
শেষ আপডেট: 30 November 2018 13:24
প্রচেত গুপ্ত
উনিশ বছরের জেল জীবন শিবনাথের তেজ একেবারে শেষ করে দিয়েছে। ঠান্ডা হয়ে গেছে, গুটিয়ে গেছে লোকটা। মধুমালতীর বয়স বেড়েছে। সে-ও পরিণত হয়েছে। নরম হয়েছে। বাবার জন্য তার মায়া হয়। এমনও হতে পারে, সত্যিই হয়তো সে দিন এই লোকটা মাকে খুন করেনি। কিন্তু তার আগে তো বহু বার খুন করেছে। ওই নৃশংস অত্যাচারে যে কোনও সময়েই মা মারা যেতে পারত। শুধু একটা ভুল সন্দেহে। মা তাকে এক বার বলেওছিল কথাটা।
‘মা, তোমাকে এত মারে কেন বাবা ?’
মা চুপ করে থেকে বলেছিল, ‘একটা মিথ্যে সন্দেহে মারে। এর বেশি এখন কিছু বলব না। বড় হলে জেনে নিও।’
মধুমালতী শিবনাথকে কখনও তার গানের কথা বলে না। জেলে থাকা মানুষটা যদি এই মিথ্যেটুকুতে শান্তি পায় পাক।
মধুমালতী আবার চুপ করে থাকে। শিবনাথ দীর্ঘশ্বাস ফেলে খানিকটা আনমনে বলে, ‘আর কিছু নয়, শুধু একটা কথা মনে পড়লে বড় খারাপ লাগে রে মধুমালতী। মরার সময়ে তোর মা খুব ছটফট করছিল। কষ্ট পেয়েছিল। বাঁচতে চাইছিল।’
মধু চাপা গলায় ধমক দিয়ে বলে, ‘উফ্ বাবা! তুমি থামবে? উনিশ বছর আগে যা ঘটে গেছে...তুমিও তো কষ্ট পাচ্ছো। পাচ্ছো না?’
শিবনাথ মলিন হেসে বলে, ‘বেঁচে থাকার জন্য ছটফটানি বড় কষ্ট। জেল খাটা তার কাছে কিছু নয়।’
মধু বলল, ‘ঠিক আছে তোমাকে আর ও সব ভাবতে হবে না।’
‘আমি কি ইচ্ছে করে ভাবি? ভাবনা চলে আসে।’
মধুমালতী বলে, ‘আসুক, তুমি পাত্তা দেবে না। নিয়মিত পুজো করছো তো ?’
শিবনাথ বলে, ‘কখনও সন্ধ্যেবেলা গিয়ে মন্দিরে বসি, কখনও বুঝি ওতে আর যা-ই হোক, পাপ যাবে না। নিজের হাতে না মারি তোর মাকে আমি অত্যাচার তো কম করিনি।’
এই সময়ে জেলের বেল বাজে। ইন্টারভিউয়ের সময় শেষ হয়।
শিবনাথ বলে, ‘মধুমালতী, মা আমার, ভাল থাকিস। জানি না আর দেখা হবে কি না।’
মধু বলে, ‘রোজ এক কথা বলবে না। কেন দেখা হবে না?’
‘আচ্ছা আর বলব না।’
মধুমালতী জেলখানা চত্বর থেকে বেরিয়ে আসে। খুব মন খারাপ হয় তার। ইচ্ছে করে ডাক ছেড়ে কাঁদতে। সবাই দেখুক, সবাই জানুক, এত বড় একটা মেয়েটা রাস্তায় ছেলেমানুষের মতো কাঁদছে।
যদি কেউ এসে তাকে জিজ্ঞেস করে, ‘তুমি কাঁদছো কেন?’
ও বলবে, ‘জানেন, ওই লোকটা হয়তো সত্যি মাকে খুন করেনি।’
‘সে কী! তুমি তা হলে মিথ্যে সাক্ষী দিয়েছিলে?’
‘না, আমি যা দেখেছিলাম তাই বলেছিলাম।’
‘মেয়ে হয়ে তুমি এই কাজ কী করে করলে মধুমালতী?’
