
শেষ আপডেট: 20 November 2018 11:43
প্রচেত গুপ্ত
গুলির আওয়াজ কেউ বুঝতে পারেনি। শুধু দেখেছে, যে মেয়েটি স্টেজে গান করছিল, সে হুমড়ি খেয়ে পড়েছে। হাত চেপে ধরছে পেটে। পেট থেকে ভেসে যাওয়া রক্ত দেখে মনে হচ্ছিল, ও কিছু নয়। আলোর খেলা।
গুলির আওয়াজ কেউ বুঝতে পারেনি বলার চেয়ে বোঝা ভাল, কেউ চিনতে পারেনি। গুলির আওয়াজ চট করে চেনার কথাও নয়। যারা এই আওয়াজে অভ্যস্ত তারাই পারে। তার ওপর আওয়াজটা ছিল চাপা। গায়িকার গলা তখন উঁচুতে। গানের ভাষায় ‘তার সপ্তক’-এ পৌঁছেছে। তীব্র বাজনা, মঞ্চ জুড়ে ঘুরে বেড়ানো সাইকেডোলিক আলো, দর্শকদের তুমুল হইচইয়ের মাঝখানে সেই চাপা আওয়াজ কে শুনতে পাবে! যদি বা শোনা যায়, তাকে ঢোলক বা অক্টাপ্যাডে ভুল করে পড়ে যাওয়া অতিরিক্ত বিট ছাড়া কিছু মনে হওয়ার কারণ নেই। গুলি যেন বাজনারই অংশ। আবার মেঘের ডাক নয় তো? হতেও পারে। সন্ধে থেকেই হালকা মেঘ করেছে। ফুরফুরে হাওয়া দিচ্ছে। একটু একটু বিদ্যুৎও চমকাচ্ছে।
যে মেয়েটি স্টেজে গান গাইছিল, তার নাম মধুমালতী। মধুমালতী সেন।
মধুমালতী পুরনো আমলের নাম। ব্ল্যাক অ্যান্ড হোয়াইট যুগের সিনেমায় এ রকম নাম পাওয়া যেত। আজকের দিনে এই নামের কথা কেউ ভাবে না। তার পরেও চৌত্রিশ বছরের এই মেয়েটির নাম মধুমালতী। পুরো চৌত্রিশ নয়, এক মাস বেশি চৌত্রিশ। চৌত্রিশ বছরের কোনও মহিলাকে আগেকার দিনে ‘মেয়ে’ বলার কথা ভাবাই যেত না। ‘মহিলা’ই ছিল প্রচলিত শব্দ। এখন সেই সব ধারণা পাল্টে গেছে। বয়স আর বছরে হিসেব হয় না। মানুষের আয়ু বেড়ে গেছে, কাজ করার ক্ষমতাও বেড়ে গেছে।
আমাদের এই মধুমালতীকে দেখতে বেশ সুন্দর। চেহারায় চটক আছে। বন্য ধরনের চটক। রুক্ষ অথচ শান্ত ভাব। খুঁটিয়ে দেখলে বোঝা যায়, এই শান্ত ভাবের মধ্যে কোথাও যেন তেজ লুকিয়ে আছে। বনের মতোই। বেশি ঢুকতে গেলে বিপদ। তবে এই বন্য সৌন্দর্য মেয়েটির প্রতি এক ধরনের আকর্ষণ তৈরি করেছে। সম্ভবত সেটাই তার যৌন আবেদনের কারণ। সরু কোমর, ভরা বুক, ভারি ঠোঁটে এই আবেদন প্রবল। চুল ছোটো করে কাটা। ঘাড়ের কাছে একটা ছোট্ট আঁচিল রয়েছে। যে পুরুষের তাকে আদর করবার সুযোগ হয়েছে, তাকে এই আঁচিল সম সময়েই উত্তেজিত করেছে। যৌনতার হাতছানি পৃথিবীর সব থেকে রহস্যময় বিষয়। কে কীভাবে হাতছানি দেবে, আর কে–ই বা সেটা বুঝবে বলা কঠিন। মধুমালতীর বয়স বোঝা যায় না। পারফর্মেন্সের সময় তো একেবারেই নয়। মেক আপ এবং ঝলমলে সাজগোজ করলে মনে হয়, এখনও তিরিশ পার হয়নি। মেয়েরা বয়স নিয়ে সব সময়েই গোল পাকাতে পারে। যাদের জীবিকার সঙ্গে পাবলিক অ্যাপিয়ারেন্স জড়িয়ে আছে তাদের আরও বেশি পারতে হয়।
বাজার খুব কঠিন হয়ে উঠছে। অনেক কম্পিটিটর। সত্যি কথা বলতে কী, মধুমালতীর তো প্রতিভা নেই যে তার জোরে ডাঁট দেখাবে। সুরে সুর মিলিয়ে গাইতে পারে এই যা। সে তো কত জনেই পারে। সে কখনও সিনেমায় প্লে ব্যাক করেনি, টিভির রিয়্যালিটি শো-তেও যায়নি। কে চেনে তাকে! ফলে যাদের হাতে প্রোগ্রাম থাকে তাদের তোয়াজে রাখতে হয়। মাঝেমধ্যে ‘বাড়াবাড়ি’ হয়ে যায়। গায়ে মাখলে চলে না। জোরজার না হলেই হল। তবে সে সব সংখ্যায় বেশি নয়।
যেমন মোহন পাকড়াশি। অনেক দিন ধরে লাইনে আছে। মধুমালতীর মাকেও প্রোগ্রাম দিত। মেয়েকেও দেয়। বয়স যত বাড়ছে, লোকটার যোগাযোগ তত বাড়ছে। কম বয়েসে বিয়ে করেছিল। অ্যাক্সিডেন্টে বউ মারা যায়। তারপর আর বিয়ে টিয়ে করেনি। এই লাইনেই মন দিয়েছে। একে তোয়াজ না করে উপায় আছে! হঠাৎ রাতবিরেতে শখ হলে ফোন করে বসে। গান শোনাতে হবে। চাপ কিছু দেয় না, তবে এক ধরনের শরীরের তাড়না থেকে করছে, বোঝা যায়। মধুমালতীও আহ্লাদীপনার অভিনয় করে।
‘কী যে বলেন পাকড়াশিদা! টেলিফোনে গান শোনাব?’
