
শেষ আপডেট: 27 November 2018 13:09
প্রচেত গুপ্ত
মধুমালতীর নামের পিছনে গল্প আছে।
জন্মের পরপরই মেয়েটির ঠাকুমা এই নাম ঠিক করে ফেলেন। বাড়িতে আপত্তি ছিল। আজকালকার দিনে এই নাম চলে না। সেই আপত্তি টেকেনি। নাতনিকে প্রথম দিন দেখেই ঠাকুমা চমকে উঠলেন।
‘এই মেয়েকে হুবহু আমার এক বান্ধবীর মতো দেখতে। খুব ছোটোবেলার বন্ধু। তার সঙ্গে সারাটা দিন কাটত। আমার গাঁয়েরই মেয়ে। নাম ছিল দামিনী, পাঠশালায় পাশাপাশি বসতাম। সে ছিল নামতায় ভাল। আমরা আট–নয় ঘরের নামতা নিয়ে যখন নাস্তানাবুদ হচ্ছি, ও তখন বারো-তেরোর ঘর ঝরঝরিয়ে বলছে। দু'জনে মিলে মেলায় যেতাম, পুতুল খেলতাম, গাছে চড়ে পেয়ারা খেতাম, চরকি হাতে আল ধরে ছুটতাম। এক দিন সেই মেয়ে গেল হারিয়ে।
সকালবেলা কংস মুদির দোকানে গিয়েছিল ভেলি গুড় কিনতে। ওর মা পাঠিয়েছিল। সময় চলে যায়, মেয়ে ফেরে না। মা রান্না ফেলে ছপটি হাতে বেরোল। নিশ্চয় কোথাও খেলতে মেতেছে, পিটিয়ে পিঠের ছাল তুলবে। মেয়েকে পাওয়া গেল না। বাপ–মায়ে, গাঁয়ের লোকে কত খুঁজল। থানা পুলিশ হল, পুকুরে জাল ফেলা হল, ঝোপঝাড় সাফ হল, ধানক্ষেতে নিঙাড় হল। কোনও লাভ হল না। আমি সাত দিন কাঁদলাম। তাড়সে জ্বর এল। এক মাস বিছানা নিলাম। তাতেও আমার বন্ধু ফিরল না। আজ নাতনিরে দেখে মনে হল, সেই মেয়ে ফিরে এসেছে। অবিকল তার মতো চোখ-মুখ, নাকের পাশে তিল। মধুমালতী নাম ছিল তার। আমার নাতনিরও নাম তাই হবে। তোমরা রাজি না হলেও হবে।’
যদিও এই মেয়েকে সবাই মধু নামে চেনে। সেই নামেই তাকে বেশির ভাগ সময়ে ডাকা হয়। একমাত্র মেয়ের বাবা শিবনাথ ডাকে মধুমালতী বলে। যদিও মধুর সেই ডাক শোনবার বিশেষ সুযোগ হয় না। মাসে মাত্র এক বার শুনতে পায়। তৃতীয় বুধবার করে। কোনও কোনও মাসে তা-ও হয় না। শরীর খারাপ থাকলে বা বাইরে প্রোগ্রামে গেলে বাবার সঙ্গে দেখা হয় না। এক বার দেখা না হলেই আটষট্টি বছরের মানু্ষটা সব গুলিয়ে ফেলেন।
একমাত্র সন্তান মধুমালতী তাঁর বেশি বয়সের কন্যা। তার আর ভাই-বোন না থাকলেও, একমাত্র সন্তান বোধ হয় বলা যায় না তাকে। মধু জন্মানোর আগে, তার মায়ের দু’বার অ্যাবরশন হয়েছিল। প্রথম বার মধুর মা নিজে করিয়েছিলেন। বাচ্চা মানুষ করার ঝক্কি নিতে চাননি। পরের বার শিবনাথ আটকে দেন সন্তানের জন্ম। তাঁর তখন অবস্থা খুব খারাপ। কারখানা বন্ধ হয়ে গেছে। কাজকর্ম নেই।
মধুমালতী মা বলেছিল, ‘বারবার অ্যাবরশন করলে পরে বাচ্চা হতে মুশকিল হবে।’
শিবনাথ রেগে গিয়ে বলেছিল, ‘হলে হবে। বাচ্চা হলে খাওয়াব কী ?’