‘ওই লোকটা আমাকে তার মেয়ে বলে বিশ্বাস করে না।’
মধুমালতী জানে, এই প্রশ্ন তাকে কেউ করবে না। ফলে কোনও জবাবদিহিরও প্রশ্ন নেই। না কেঁদে নিজেকে সামলে হেঁটে যায় সে। ক্নান্ত, বিধ্বস্ত। নিজেকে অপরাধী মনে হয়।
যাই হোক, এই কাহিনিতে আমরা এই মেয়ের জন্য মধু এবং মধুমালতী, দু'টি নামই ব্যবহার করব।
আবার স্টেজে ফিরে যাওয়া যাক।
গুলির চাপা আওয়াজের সঙ্গে সঙ্গে মধুর গান থেমে গেল। হাতের মাইক্রোফোন পড়ে গেল। দু'হাতে পেট চেপে, হাঁটু মুড়ে, বসে পড়ে সে। রক্তে ভেসে যাওয়ার আগের মুহূর্তে গায়ের বেগুনি ঝলমলে কোট সরে যায়। সাদা টপ এলোমেলো হয়ে উঠে আসে ওপরে। বেরিয়ে পড়ে তার নগ্ন, মেদহীন পেট। ঘুরে ঘুরে আসা লাল, নীল, সবুজ আলো চলকে যেতে থাকে পেটের ওপর দিয়ে। নাভিতে লাগানো রুপোর রিং ঝলসে ওঠে। সবাই সেই রিঙ দেখতে পায় না, কেউ কেউ আভাস পায়।
স্টেজের সামনে বসে থাকা পাবলিকের তো বটেই, এমনকী মধুর সঙ্গে যারা বাজনা বাজাচ্ছিল, হতভম্ব ভাব কাটতে তাদেরও খানিক সময় লেগে গেল। হচ্ছেটা কী ? এটা কি গানের ভিতরে নতুন কোনও ভঙ্গি? দর্শকদের চমক দিতে গায়িকার নাটক? হতে পারে। আজকাল পাবলিক মজাতে অনেক কিছু করতে হয়। সিঙ্গার বেশি, ফাংশন কম। পাবলিক মজাতে না পারলে প্রোগ্রাম জুটবে কেন?
ভুল ভাঙে দ্রুত। ছেলেরা বাজনা থামিয়ে ছুটে আসে। সবার আগে আসে কঙ্কন। সে মধুর সঙ্গে লিড গিটার বাজায়। কঙ্কন হাঁটু মুড়ে বসে জাপটে ধরে মধুকে। বাকিরাও তত ক্ষণে পৌঁছে যায়। মধু কাত হয়ে পড়ে তাদের হাতের ওপর। টাইট জিনস পরা পা দু'টো ছটফটিয়ে ওঠে। চৌত্রিশ বছরের জীবন কিছুই নয়, তার পরেও এক সুন্দরীকে ছটফটিয়ে সেই জীবনকে বিদায় দিতে হচ্ছে। দৃশ্য হিসেবে যতটা না ভয়ংকর, তার থেকে বেশি মর্মান্তিক। আজ বলাকা আসেনি। তার জরুরি কাজ পড়ে গিয়েছিল। শেষ মুহূর্তে সে মধুমালতীতে জানায়। দুপুরের কিছু পরে।
‘আজ আমি তোমার সঙ্গে যেতে পারব না মধুদি।’
‘ঠিক আছে।’
‘তোমার অসুবিধে হবে না তো।’
‘ধুর, কীসের অসুবিধে! কলকাতা বা কলকাতার কাছাকাছি হলে তো তোকে অনেক সময়ে নিই না। বাজনার ছেলেরা তো সব আছে।’
বলাকা বলে, ‘আমি কাল পরশু আসব না।’
মধু বলে, ‘মনে আছে।’
বলাকা আজ থাকলেই বা কী করতে পারত? গুলি তো এসেছে স্টেজের সামনে থেকে। বলাকা তো থাকে পিছনে। সিঙ্গার ওঠা-নামার সময়ে বা প্রোগ্রাম চলার সময়ে হঠাৎ করে যাতে কেউ স্টেজে উঠতে না পারে, সেটা দেখে। একেবারে আটকায় এমন নয়। গানের রিকোয়েস্ট নিয়ে এলে কিছু বলে না।
কে যেন ভয়ার্ত গলায় চিৎকার করে ওঠে।
‘রক্ত, রক্ত...মার্ডার..মার্ডার...!’
