অনির্বাণের (Anirban Bhattacharyay) দলের (Hooliganism) নতুন গান নিয়ে তোলপাড় সমাজমাধ্যম (Social Media)। বাংলার রাজনীতিতে গান ঘিরে ফের তরজা, সমালোচনা আর নতুন আলোচনার জন্ম।

অনির্বাণের রাজনৈতিক গান।
শেষ আপডেট: 3 September 2025 12:07
অনির্বাণের দলের গান নিয়ে তোলপাড় সমাজমাধ্যম। বহুদিন পর বাংলা গান নিয়ে রাজনৈতিক তরজা শুরু হয়েছে। গানটি শুনে আমিও প্রভূত মজা পেয়েছি।সত্যি বলতে কী, গানটি আমাকে ভাবিয়েছেও। অনেকদিন পর একটি বাংলা গান সাধারণ মানুষের জীবনে, তাদের রাজনৈতিক তরজায় ঢুকে পড়েছে। সাধারণ মানুষ কথা বলছে একটি সদ্য জন্ম নেওয়া বাংলা গান নিয়ে। মন্দ কী?
গানটি শুনে মজা পেয়েছি সত্যি। কিন্তু, গানটি যখন পুরোটা শুনিনি তখন একরকম মনে হয়েছিল। এই গানটির এবং অনির্বাণের তুমুল সমালোচনাগুলিই ঠিক মনে হচ্ছিল। পরে বুঝলাম, ভুল হয়ে গেছে। গানটিকে স্বাগত জানানোই উচিত।
যে-আঙ্গিকে গানটি পরিবেশিত হয়েছে সেটি নতুন কিছু না হলেও, অবশ্যই মনোযোগ দাবি করে। মানতেই হবে কিছু একটা তো গানটির মধ্যে আছে, যা এত দ্রুত গানটিকে ভাইরাল করে তুলল। তাহলে গানটি কি একটি কালজয়ী সৃষ্টি? সে কথা একেবারেই বলব না। এর চেয়ে অনেক ভাল গান অনির্বাণের দল ইতিমধ্যেই বানিয়েছে এবং ভবিষ্যতেও বানাবে এই ভরসা আছে।
বিতর্ক বেঁধেছে গানটির কথা নিয়ে। গানটির লিরিক কি দুর্দান্ত? সেকথাও বলব না। গানটির লিরিকে দুর্বলতা তো আছেই। যেমন, অন্ত্যমিল অতি দুর্বল। কিন্তু, একটা শক্তিও আছে গানটার। তিনটি রাজনৈতিক দলের তিন ব্যক্তিকে 'ঘোষ' শিরোনাম দিয়ে বেঁধে নিয়ে, তিনটি দলের মূল যে-ত্রুটি, সেগুলিকে কিন্তু চিহ্নিত করেছে গানটি। ব্যক্তি এখানে প্রতীক মাত্র। ব্যক্তিদের সূত্র ধরেই প্রসঙ্গ এসেছে প্রোমোটারি, গরুর দুধে সোনা পাওয়া আর দামি গাড়ির। ইঙ্গিতে খোঁচা দেওয়া হয়েছে সিন্ডিকেট রাজ, অপবিজ্ঞানের পুজো আর শ্রেণিচ্যুতির।
মজার কথা হল, তিন ঘোষই কিন্তু গানটিকে বেশ সহজ ভাবেই নিয়েছেন। কুণাল ঘোষ তো ব্যাখ্যাও দিয়েছেন কেন গানটি তাঁর ভাল লেগেছে।
তবে গানটি শুনে রেগে গিয়েছেন মূলত বামপন্থীদের একাংশই। আরও সোজা কথায় সিপিআই(এম)-এর সমর্থকরা। সিপিআই(এম)-এর সমর্থক যে-সমস্ত বন্ধুরা রেগে যাচ্ছেন, তাঁরা কি অস্বীকার করতে পারেন যে, দলটার শ্রেণি চরিত্রে একটা মূলগত বদল ঘটেছে আর সেইখানেই ঘা দিয়েছে অনির্বাণের গানটি? মাঠে-ময়দানে যতখানি উপস্থিতি সিপিআই(এম)-এর নেতাদের তার চেয়ে বেশি উপস্থিতি পার্টি অফিস, টিভি চ্যানেল আর সমাজমাধ্যমে-- এ কথা কি খুব বড় মিথ্যে? সত্যি কথা বলতে কী, দলটির সাম্প্রতিক কাজকর্ম থেকেও বোঝা যাচ্ছে যে, এই সমস্ত ত্রুটি কাটিয়ে প্রান্তিক মানুষের কাছে পৌঁছানোর আপ্রাণ চেষ্টা করছে দলটি।অর্থাৎ দলটি নিজেও বুঝতে পারছে ভুল হচ্ছে ঠিক কোথায়।তাহলে অনির্বাণের বলা কথায় দলটির সমর্থকদের এতখানি অস্বস্তি হচ্ছে কেন?
অনির্বাণ সুবিধাবাদী কিনা, আরজি কর আন্দোলনের সময় চুপ করে ছিলেন কিনা, সেই বিচারে এই গানটির প্রেক্ষিতে যাব না।অনেকেই বলছেন যে, নিজের পেটে লাথ পড়ার পরেই অনির্বাণ বিপ্লবী হয়ে উঠেছেন। হতে পারে। কিন্তু, কী কারণে অনির্বাণ এইরকম গান বেঁধেছেন তা দিয়ে কি এই শিল্পবস্তুটির বিচার হবে? হবে না। স্রষ্টার ব্যক্তিজীবনের সঙ্গে তাঁর সৃষ্টিকে জড়িয়ে বিচার করার কোনও পদ্ধতিই শেষ পর্যন্ত টিকে থাকেনি। এক্ষেত্রেও ভবিষ্যতে থাকবে না।
গানটি সম্পর্কে আরও একটি কথা বলা জরুরি। পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে মূল যে তিনটি দল, সেই তিনটি দলেরই সমালোচনা করে গানটি বলতে চাইছে শুকনো পাতা ঝরুক, ঝরে যাক। সত্যি কথা বলতে কী, এই দিক থেকে ভাবলে আরজি কর আন্দোলনের সময় অনির্বাণের নিষ্ক্রিয় অবস্থানের সঙ্গে এই গানটির একটি যোগাযোগ কিন্তু আছে। রাজনৈতিক ভাবে প্রতিষ্ঠিত পন্থাগুলির একটিতেও তিনি বিশ্বাস রাখতে চাইছেন না। চাইছেন নতুন কিছুর আবাহন। একটু খোঁজ নিলেই দেখা যাবে যে, এই অবস্থানে বিশ্বাস রাখা মানুষের সংখ্যা আমাদের রাজ্যে নেহাত কম নয়।
সবচেয়ে বড় কথা, বাংলা গানের জগতে বহুদিন পর সরাসরি রাজনীতির প্রবেশ ঘটল বিদ্রুপকে সঙ্গী করে। বাংলা গানের জগতে এই ধরনের গানের দীর্ঘ ট্র্যাডিশন রয়েছে। এই ট্র্যাডিশনে নতুন সংযোজন ঘটল এই গানটির জন্মে। তাই এই প্রচেষ্টার বিরোধিতা না করে, একে সর্বান্তকরণের স্বাগত জানানো উচিত। অনেকদিন পরে এই গান একটা ধাক্কা দিয়েছে শিক্ষিত মধ্যবিত্ত বাঙালিকে।এই ধাক্কা জরুরি ছিল।