মধুমালতীর মা বলেছিল, ‘আমিও তো রোজগার করি।’
শিবনাথ বলেছিল, ‘ও রোজগারের দাম কী আছে? আজ আছে, কাল নেই।’
মধুমালতীর মা চাপা গলায় গজগজ করে বলেছিল, ‘তা হলে তুমি অপারেশন করে নিলেই পারো।’
শিবনাথও রেগে গিয়ে বলেছিল, ‘তাই নেব। এক দিন হাসপাতালে গিয়ে সব ব্যবস্থা করে আসব।’
মধুমালতীর মা হিসহিসিয়ে বলেছিল, ‘করলে আমি বেঁচে যাই। বারবার পেট খালাস করতে দৌড়োতে হয় না।’
মধুমালতী জন্মানোর সময়ে জটিল সমস্যা দেখা দিল। এমন সমস্যা যে এক সময়ে ডাক্তার কী সিদ্ধান্ত নেবে ঠিক করতে পারছিল না। মা না মেয়ে? কাকে বাঁচানো হবে? সেই সময়ে শিবনাথকে হাসপাতালের ধারে কাছে পাওয়া যায়নি। স্ত্রীর পেটের তিন নম্বর সন্তানটি নিয়ে সে একেবারে উৎসাহী ছিল না। নিজের রোজগারপাতির জন্য তখন সে বাইরে বাইরে ঘুরছে। শেষ পর্যন্ত ডাক্তারবাবুদের আপ্রাণ চেষ্টায় মা, মেয়ে দুজনেই বেঁচে যায়। সেই দিক থেকে ধরতে গেলে মধুমালতীর জন্ম হওয়ারই কথা নয়।
মেয়ের সঙ্গে দেখা হলে শিবনাথ প্রতিবারই বলে, ‘অনেক দিন আসিস না মধুমালতী। শরীর ভাল তো? নাকি অফিসের কাজে আটকেছিলি?’
মধু বলে, ‘সে কী বাবা! এই তো সে দিন ঘুরে গেলাম। শুধু গত মাসটাতেই যা আসতে পারিনি। তুমিই রোজই একই অভিযোগ করো।’
শিবনাথ অস্ফুটে বলে ‘ও। আমার যেন কেমন মনে হচ্ছিল, অনেক দিন হয়ে গেছে, তুই বোধ হয় আর আসবি না। আজকাল দিন-ক্ষণের হিসেব থাকে না রে। জেলখানার এইটা একটা কষ্ট, দিন-রাতের হিসেব গুলিয়ে দেয়। কখনও মনে হয়, অনেক দিন কেটে গেল, কখনও মনে হয়, একটা রাতই থমকে আছে। সেই রাত কখনও শেষ হবে না। মানুষের জন্য দিন–রাতের হিসেব না থাকা খুবই বেদনার।’
মধু চাপা গলায় বলে, ‘তোমার দিনরাতের হিসেব রাখবার দরকার কী ? আমি এলেই তো হলো। আমি তো নিয়ম করেই আসি।’
শিবনাথ বলে, ‘ঠিক বলেছিস, হিসেব রেখে আমি কী করব? আমার সব হিসেব ফুরিয়েছে।’
মধু রাগ দেখিয়ে বলে, ‘ওসব কথা ছাড়ো । তুমি আছো কেমন? পায়ের ব্যথা কমেছে ? গরম জল–ঠান্ডা জল করতে বলেছিলাম না? করেছো? বলেছিলাম তো জল রোদে রেখে গরম করে নেবে। নাও না?’
শিবনাথ এ কথার উত্তর দেয় না। কয়েক মুহূর্ত চুপ করে থেকে বলে, ‘মধুমালতী, তুই কি এখনও মনে করিস, খুনটা আমি করেছি? তোর কোনও ভুল হয়নি তো?’