মধুমালতী এত ক্ষণ যাতে গান করছিল, সেই কর্ডলেস মাইক্রোফোনটি চালু অবস্থায় পাশে পড়েছিল। অবহেলায় স্টেজে গড়াচ্ছিলই বলা যায়। ভয়ার্ত চিৎকার সে ধরে ফেলে এবং অনেক দূর পর্যন্ত ছড়িয়ে দেয় সাউণ্ড বক্স, চোঙা মাইকে।
‘মার্ডার..মার্ডার..মার্ডার।’
বসন্ত সাহা রোজই ভাবেন, আজ তিনি স্ত্রী ছন্দা এবং কন্যা মৌনীর সঙ্গে ডিনার করবেন। খেতে খেতে মেয়ের স্কুলের গল্প শুনবেন। কোন বন্ধু ম্যাথস ক্লাসে লুকিয়ে চিপস খেতে গিয়ে ধরা পড়েছে, সেই চিপস বাজেয়াপ্ত করা হয়েছে, কোন টিচার হাই হিল পড়ে প্র্যাকটিক্যাল রুমে হোঁচট খেয়ে বলেছেন, ‘গার্লস, ডোন্ট লাফ। আমি তোমাদের ইনারসিয়া অব মোশনের একটা ডেমো দিলাম।’ ---এই সব গল্প শুনে খুবই হাসবেন। আর ছন্দা টুকটাক সংসারের কথা বলবে। সংসারে তার পুলিশ স্বামীর কোনও নজর নেই বলে দুঃখ করবে। বলবে, পরের জন্মে সে এক জন অপরাধী হয়ে জন্মাবে। কঠিন অপরাধী। তা হলে ইন্টারোগেশনের সময় স্বামীকে অনেক ক্ষণের জন্য পাবে। তখন সংসারের ক'টা জরুরি কথা বলে নেবে।
প্রায় কোনও দিনই সেই ইচ্ছে পূরণ হয় না বি সাহার। আজও হল না।
আজ তো বাড়ি ফিরতে অনেকটাই রাত হল। মেয়ে খেয়ে নিয়েছে। তার সকালে স্কুল। অফিসে একটা উদ্ভট ডিউটি ঘাড়ে এসে চাপল। রঞ্জনী রায়ের ফাইলটাও পুরো পড়ে উঠতে পারেননি, বিকেল পাঁচটা নাগাদ বড়সাহেব ফোন করলেন। টেবিলে রাখা মোবাইলের নম্বর দেখে তাড়াতাড়ি ফোনটা ধরলেন বি সাহা।
‘স্যার, কী হয়েছে?’
বড়সাহেব এক নিঃশ্বাসে বললেন, ‘ভিআইপি কেস। এক জন রেসপনসিবল অফিসার ছাড়া ভরসা পাচ্ছি না। থানার লোক গেছে, ওদের দিয়ে কতটা হবে বুঝতে পারছি না। মনে হয় না কিছু হবে। কেসটায় ঝামলা আছে। তুমি এক বার যাও বসন্ত।’
বসন্ত রঞ্জনীর ফাইল সরিয়ে জিগ্যেস করলেন, ‘মার্ডার নাকি স্যার?’
বড়কর্তা বললেন, ‘না, চুরি।’
বসন্ত অবাক হলেন। চুরি চামারিতে আজকাল আর তাকে ডাকা হয় না। একটু বিরক্তও হলেন। রঞ্জনীর কেসটা পড়া হল না। ইন্টারেস্টিং জায়গায় ছাড়তে হল। তবে ভিআইপি মানেই ঠেলার নাম বাবাজীবন। বাড়ির বিড়াল হারালেও ফোর্স নিয়ে ছুটতে হবে। এই দেশে ভিআইপি সামলাতেই পুলিশ নাজেহাল হয়ে থাকে। তাদের কাছে পুলিশ হল ছাই ফেলতে ভাঙা কুলো।
‘স্যার, চুরি মানে? হিরে-জহরত ?’
