মহাত্মা ফুলে ছিলেন একজন মহান সংস্কারক। তিনি সমাজ কল্যাণে অঙ্গীকারবদ্ধ ছিলেন। বিভিন্ন বিষয়ে তাঁর অনুসন্ধিৎসা এবং সাহস ছিল নজর কাড়া। যে আন্দোলনকে তিনি নেতৃত্ব দিয়েছেন এবং যে প্রতিষ্ঠানগুলি তিনি গড়ে তুলেছেন সেগুলি সবই চিরস্মরণীয় হয়ে রয়েছে। আমাদের সভ্যতার চলার পথে যে আশা তিনি জুগিয়েছেন, দেশের কোটি কোটি মানুষের মনে যে সাহস ও আস্থা তিনি সঞ্চারিত করেছেন, তা ভুলবার নয়।

নরেন্দ্র মোদী
শেষ আপডেট: 11 April 2026 19:22
আজ ১১ এপ্রিল দিনটি আমাদের সকলের কাছে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আজকের এই দিনে ভারতে মহান এক সমাজ সংস্কারক মহাত্মা জ্যোতিরাও ফুলে জন্মগ্রহণ করেছিলেন। তিনি প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে সকলকে পথ দেখিয়েছেন। এবছর তাঁর জন্মের দ্বিশতবার্ষিকী উদযাপন শুরু হচ্ছে। সেই অর্থে এই বছরটির বিশেষ একটি তাৎপর্য রয়েছে।
মহাত্মা ফুলে ছিলেন একজন মহান সংস্কারক। তিনি সমাজ কল্যাণে অঙ্গীকারবদ্ধ ছিলেন। বিভিন্ন বিষয়ে তাঁর অনুসন্ধিৎসা এবং সাহস ছিল নজর কাড়া। যে আন্দোলনকে তিনি নেতৃত্ব দিয়েছেন এবং যে প্রতিষ্ঠানগুলি তিনি গড়ে তুলেছেন সেগুলি সবই চিরস্মরণীয় হয়ে রয়েছে। আমাদের সভ্যতার চলার পথে যে আশা তিনি জুগিয়েছেন, দেশের কোটি কোটি মানুষের মনে যে সাহস ও আস্থা তিনি সঞ্চারিত করেছেন, তা ভুলবার নয়।
১৮২৭ সালে পবিত্র মহারাষ্ট্র রাজ্যে মহাত্মা ফুলে জন্মগ্রহণ করেন। শৈশবে যে সমস্যা সঙ্কুল জীবন তিনি অতিবাহিত করেছেন তা তাঁর শিক্ষালাভের ফলে অন্তরায় হয়নি। যেসব সমস্যার তিনি সম্মুখীন হয়েছেন, কঠোর পরিশ্রম করে সেগুলির সমাধান করেছেন। ছাত্র জীবনে জ্যোতিরাও অত্যন্ত কৌতূহলী ছিলেন। তিনি খুব পড়তে ভালোবাসতেন। যেসব বই শৈশবে ছাত্র-ছাত্রীদের কাছে বোধগম্য ছিল না, তিনি সেগুলিও পড়তেন। পরবর্তীতে তিনি বলেছেন, “যত বেশি প্রশ্ন মনের মধ্যে আসবে, তত বেশি জানতে পারবেন”। তাঁর এই জানার কৌতূহলের কারণে শৈশব থেকেই তিনি উপকৃত হয়েছেন।
মহাত্মা ফুলের জীবন শিক্ষা জগতের সঙ্গে আবর্তিত হয়েছে। তিনি বলতেন, জ্ঞান লাভ করার পর সেটি সকলের মধ্যে ভাগ করে নিতে হয়। যে সময়ে বহু মানুষ শিক্ষালাভের আনন্দ থেকে বঞ্চিত হতেন, সেই সময় তিনি প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষালাভের জন্য মেয়েদের স্কুল খুলেছিলেন। তিনি বলতেন, 'যে কোন শিশুর জীবনে তাঁর মায়ের থেকে পাওয়া জ্ঞান অত্যন্ত মূল্যবান। তাই যদি স্কুল খুলতেই হয় তাহলে মেয়েদের জন্য প্রথমে স্কুল খোলা উচিত।' তিনি এমন এক সমাজ গড়ার লক্ষ্যে কাজ করেছেন যেখানে শ্রেণীকক্ষগুলি ন্যায় ও সাম্যকে নিশ্চিত করেছে।