মধু বিরক্ত হয়ে বলল, ‘উফ্! তুমি আবার শুরু করলে বাবা! তোমাকে না বলেছি, এই সব কথা আর বলবে না। যা হওয়ার হয়ে গেছে। এ রকম করলে কিন্তু আমি আর আসব না। উনিশ বছর ধরে এক কথা বলছো। তোর ভুল হয়েছে, ভুল হয়েছে, ভুল হয়েছে... আমি খুন করিনি। আমি তো মেনে নিয়েছি। আইন আদালত তো আর মানবে না।’
শিবনাথ মাথা নামিয়ে বলে, ‘রোজই ভাবি আর তোকে বলব না। তার পরেও রাতে ঘুম ভেঙে যায়... জেলের ঘণ্টায় প্রহর জানান দেয়... মনে হয়, মেয়েটা এলে জিজ্ঞেস করব, কেন ভুল করলি?’
মধু চুপ করে থাকে। এক সময়ে গলা নামিয়ে বলে, ‘বাবা, যদি ভুল করে থাকিও, ক্ষমা তো তোমারই করবার কথা। আমি যদি সে দিন..... এই সাজা থেকে তুমি হয়তো নিস্তার পেতে।’
শিবনাথ অন্যমনস্ক ভাবে বলে, ‘আমি খুন করিনি। অথচ তুই আড়াল থেকে এসে দেখলি... আমি ভাবতেও পারিনি। প্রথমে অবাক হয়েছিলাম। তার পরে তোর ওপর রাগ হয়েছিল। অপরাধ না করেও এমন চরম সাজা হওয়ার পরে সব চাওয়া-পাওয়া থেকে যখন দূরে সরে গেলাম, ধীরে ধীরে যত সময় যেতে লাগল, বুঝলাম, তুই ঠিক করেছিস। জীবনের বেশির ভাগ সাজানো জিনিসই ঠিক থাকে না মধুমালতী। এলোমেলো হয়ে যায়। তুই যদি সে দিন চুপ করে থাকতিস, তোর মায়ের হয়ে কে বলতো? খুন না করি, তোর মায়ের ওপর অত্যাচার তো কম করিনি... ঠিকই করেছিস... ঠিকই করেছিস... ।’
মধু কথা ঘোরায়। বলে, ‘তোমাদের নতুন জেলার সাহেব এসেছেন না? কেমন মানু্ষ? রাগী?’
শিবনাথ বলল, ‘ভাল। সবার খোঁজখবর রাখে। শুনেছি কবিতা লেখে।’
মধু চোখ বড় করে বলে, ‘কবিতা লেখে! এই রে! খাবার-টাবার ঠিক আসছে তো? সে দিকে খোঁজ রাখে ? নাকি কবিতা লিখতে গিয়ে সব ভুলে মেরে দেয়?’
শিবনাথ হেসে বলে, ‘জেলের খাবারে অভ্যেস হয়ে গেছে। ভাল মন্দ বুঝি না। মাঝেমাঝে চিন্তা হয়, ভুল করে যদি কখনও ছাড়া পেয়ে যাই, বাড়িতে গিয়ে কী খাব? বাড়িতে জেলের খাবার কে তৈরি করে দেবে ? তুই পারবি মধুমালতী? শিখে নিবি ?’
মধু চুপ করে থাকে। এই মানুষটা কোনও দিনও ছাড়া পাবে না। এখন লাইফটার্ম মানে আমৃত্যু। আর মামলাটা যা ছিল, তাতে ফাঁসিতে যে ঝোলেনি তাই অনেক। যে এ সব বলছে সে-ও জানে।
মধু নিচু গলায় বলে, ‘আর ক'টা দিন যাক, মার্সি পিটিশন করব।’
শিবনাথ হেসে বলে, ‘খেপেছিস ? জেল ছাড়া থাকতেই পারব না। জলের মাছ হয়ে গিয়েছি। এই বেশ আছি। আর তো ক'টা দিন। তার পরে ওপরে চলে যাব, আরও বড় জেলে।’
শিবনাথ হাত তুলে ওপরে আকাশ দেখায়।
মধু বলল, ‘সে দেখা যাবে ক্ষণ।’
শিবনাথ চুপ করে থেকে বলে, ‘তোর অফিসে খুব চাপ?’