বড়সাহেব চিন্তিত গলায় বললেন, ‘না। ওসব হলে কি তোমায় যেতে বলতাম? গিয়ে দেখো। একেবারে অন্য রকম।’
পুলিশের চাকরির এই একটা সমস্যা। অর্ডার পেলে সব ডিউটিতেই সোনামুখ করে ছুটতে হয়। বসন্ত সাহাকেও গাড়ি নিয়ে ছুটতে হল। অভিনেতার বাংলো বালিগঞ্জে। অফিস থেকে বেরোনোর সময় বাইরে দেখা হল রঞ্জনীর সঙ্গে।
‘তোমার ফাইল অনেকটা পড়ে ফেলেছি। ভাল কাজ হয়েছে। তবে অনেকগুলো কনফিউশনও তৈরি হচ্ছে।’
রঞ্জনী বলল, ‘আমারও হয়েছে স্যার।’
বসন্ত সাহা একটু থমকে দাঁড়ালেন। ভুরু কুঁচকে বললেন, ‘একটা খোঁজ পাও কি না দেখো তো।’
রঞ্জনী বলল, ‘কী স্যার?’
বসন্ত সাহা বললেন, ‘মধুমালতীর মায়ের প্রেমিকটি কে ছিল। সে এখন কোথায়।’
রঞ্জনী বলল, ‘ট্রেস করতে পারছি না স্যার। জেলে শিবনাথের সঙ্গে কথা বলেছিলাম। ওই নামটা জিজ্ঞেস করলে চুপ করে থাকছে। বলছে, জানি না। চাপ দিয়েছিলাম। তা-ও বলছে জানি না। কনভিক্ট স্যার, বেশি চাপ তো দেওয়া যায় না। তার ওপর মেয়ের ঘটনা শুনে খুব ভেঙে পড়েছে। একেবারে চুপ মেরে গেছে।’
বসন্ত সাহা গাড়িতে উঠতে উঠতে বললেন, ‘থানায় খোঁজ নাও। ইন্টারোগেশনে নিজেকে বাঁচাতে শিবনাথ কোনও নাম বলেছিল কি না খোঁজ নাও। অবশ্য যদি রেকর্ড থেকে থাকে। আঠেরো বছর আগের কেস তো। কোর্টের রেকর্ড রুমটাও দেখতে পারো।’
রঞ্জনী চোখ চকচক করে বলল, ‘ঠিক বলেছেন স্যার। এটা আমার মাথায় আসেনি। আমি চেষ্টা করছি।’
কথা শেষ করে স্যালুট করল রঞ্জনী। গাড়িতে উঠলেন বসন্ত। তাঁর মুখে চিন্তার ছাপ। গাড়ি স্টার্ট দেওয়ার মুখে কাঁচ নামিয়ে বললেন, ‘আর ওই সোমনাথ পাকড়াশি লোকটার স্ত্রী কী করে মারা গিয়েছিল জানতে হবে।’
রঞ্জনী বলল, ‘সেটা পারব। শুনেছি অ্যাকসিডেন্ট।’
বসন্ত অন্যমনস্ক ভাবে বললেন, ‘অ্যাক্সিডেন্টের নেচারটা জানতে হবে। গাড়ি চাপা না অন্য কিছু।’
রঞ্জনী বলল, ‘আচ্ছা স্যার।’
চুরির কেস সামলাতে গিয়ে অবাক হয়ে গেলেন দুঁদে পুলিশ অফিসার। কেসটা সত্যিই ইন্টারেস্টিং। এক নামকরা সিনেমা অভিনেতার স্ক্রিপ্ট চুরি হয়ে গেছে। গেছে নয়, যাচ্ছে। তবে পুরো স্ক্রিপ্ট নয়, স্ক্রিপ্টের একটা করে অংশ চুরি হচ্ছে। কেউ কয়েকটা পাতা ছিঁড়ে নিচ্ছে। তিন বার এই ঘটনার পরে অভিনেতা পুলিশের বড় কর্তাকে ফোন করেছেন। স্ক্রিপ্ট তিন বারই চুরি হয়েছে তাঁর বাংলো থেকে।
