস্তুত সেই কারণেই মুক্তিযুদ্ধের সময় ভারতে পালিয়ে আসা এক কোটি শরণার্থীর বেশিরভাগই ছিলেন হিন্দু, কারও কারও কারও মতে সংখ্যাটা প্রায় ৯০ লাখ।
পূর্ব পাকিস্তানের মাটিতে পাকিস্তানের তৎকালীন প্রেসিডেন্ট আগা মহম্মদ ইয়াহিয়া খান এবং পাকিস্তান পিপলস পার্টির নেতা জুলফিকার আলি ভুট্টোর বাঙালিকে ধর্মের ভিত্তিতে বিভাজনের সেই কৌশল সফল হয়নি। হিন্দু, মুসলিম, বৌদ্ধ, খ্রিস্টান বাঙালি পরিচয়কে আশ্রয় করে মুক্তিযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েছিল।
সেই বঙ্গভূমিতেই সংগঠিত হয়েছিল উপমহাদেশের সবচেয়ে বড় ভাষা আন্দোলন। পাকিস্তানের পশ্চিমা শাসকদের উর্দুকে রাষ্ট্রভাষা হিসেবে বাঙালির উপর চাপিয়ে দেওয়ার বিরুদ্ধে গর্জে উঠেছিল পূর্ব পাকিস্তানের মানুষ। সেই আন্দোলন এমন এক সময় দানা বেঁধে ছিল যার মাত্র এক বছর আগে ধর্মের দ্বিজাতি তত্ত্বের ভিত্তিতে জন্ম নিয়েছিল নতুন রাষ্ট্র পাকিস্তান।
তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের সিংহভাগ জনগণ ছিলেন মুসলিম। ধর্ম পরিচয় বজায় রেখেই তারা মাতৃভাষা বাংলাকে ঊর্ধ্বে তুলে ধরেছিলেন। অগ্রণী ভূমিকা ছিল সংখ্যালঘু হিন্দু সম্প্রদায়েরও। মাতৃভাষা রক্ষায় প্রাণ দিয়েছিল অসংখ্য মানুষ। সেই আন্দোলনের ধারাবাহিকতায় পূর্ব পাকিস্তান প্রথমে স্বাধিকার, শেষ পর্যন্ত স্বাধীনতার আন্দোলনে পা বাড়ায়। জন্ম নেয় স্বাধীন বাংলাদেশ।
ভাষাকে আশ্রয় করে এমন বড় অর্জনের স্বীকৃতি হিসাবেই ২১ ফেব্রুয়ারিকে ইউনেস্কো আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস ঘোষণা করে, বাংলাদেশ যে দিনটিকে একই সঙ্গে শহিদ দিবস এবং বাংলা ভাষা দিবস হিসেবে পালন করে থাকে।
ইতিহাসের প্রতি কী নির্মম পরিহাস, আজ সেই মুসলিম সম্প্রদায়ের বাঙালি পরিচয় নিয়ে টানাহেঁচড়া শুরু হয়েছে পশ্চিমবঙ্গের বিধানসভা নির্বাচনের মুখে। ভোটে শেষ পর্যন্ত যে দলই জয়লাভ করুক না কেন এই নির্বাচন পশ্চিমবঙ্গে ধর্মীয় বিভাজন যে আরও বাড়িয়ে দেবে তাতে কোন সন্দেহ নেই। বিগত কয়েকটি নির্বাচনের মত এবারের ভোটেও মূল প্রতিদ্বন্দ্বী কেন্দ্র ও রাজ্যের শাসক দল। প্রতিষ্ঠান বিরোধিতার বিপদ থেকে তারা কোনও পক্ষই মুক্ত নয়। দু পক্ষই তাই ধর্মকে আশ্রয় করে যাবতীয় ব্যর্থতা, দুর্নীতি, অপশাসন ইত্যাদিকে আড়াল করে নির্বাচনী বৈতরণী পেরোতে চাইছে।
অনেকেরই হয়তো মনে থাকবে ২০২৬ কাজী নজরুল ইসলামের কাণ্ডারী হুশিয়ার কবিতাটির শতবর্ষ। ধর্মীয় সংঘাতে দীর্ণ অবিভক্ত ভারতে স্বাধীনতার লড়াইকে সুসংহত করতে সম্প্রীতিকে আশ্রয় করে কবি লিখেছিলেন সেই অমর লাইনগুলি, 'হিন্দু না ওরা মুসলিম? ওই জিজ্ঞাসে কোন জন?
কান্ডারী! বল, ডুবিছে মানুষ, সন্তান মোর মার।'
শতবর্ষ আগে লেখা পুরো কবিতাটি আজ গলা ছেড়ে পাঠ করা সময়ের দাবি ও দায়। কান্ডারী হুঁশিয়ারি।