শিক্ষার বিষয়ে তাঁর ভাবনা-চিন্তা আমাদের অনুপ্রাণিত করে। গত দশকে আমরা গবেষণা ও উদ্ভাবনের বিষয়ে গুরুত্ব আরোপ করেছি। এই উদ্যোগ দেশের যুব সম্প্রদায়ের জন্য ইতিবাচক ছিল। যুব সম্প্রদায় যাতে বেশি করে প্রশ্ন করার সাহস পায় এবং তারা যাতে বিভিন্ন উদ্ভাবনী প্রক্রিয়ায় সামিল হয় তার জন্য একটি ব্যবস্থাপনা গড়ে তোলার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। জ্ঞানচর্চা, দক্ষতা বিকাশ এবং নতুন নতুন সুযোগ তৈরি করে দেওয়ার জন্য বিনিয়োগ করার ফলে ভারত তার যুব সম্প্রদায়কে জাতীয় উন্নয়নের চালিকা শক্তি হিসেবে গড়ে তুলেছে। আজ যুব সম্প্রদায় বিভিন্ন সমস্যার সমাধানে এগিয়ে এসেছে।
মহাত্মা ফুলের কৃষি, স্বাস্থ্য পরিষেবা এবং গ্রামোন্নয়নের মতো ক্ষেত্রে অগাধ পান্ডিত্য ছিল। তিনি সবসময় বলতেন, কৃষক ও শ্রমিকদের প্রতি অবিচার করা হয় বলেই আমাদের সমাজ দুর্বল হয়ে গিয়েছে। তিনি দেখেছেন কীভাবে দৈনন্দীন জীবনে সামাজিক অসাম্য, কৃষিকাজ অথবা গ্রামীণ জীবনে নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে। তাই তিনি দরিদ্র এবং পিছিয়ে পড়া শ্রেণির মানুষদের মর্যাদাকে নিশ্চিত করার জন্য সচেষ্ট ছিলেন। পাশাপাশি সমাজে যাতে সম্প্রীতি বজায় থাকে, তারজন্যও সম্ভাব্য সবরকমের ব্যবস্থা নিতে তিনি সক্রিয় ছিলেন।
মহাত্মা ফুলে মনে করতেন, সমাজে সকলের জন্য সমান অধিকার না থাকলে প্রকৃত স্বাধীনতা অর্জন করা যায় না। তাই এমন কিছু প্রতিষ্ঠান তিনি গড়ে তুলেছিলেন, যেগুলি সামাজিক ন্যায়কে প্রতিষ্ঠা করে। ‘সত্যশোধক সমাজ’-এর মাধ্যমে আধুনিক ভারতে এক গুরুত্বপূর্ণ সামাজিক সংস্কারমূলক আন্দোলন গড়ে তোলেন তিনি। সমাজ সংস্কার, সামাজিক বিভিন্ন পরিষেবা প্রদান এবং সকলের মর্যাদা নিশ্চিত করাই এর মূল লক্ষ্য ছিল। মহিলা, যুবক-যুবতী এবং গ্রামাঞ্চলে যারা বসবাস করেন তাদের সোচ্চার কন্ঠ হয়ে ওঠে এই আন্দোলন। মহাত্মা ফুলে দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করতেন সকলের প্রতি সম্মান প্রদর্শন, সকলের জন্য ন্যায় নিশ্চিত করা এবং ঐক্যবদ্ধভাবে উন্নতির পথে এগিয়ে চলার মধ্য দিয়ে সমাজ শক্তিশালী হয়।