বসন্ত সাহা বালিগঞ্জের বাংলোতে গিয়ে দেখলেন, ড্রইংরুমে অভিনেতা মাথায় হাত দিয়ে বসে আছেন। পঞ্চাশের কাছাকাছি বয়স হয়েছে। তবে এখনও ঝলমল করছেন। এক সময়ে হিরোর পার্ট করে বাংলা ফিল্ম ইনডাস্ট্রিতে খুব নাম করেছিলেন। বসন্ত সাহা কলেজ পড়ার সময়ে ওর বেশ কিছু সিনেমাও দেখেছেন। এখন হিরো হতে পারেন না, বেছে চরিত্র নেন। তবে সে সব চরিত্রেও কাজ ভাল করেন।
অভিনেতার পাশে তাঁর স্ত্রী বসে আছেন। অভিনেতার চোখমুখ থমথমে। স্ত্রী চোখমুখ শক্ত করে বসে আছেন। একটা রাগ-রাগ ভাব। এই মহিলা অভিনয় জগতের কেউ নন, আহামরি দেখতেও নয়। তবে ফিল্মস্টারের বউ বলে কথা, চোখেমুখে অহংকার। বয়স স্বামীর কাছাকাছি। এখনও সাজগোজ অতিরিক্ত। ভর সন্ধ্যেতেই মেকআপ করে ফেলেছেন। মুখে রং-পাউডার তো আছেই, চোখের পাতায় আই শ্যাডো, হাতে নেলপলিশ।
লোকাল থানার ওসিকে নিয়ে বসন্ত সাহা ‘প্লেস অব্ অকারেন্স’ দেখলেন। কোথায় স্ক্রিপ্টগুলো ছিল?
স্ক্রিপ্ট থাকে অভিনেতার একতলার স্টাডি কাম অফিসে। সেখানে লম্বা সেগুন কাঠের টেবিল রয়েছে। শ্বেত পাথরের টপ। তার একবারে ওপরের ড্রয়ারে স্পাইরাল বাইন্ডিং করা অথবা ক্লিপ দিয়ে আটকানো অবস্থায় পাতাগুলো রাখা হয়। এবারও তাই ছিল। তিনটে আলাদা আলাদা ছবির স্ক্রিপ্ট। শ্যুটিঙের আগের দিন ভদ্রলোক স্ক্রিপ্ট নিয়ে আসেন। ইউনিট থেকে অ্যাসিস্ট্যান্ট ডিরেক্টর বা অন্য কেউ তার অংশটুকু আলাদা করে দিয়ে দেন। তবে সবটা নয়, পরের দিন যে অংশটুকুর শ্যুটিং হবে, সেটুকুই। অভিনেতা রাতে বাড়িতে এসে, বা পরের দিন গাড়িতে যেতে যেতে উল্টে দেখে নেন। কঠিন জায়গা হলে মনে মনে অভিনয় করে নেন। এখন দু'টো ছবির কাজ একসঙ্গে চলছে। আর একটা ছবির শ্যুটিং কিছু দিনের মধ্যে শুরু হওয়ার কথা। সেটার অবশ্য পুরো স্ক্রিপটাই ছিল সঙ্গে।
ওসিকে বসন্ত জিজ্ঞেস করলেন, ‘ছেঁড়া স্ক্রিপ্টগুলো কোথায়?’