মধু নিচু গলায় বলে, ‘ওই আর কী।’
আজকাল এই মিথ্যেটা বলতে আর ভাল লাগে না মধুর। তার পরেও বলতে হয়। সে চাকরি করে না। কোনও দিনই করেনি। গানই তার প্রফেশন। ফাংশনে গান গেয়ে বেড়ায়। লোকে বলে ‘মাচা আর্টিস্ট’। কিন্তু এই পেশার কথা বাবাকে বলা যায় না। জেলে ঢোকার কিছু দিন পরেই প্রতিজ্ঞা করিয়ে নিতে চেয়েছিল বাবা, আর যা-ই করুক, মায়ের মতো গানের লাইনে যেন সে না যায়।
মধুমালতী সে দিন বলেছিল, ‘ঠিক আছে যাব না।’
‘সত্যি বলছিস তো? গানবাজনার লাইন ছেড়ে দিবি?’
এবার মধুমালতী রেগে যায়। যে মানুষটা মেয়ের জন্য একটা পয়সাও না রেখে বউকে মেরে জেলে ঢুকে যায়, সে এ সব কথা বলে কোন অধিকারে? এক বারও ভেবেছে, মেয়েটা কী খেয়ে বাঁচবে?
মধুমালতী বলেছিল, ‘সত্যি না বললে, তুমি কী করবে? জেলের বাইরে এসে তো আমাকে মারতে পারব না।’
আঠেরো বছর আগের কথা। শিবনাথের তখন বয়েস কম। মধুর ষোলো। লাইফটার্মের রায় হয়েছে সদ্য। তখনও শিবনাথের বিশ্বাস ছিল, হাইকোর্টে আপিল করলে সাজা কমবে। শিবনাথের তেজ ফুরোয়নি। সেই তেজে মেয়েকে উত্তর দিয়েছিল।
‘কে বলেছে পারব না? কে বলেছে? জেল আমাকে বেশি দিন আটকে রাখতে পারবে? আমি খুন করিনি, আমি ছাড়া পাবই। ভুল বিচার হয় না? তার পরে ছাড়াও পায়। হাজার হাজার লোক ছাড়া পেয়েছে। আমিও পাব। আর যে দিন ছাড়া পাব, সে দিনই তোকে খুন করে ফেলব।’
গারদে লাগানো তারের জালের বাইরে দাঁড়িয়ে কিশোরী মধুমালতী বলেছিল, ‘মারলে মারবে। মাকে মেরেছো, আমাকেও মারবে।’
শিবনাথ চেঁচিয়ে ওঠে , ‘চুপ কর। চুপ কর হারামজাদি। আমি খুন করিনি। তুই পুলিশকে মিথ্যে বলেছিস।’
মধুমালতীও বলে, ‘আমি সত্যি-মিথ্যে কিছুই বলিনি। যা দেখেছি তাই পুলিশকে বলেছি। আমি দেখেছি, তুমি মায়ের গলা টিপে ধরছো। তখন আকাশ কালো করে মেঘ হয়েছিল। যে কোনও সময়ে হুড়মুড়িয়ে বৃষ্টি নামবে। আমি স্কুল থেকে তাড়াতাড়ি ফিরছিলাম। সঙ্গে ছাতা ছিল না... বাড়ির সামনে এসে পাঁচিল টপকে আমাদের ঘরে চোখ যায়... মেঘের জন্য ঘর অন্ধকার ছিল... ।’
শিবনাথ মধুমালতীকে থামিয়ে বলে, ‘আমার গলা চেপে ধরায় তোর মা মরেনি। আমি সে দিন বাইরের ট্যুর সেরে দুপুরে হঠাৎ বাড়ি ফিরেছিলাম। দেখি দরজা খোলা। তোর মা বিছানায় শুয়ে ছটফট করছে... নিজের গলা চেপে ধরে আছে আর বলছে... আমাকে মেরে দিয়ে গেল, মেরে দিয়ে গেল... তার গলায় আঙুলের ছাপ... চোখ ঠিকরে বেরিয়ে এসেছে, মুখে গ্যাঁজলা... আমার মাথায় আগুন ধরে যায়... আমি তোর মাকে টেনে তুলি... ঝাঁকুনি দিয়ে জিজ্ঞেস করতে থাকি... নাম বলো, লোকটার নাম বলো... তুই যে ওই সময়ে স্কুল থেকে ফিরে এসে জানালার বাইরে থেকে দেখবি...