ব্যক্তিগত জীবনে তিনি সকলকে সাহসী হওয়ার শিক্ষা দিতেন। মানুষের জন্য প্রতিনিয়ত কাজ করার কারণে যে পরিশ্রম তিনি করতেন তার ফলে তার স্বাস্থ্যের অবনতি হয়েছে। হৃদরোগে আক্রান্ত হওয়া সত্ত্বেও তিনি সংকল্পচ্যুত হননি। লক্ষ্যপূরণে তিনি ছিলেন অবিচল। হ্যাঁ, তিনি পরীক্ষা দিয়েছেন, সমাজের প্রতি তাঁর দায়বদ্ধতা সেই সময়ে কাঙ্খিত ফল নিয়ে আসেনি ঠিকই, কিন্তু বর্তমানে লক্ষ লক্ষ মানুষ তাঁর সেই সংগ্রামে উদ্বুদ্ধ হয়েছেন।
মহাত্মা ফুলেকে নিয়ে আমরা যখন আলোচনা করি, তখন সাবিত্রীবাঈ ফুলের কথা উল্লেখ না করলে সেই আলোচনা সম্পূর্ণ হয় না। আমাদের দেশের অন্যতম সংস্কারক সাবিত্রীবাঈ শিক্ষিকা হিসেবে পথ দেখিয়েছেন। নারী শিক্ষাকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া এবং মেয়েদের স্বপ্ন দেখানোর ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন তিনি। মহাত্মা ফুলের প্রয়াণের পর সাবিত্রীবাঈ তাঁর অসমাপ্ত কাজ সম্পূর্ণ করার জন্য এগিয়ে আসেন। প্লেগ মহামারির সময় ১৮৯৭ সালে তিনি রোগীদের একনিষ্ঠভাবে সেবা করেন। এরফল হয়েছিল মারত্মক। প্লেগে সংক্রমিত হয়ে তিনিও প্রাণ হারান।
আমাদের দেশ মহান ব্যক্তিত্বদের মাধ্যমে বিভিন্ন সময়ে উপকৃত হয়েছে। এইসব ব্যক্তিত্বদের ভাবনা-চিন্তা এবং সমাজের জন্য নিজেকে উৎসর্গ করার মানসিকতায় দেশ লাভবান হয়েছে। অন্য কেউ এসে অবস্থার পরিবর্তন ঘটাবে, এই ভাবনায় তারা বসে থাকতেন না। তারা নিজেরাই সেই পরিবর্তনের কান্ডারী হয়ে উঠতেন। হাজার হাজার বছর ধরে আমাদের দেশের সামাজিক ন্যায় নিশ্চিত করতে সমাজ থেকেই তারা উঠে এসেছেন। এর জন্য তারা বহু কষ্ট সহ্য করেছেন, কিন্তু তাঁরা মাথা নত করেননি। মহাত্মা জ্যোতিরাও ফুলেও এরকমই এক ব্যক্তিত্ব ছিলেন।
এই প্রসঙ্গে আমার ২০২২ সালে পুনে সফরের কথা মনে পড়ছে। সেবছর পুনে শহরে মহাত্মা ফুলের সুবৃহৎ প্রতিকৃতিতে আমি শ্রদ্ধা নিবেদন করেছি। এবছর তাঁর জন্মের দ্বিশতবার্ষিকী উদযাপন শুরু হচ্ছে। এই আবহে শিক্ষা সহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে আমরা যে সংকল্প নিয়েছি সেগুলির বাস্তবায়ন করতে হবে। অসাম্যের বিরুদ্ধে আমাদের সোচ্চার হতে হবে। সমাজের উন্নতি তার ভেতর থেকেই করা সম্ভব, সেই আস্থার পুনর্নবীকরণ করতে হবে। উদ্দেশ্য যখন মহৎ হয়, তখন ভারতীয় সমাজ যে অসম্ভবকে সম্ভব করতে পারে, মহাত্মা ফুলের জীবন থেকে তা স্পষ্ট। একারণেই তিনি লক্ষ লক্ষ মানুষের শক্তির উৎস, তার বাণী আজও আশার সঞ্চার করে। আর তাই প্রায় ২০০ বছর পরেও মহাত্মা ফুলে অতীতের মতোই ভবিষ্যতেও ভারতকে পথ দেখাবেন।
লেখক ভারতের প্রধানমন্ত্রী। মতামত ব্যক্তিগত।