ওসি একটা খাম এগিয়ে দিয়ে বললেন, ‘এর মধ্যে রয়েছে। গুছিয়ে রেখেছি।’
খাম থেকে পাতাগুলো বের করে ছেঁড়া জায়গাগুলো দেখতে দেখতে গভীর ভাবে ভুরু কুঁচকোলেন বসন্ত। তার পরে কাগজগুলো ফের খামের মধ্যে ভরলেন। পাশে দাঁড়িয়ে থাকা ওসিকে নিচু গলায় বললেন, ‘বাড়ির আশপাশটা একটু ভাল করে ঘুরে দেখুন তো ছেঁড়া অংশ কিছু পান কি না। বিশেষ করে বাড়ির পিছন দিকটা দেখবেন। আপনি নিজে যান। অন্য কেউ গেলে চিনতে পারবে না। যতটা পারবেন দ্রুত দেখবেন।’
ওসি ঘাড় কাত করে চলে গেলেন। বসন্ত এলেন ড্রইংরুমে।
‘স্যার, আপনার সঙ্গে একটু কথা বলতে পারি?’
অভিনেতা বললেন, ‘সেই জন্যই তো অপেক্ষা করছি। আমাকে আপনার কথা বলা হয়েছে মিস্টার সাহা। আপনি নাকি এক জন খুবই এফিসিয়েন্ট অফিসার।’
বসন্ত সামান্য হেসে বললেন, ‘তা জানি না স্যার, তবে আমি আপনার এক জন ভক্ত। এক সময়ে আপনার অনেক সিনেমা দেখেছি।’
অভিনেতা বললেন, ‘ধন্যবাদ।’
বসন্ত বললেন, ‘স্যার, আপনার আজ শ্যুটিং ছিল না?’
‘ছিল। এক জন টেকনিশিয়ান মারা যাওয়ার জন্য স্টুডিও বন্ধ হয়ে যায়। শ্যুটিং ক্যানসেল। বিকেলে একটা অ্যাওয়ার্ড অনুষ্ঠানে যাওয়ার কথা ছিল। মিসেসও যাবেন। আমরা রেডি হয়েছিলাম। দেখেই বুঝতে পারছেন। ভেবেছিলাম গাড়িতে যেতে যেতে নতুন ছবির স্ক্রিপ্টটা একটু দেখে নেব। সেটা বার করে দেখতে গিয়ে দেখলাম ছেঁড়া। এই নিয়ে থার্ড টাইম। আমি আর দেরি করলাম না। পুলিশে ফোন করি। আমি এর একটা হেস্তনেস্ত চাই।’
বসন্ত একটু চুপ করে থেকে বলেন, ‘ স্যার আপনার চিন্তা কী? স্ক্রিপ্টের অনেকগুলো কপিই তো আছে। আপনার ডিরেক্টেরের কাছ থেকে আর একটা চেয়ে নিলেই তো হবে।’
অভিনেতা অবাক গলায় বললেন, ‘কী বলছেন মিস্টার সাহা! চিন্তা হবে না? আমার মনে হচ্ছে, এটা আমার বিরুদ্ধে কোনও কন্সপিরেসি।’ কথাটা বলে তিনি পাশে বসে থাকা স্ত্রী-র দিকে তাকালেন। বললেন, ‘শ্যামশ্রী, তোমার মনে হচ্ছে না?’
ভদ্রমহিলা কিছু একটা বলতে গিয়ে চুপ করে গেলেন।
বসন্ত বললেন, ‘কন্সপিরেসি ! কে করছে?’
অভিনেতা সোফায় গা এলিয়ে বললেন, ‘আমাদের ইন্ডাস্ট্রিতে খেয়োখেয়ি কম নেই মিস্টার সাহা। তার ওপর আমায় অনেকে প্রবল হিংসে করে। এত দিন ইন্ডাস্ট্রিতে এত ভাল ফর্মে থাকা তো সহজ কথা নয়। আমাকে হেনস্থা করতে এনি বডি ক্যান ডু ইট।’
বসন্ত এবার সটান বললেন, ‘আপনার বাড়িতে স্ক্রিপ্ট ছেঁড়া হচ্ছে, যারা আপনাকে হিংসে করে তারা বাড়িতে কী করে আসবে?’