ভুল বুঝেছিস তুই...।’
মধুমালতী ঠোঁটের কোণে হাসে। ব্যঙ্গের হাসি।
‘মাকে অন্য কেউ এসে গলা টিপে চলে গেল, আর তুমি মাকে নিয়ে হাসপাতালে গেলে না, পুলিশ ডাকলে না, উল্টে মাকেই ঝাঁকাতে শুরু করলে! এই গল্প পুলিশও বিশ্বাস করেনি, আমিও করিনি বাবা।’
শিবনাথ ফুঁসে উঠে বলে, ‘তুই আমায় বাবা ডাকবি না হারামজাদি। তুই আমার মেয়ে নোস। তোর মা একটা নষ্ট মেয়েছেলে।’
মধুমালতী বলল, ‘আমি জানি বাবা, তুমি মনে করো আমি তোমার মেয়ে নই। কিন্তু ওই নষ্ট মেয়েছেলের পয়সায় তো কম খাওনি। মা গান গেয়ে, প্রচণ্ড পরিশ্রম করে ফিরত, তুমি তাকে সন্দেহ করে পেটাতে। মাকে যেভাবে মারতে... আমি জ্ঞান হওয়ার পর থেকেই দেখে আসছি... বেদম মারছো... দেয়ালে মাথা ঠুকে দিতে... একটু বড় হবার পরে আমি বাধা দিতে যেতাম, তুমি আমায় দরজা আটকে রাখতে। মায়ের শাড়ি ছিঁড়ে, জামা ছিঁড়ে বেল্ট দিয়ে মারতে... শীতের রাতে মারতে মারতে বাড়ি থেকে বার করে দিতে... যে কোনও দিন মা মারা যেতে পারত... গেলও তো। আমি কত বার মাকে বলেছি, তুমি প্রতিবাদ করো, বেরিয়ে যাও বাড়ি থেকে। এই ভয়ংকর মানুষটার সঙ্গে থেকো না আর এক দিনও। মা বেরোতে পারেনি। তোমাকে অসম্ভব ভালবাসত। বেচারি বোকা। অত ভালবাসা থাকলে মরতেই হয়।’
শিবনাথ হুংকার দিয়ে ওঠে।
‘সেই কারণে তুই খুনের মিথ্যে অভিযোগ দিবি? মেয়ে হয়ে তুই বাবার এই সর্বনাশ করতে পারলি শয়তানী?’
কিশোরী মধু ঠান্ডা গলায় বলেছিল, ‘আমি মায়ের মেয়ে বাবা। এই তো বললে, বাবা বলে ডাকবি না। বললে না? জন্মের পর থেকে এক দিনের জন্যও আমায় কোলে নাওনি। আদর করে একটা লঞ্জেসও কিনে দাওনি। অসুখ-বিসুখে মুখ ফিরিয়ে তাকাতেও না। মা সারা রাত জেগে বসে থাকত। তার পরেও তোমায় আজও বাবা বলে কেন ডাকি জানো? মায়ের জন্য। মা বলে গিয়েছিল। লোকটাকে কখনও অসম্মান করিস না।’
শিবনাথ বলল, ‘তার নমুনা তো দেখতেই পাচ্ছি। সম্মানের নমুনা। জেলে পাঠিয়েছিস।’
মধুমালতী বলল, ‘আমি আবার বলছি বাবা, তোমাকে আমি জেলে পাঠাইনি। পুলিশ পাঠিয়েছে, কোর্ট পাঠিয়েছে।’
শিবনাথ ঝাঁঝিয়ে ওঠে, ‘তোর সাক্ষ্য সব থেকে বড় ক্ষতি করেছে।’
মধুমালতী মাথা নামিয়ে বলেছিল, ‘সরি বাবা। মায়ের খালি পিঠে তোমার বেল্টের মার আমি ভুলতে পারি না।’
শিবনাথ হাঁপাতে হাঁপাতে বলে, ‘কেন মারতাম জানিস। তোর মা... তোর মা একটা... ’
কিশোরী মধুমালতী সহজ ভাবে বলেছিল, ‘আমার মা কী? একটা বেশ্যা হয়ে গিয়েছিল? অন্য লোকের সঙ্গে শুতো?’
