
শেষ আপডেট: 14 December 2020 10:46
সৌদি আরব এমন একটা দেশ, যেখানে 'নারী স্বাধীনতা' শব্দটাই সোনার পাথরবাটি। 'কঠোর রক্ষণশীল রাষ্ট্র' হিসাবে পরিচিত সৌদিতে কয়েক বছর আগেও ভোটদানের অধিকারটুকুও ছিল না মহিলাদের। ট্রেকিং তো দূরস্থান, বাড়ির বাইরে পা রাখার আগেও দশবার ভাবতে হত সৌদি নারীদের। বোরখা-হিজাব ট্যাক্সের কথা তো বহু আলোচিত। এখনও অভিভাবকত্ব আইন অনুযায়ী বাবার অনুমতি ছাড়া বাড়ির বাইরে যেতেও পারেন না সে দেশের মেয়েরা। আদেশ না মানলে হতে পারে জেল, জরিমানা, মৃত্যুদণ্ডও। এইরকম একটি দেশ থেকে এভারেস্টের বুকে পা রাখা নেহাত মুখের কথা নয়! আর ঠিক সেই কাজটাই করে দেখিয়েছিলেন রাহা মোহাররক।
২০১২ সালে যখন এভারেস্ট অভিযানের স্বপ্ন দেখছেন রাহা, কেমন ছিল তখনকার সৌদি তরুণীদের জীবন! ভোটাধিকার নেই, গাড়ি-চালানো বা খেলাধুলায় অংশ নেওয়ার সুযোগ নেই। অধিকার নেই নিজের জীবন নিয়ে কোনও রকম সিদ্ধান্ত নেওয়ারও। পদে পদে পারিবারিক নির্ভরশীলতা আর অনুগৃহীতের জীবন।
অবশ্য প্রথম থেকেই আর পাঁচটা সৌদি মেয়ের মতো ছিলেন না রাহা মোহাররক। ছোটবেলা থেকেই তিনি বেড়ে উঠেছেন তুলনায় অনেক সহনীয়, খোলামেলা পরিবেশে। সৌদি আরবের জেদ্দায় জন্ম রাহার। বাবা চাকরি করতেন সৌদি এয়ারলাইন্সে, ছোটোবেলার স্মৃতি জুড়ে রয়েছে ডানা মেলে উড়ে যাওয়া উড়োজাহাজের ছবি। এক কথায় বলতে গেলে, চলতি হাওয়ার বিরুদ্ধে ওড়ার স্বপ্ন আর জেদ নিয়েই বেড়ে ওঠা তাঁর।
শারজা-র আমেরিকান ইউনিভার্সিটি থেকে ভিজ্যুয়াল কমিউনিকেশনে গ্রাজুয়েশন করার পর দুবাই থেকে এমবিএ, মোটা মাইনের চাকরি, সম্মান-- এমন একটা সর্বোত সুখী জীবনের কল্পনাই তো করে মেয়েরা। কিন্তু ছকে বাঁধা আর পাঁচটা মেয়ে আর রাহা তো এক নয়।তাই বাবা মা যখন মেয়ের বিয়ে দিয়ে তার সংসার গোছানোর প্ল্যান শুরু করেন, তখন রাহার বাবা-মার সামনে দেখা দিয়েছিল অন্য এক চিন্তা। মেয়ে জেদ ধরেছে বন্ধুদের সঙ্গে সেও যাবে আফ্রিকায়, কিলিমাঞ্জারো পাহাড়ে ট্রেকিং করতে। এসব ব্যাপারে স্বভাবতই একেবারেই মত ছিল না রাহার বাবা-মায়ের।
পাহাড়ে ওঠা, সামিট জয়-- এসব কী মেয়েদের কাজ! আগে কোনও সৌদি তরুণীকে দেখেছ এমন অদ্ভুত আচরণ করতে! --এসব কথাই হয়তো সেদিন বোঝাতে চেয়েছিলেন রাহার বাবা-মা। কিন্তু পারেননি। ভাগ্যিস পারেননি। মেয়ের জেদের কাছে হার মেনেছিলেন সেদিন রাহার অভিভাবকেরা। আর সেখান থেকেই ইতিহাসের শুরু।
১৮ তারিখ শনিবার সকালে রাহা মোহাররক যখন নেপালের দিক থেকে পা রাখলেন ৮,৮৫০ মিটার উচ্চতার মাউন্ট এভারেস্টের চুড়োয়, তখন তাঁর সঙ্গে ছিলেন ৩৫ জন বিদেশি পর্বতারোহী এবং ২৯ জন নেপালি শেরপা। তার আগের সারারাত তাঁকে ক্রমাগত বরফের চাঁই ভেঙে পথ চলতে হয়েছে। পদে পদে মৃত্যুভয়। যে কোনও মুহূর্তে আবহাওয়া প্রতিকূল হতে পারে। যে কোনও মুহূর্তে পিছল বরফে বেসামাল হতে পারে পা। রাহা জানতেন এ পথে মুহূর্তের ভুল মানেই মৃত্যু। কিন্তু সেদিন সেই ২৫ বছরের মেয়েটার অদম্য জেদ আর সাহসের কাছে মাথা নত করেছিল পৃথিবীর উচ্চতম পর্বতশৃঙ্গও।
এর পরে ইতিহাস। রাহা মোহাররকই সেই প্রথম সৌদি তরুণী এবং কনিষ্ঠতম আরব তরুণী, যিনি জয় করেছিলেন মাউন্ট এভারেস্ট।
এই মুহূর্তে 'বারবেরি' বা 'অ্যাডিডাস'-এর মতো বিশ্বের বেশ কিছু জনপ্রিয় ব্র্যান্ডের বিজ্ঞাপন-মুখ রাহা। বিখ্যাত সুইস ঘড়ির বিজ্ঞাপন করা প্রথম আরব মহিলাও। পাশাপাশি বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে ঘুরে অজস্রবার বক্তব্য রেখেছেন নিজের জীবন নিয়ে, লড়াই নিয়ে। দেখিয়ে দিয়েছেন, তেমন জেদ আর অধ্যবসায় থাকলে পুরুষতান্ত্রিক কাঠামোর বাধা অতিক্রম করেও নিজের স্বপ্নকে সত্যি করা যায়। তাঁকে সামনে রেখেই আজ আকাশ ছোঁয়ার স্বপ্ন দেখছেন আরব দেশের নবীন প্রজন্ম, এমনকি আমরাও। আজ এই তৃতীয় বিশ্বের নারীস্বাধীনতার অন্যতম মুখ রাহা মোহাররক।