এ বার স্ত্রী মুখ খুললেন। কড়া গলায় আক্রমণ করার ভঙ্গিতে বললেন, ‘আপনি কী করে বুঝলেন আমার বাড়িতেই ছেঁড়া হচ্ছে? ছিঁড়েও তো দেওয়া হতে পারে। উনি তো নেওয়ার সময়ে সব পাতা পরীক্ষা করে নেন না। আপনি নামকরা অভিনেতা হলে বুঝতেন।’
বসন্ত তাড়াতাড়ি ক্ষমা চাওয়ার ভঙ্গিতে বললেন, ‘সরি, তা হতেই পারে। কিন্তু মোটিভ কী?’
অভিনেতা বললেন, ‘আমাকে হ্যারাস করা। চার দিকে যাতে ছড়িয়ে যায়, আমি এখন স্ক্রিপ্টটা পর্যন্ত ঠিক করে রাখতে পারছি না। এলোমেলো করে ফেলছি, নষ্ট করে ফেলছি। আমাদের কাছে স্ক্রিপ্ট সব থেকে ইমপর্ট্যান্ট মিস্টার সাহা।’
বসন্ত বললেন, ‘বাড়িতে কেউ ঢুকে ...।’
অভিনেতা কাঁধ ঝাঁকিয়ে বললেন, ‘হতেই পারে। অফিসে তো কত লোক আসে। তারা অপেক্ষা করে। আমি তো পাহারাদার রাখিনি। দু’বার আমি ভেবেছি, ম্যাটার ইজ নট সিরিয়াস। এখন বুঝছি মেজর কিছু ঘটছে। এবার থেকে অফিসের ভিতর কাউকে বসাতে হবে।’
বসন্ত বললেন, ‘স্যার আপনার কাউকে সন্দেহ হয় ?’
অভিনেতা বললেন, ‘হয়। কিন্তু নাম বলব না। আমাকে মানায় না। তা ছাড়া কত জনের নাম বলব?’
আবার অভিনেতার স্ত্রী মুখ খুললেন, ‘সবই যদি ওকে দিয়ে বলিয়ে দেন, তা হলে আপনারা কী করবেন? বসে বসে সরকারের মাইনে নেবেন?’ তারপর স্বামীর দিকে তাকিয়ে বলেন, ‘তখনই বলেছিলাম পুলিশ টুলিশ ডেকো না। ওরা কিছু পারে না। বোগাস। বুদ্ধি নেই মোটেও।’
খুবই টেঁটিয়া কথা। যথেষ্ট অপমানের। বসন্ত সাহা গায়ে মাখলেন না। এত বড় অভিনেতার স্ত্রী বলে কথা। টেঁটিয়া কথা ছাড়া তাকে কেন মানাবে?
‘অবশ্যই আমি দেখছি। এক দিনের জন্য স্ক্রিপ্টগুলো একটু নিতে পারি স্যার?’
অভিনেতা বললেন, ‘নিন। কাল ফেরত দেবেন। দেখবেন বিষয়টা সিক্রেট থাকে যেন। ফিল্ম জার্নালিস্টরা জানলে গসিপ করবে।’
বসন্ত হাতের খামটা বাঁ দিকের সোফায় বসা অভিনেতার স্ত্রীর দিকে এগিয়ে দিয়ে বললেন, ‘স্যারের মোবাইল নম্বরটা যদি একটু পিছনে লিখে দেন...এই যে পেন...’
মুখে বিরক্তি নিয়ে মহিলা হাত বাড়িয়ে খামটা নেন। খসখস করে নম্বর লেখেন। বসন্ত খাম ফেরত নিয়ে বলেন, ‘ধন্যবাদ। আপনারা চিন্তা করবেন না। সব গোপন থাকবে।’ কথা শেষ করে উঠে দাঁড়ালেন।
অভিনেতা বললেন, ‘কিছু বুঝতে পারলেন মিস্টার সাহা?’
বসন্ত সাহা একটু হেসে বললেন, ‘পুলিশ এত বুদ্ধিমান হয় না। হলে কি আর বসে বসে মাইনে নিত? আমি চললাম। দরকার হলে স্যারকে ফোন করে নেব।’