শিবনাথ মুখ ফিরিয়ে বলেছিল, ‘মুখে মুখে চোপা করবি না। যদি কখনও শুনি মায়ের মতো স্টেজে উঠেছিস... কোনও দিন আসবি না আর আমার কাছে।’
সেই অল্প বয়েসেই মধু অবাক হয়ে ভেবেছিল, এত কিছু ঘটার পরেও লোকটা মেয়ের ওপর থেকে অধিকার সরাতে পারে না। এখনও ধমক দেয়। অন্য কোনও বাবা হলে কী করত? মেয়ের মুখ দেখত কোনও দিন? অবশ্য এই লোক তো মনেই করে, সে তার বাবা নয়। অন্য পুরুষের সন্তান। তবে এখন এ কথা কিছুতেই মানবে না। কেস লঘু হয়ে যাবে।
টিআই প্যারেডের দিন জেলখানার আর দশ জন আসামীর মাঝখানে দাঁড়িয়ে থাকা শিবনাথকে চিনিয়ে কাঁদতে কাঁদতে সে বলেছিল, ‘ইনিই আমার বাবা। আমি দেখেছি এই মানুষটা ঘটানার দিন, দু’হাতে আমার মায়ের গলা চেপে ধরে আছে। মা ছটফট করছে।’
ম্যাজিস্ট্রেট সাহেব বলেছিলেন, ‘কোর্টে দাঁড়িয়ে এ কথা বলতে পারবে তো?’
মধুমালতী ফিসফিস করে বলেছিল, ‘পারব।’
পুলিশ অফিসার চাপা গলায় বলেছিল, ‘ভেরি গুড। ব্রেভ গার্ল।’
কোর্টে পেরেছিল মধুমালতী। গরাদে দাঁড়িয়ে থাকা শিবনাথের সামনেই সেদিনের ঘটনা সব বলেছিল। বলার আগে শক্ত চোয়ালে মুখ তুলে বলেছিল, ‘বাবা, আমাকে ক্ষমা করো। আমাকে সব বলতে হবে, নইলে মায়ের আত্মা শান্তি পাবে না। তুমি আমাকে ভুল বুঝো না। ধর্মাবতার, এই লোকটা প্রায়ই আমার মাকে ভয়ংকর মারধর করত। মাঝেমধ্যে আমার ভয় করত। মনে হতো মা মরে যাবে...।’
শিবনাথ বিড়বিড় করে কিছু বলেছিল। সে কথা শোনা যায়নি।
মধুমালতী শুধু সাক্ষী নয়, একেবারে আই উইটনেস। নিজের চোখে ঘটনা দেখেছে। বাবার খুনের বিরুদ্ধে মেয়ের সাক্ষ্য দেখতে কোর্টে ভিড় উপচে পড়েছিল সে দিন। গারদে দাঁড়ানো শিবনাথ সেই ভিড় দেখে তেজে ফুঁসছিল। লাল চোখ ঘুরিয়ে তাকিয়ে ছিল চার পাশে। থুতু ফেলেছিল। বিড়বিড় করে বলেছিল, ‘শালা, শুয়ারের দল। মস্করা দেখতে এসেছে।’