মধুমালতী জানে, এই লোকের যতই বয়স হোক, যতই মায়ের আমল থেকে কাজ করে আসুক না কেন, ‘দাদা’ ডাক শুনতে পছন্দ করে।
মোহন পাকড়াশিও খেলায়। নরম গলায় কথা বলে, ‘তা হলে কী হবে ?’
মধুমালতী নাক দিয়ে ‘আদুরে’ আওয়াজ করে বলে, ‘কী আবার হবে পাকড়াশিদা, আজকাল আপনি আমার গানই শুনতে চান না। চিনতেই পারেন না আমায়। ফোন করলে ধরেন না।’
মোহন পাকড়াশি আশ্চর্য হওয়ার ভঙ্গিতে বলেন, ‘কী যে বলো মধুমা!’
মধুমালতী বলে, ‘ও আপনি যতই আদর করে আমায় মধুমা ডাকুন, আমার সব জানা আছে। আপনি আমায় আর আগের মতো পছন্দ করেন না। করবেনই বা কেন? লাইনে কত কমবয়সি সিঙ্গার চলে এসেছে। আপনি এখন তাদের গান শোনেন।’
মোহন পাকড়াশি বলে, ‘মোটেই না। তোমরা হলে পোড়খাওয়া আর্টিস্ট। দু'টো গানের মধ্যে স্টেজ ধরে ফেল। পাবলিক কী ভাবে পাকড়াতে হয় তোমাদের জানা আছে। আজকের মেয়েরা পারবে ?’
মধুমালতী ঢলে পড়া ভঙ্গিতে বলে, ‘উমম্, এ সব আপনার মুখের কথা পাকড়াশিদা।’
মোহন পাকড়াশি বলে, ‘সত্যি বলছি।’
মধুমালতী বলে, ‘তা হলে প্রোগ্রাম দেন না কেন?’
মোহন পাকড়াশি বলে, ‘সে কী! এসব কী বলছো মধুমা! প্রোগ্রাম দিই না? গত মাসেই তো একটা দিলাম।’
মধুমালতী অভিমানী গলায় বলে, ‘ও সব একটা-দু'টোর কথা বাদ দিন পাকড়াশিদা। ওতে পেট চলে? আপনার হাতে অনেক কাজ। রাজ্যি জুড়ে অর্গানাইজার আপনার কাছে আর্টিস্ট চাইছে।’
মোহন পাকড়াশির এই অভিমান শুনতে ভাল লাগে।
‘আরে বাবা তুমি তো জানো মধুমা, সে সব বড় বড় আর্টিস্ট। বড় আর্টিস্টের কাজ না পেলে ইম্প্রেসিওর হয়ে টিকতে পারব? তোমার পাকড়াশিদা তো মরে যাবে।’
মধুমালতী গলায় আরও আধো-আধো ভাব এনে বলে, ‘আপনি শুধু বড় আর্টিস্ট নিয়ে থাকলে আমাদের কী হবে পাকড়াশিদা?’
মোহন পাকড়াশি হেসে বলে, ‘তুমিও তো সিনিয়র। কবে থেকে স্টেজ করছো। তোমার মাকেও তো প্রোগ্রাম দিতাম। কত প্রোগ্রাম দিয়েছি। তখন আমার কেরিয়ারের একেবারে আর্লি স্টেজ। ইস্ মেয়েটা চলে গেল। তোমার মা-ও ভাল স্টেজ নিত। ও সব কথা মনে পড়লে খুব খারাপ লাগে। যাক যা হবার হয়ে গেছে। অপরাধী সাজা পেয়েছে।’
এই অংশ মধুমালতী থমকে থাকে। কিছু বলে না।
মোহন পাকড়াশি প্রসঙ্গ ঘোরানোর জন্য বলে, ‘আসলে কী জানো মধুমা, সাজানো-গোছানো শহুরে স্টেজে প্রোগ্রাম করা সোজা। সেখানকার অডিয়েন্সও সিরিয়াস। ভাল না লাগলেও চুপ করে থাকবে। গ্রামেগঞ্জে, পাড়ার মোড়ে মাচায় উঠে হুল্লোড়ে পাবলিক ট্যাকল করতে দম লাগে। উনিশ-বিশ হলে ছেড়ে কথা বলবে না। তুমি এদের ম্যানেজ করতে পারো।’
মধুমালতী বলে, ‘ও সব জানি না পাকড়াশিদা। আমার বড় কাজ চাই। টাকাপয়সার টানাটানি চলছে।’
ফোনের ওপাশে ‘পাকড়াশিদা’ একটু চুপ করে থাকে। কিছু ভাবে। তার পরে বলে, ‘সামনের পুজোয় বাইরে যেতে পারবে? পাঁচটা স্টেট ঘুরিয়ে দেব। তোমার মাকে একবার দিল্লি নিয়ে গিয়েছিলাম। বাঙালিরা যেখানে যেখানে পুজো করে সেখানে ফাংশন হবেই হবে। বিখ্যাত আর্টিস্ট ছাড়াও এক–দু'দিন ওরা কম বাজেটে জমজমাট চায়। যাবে? খাটনি আছে কিন্তু টাকা খুব ভাল। যাবে?’
মধুমালতী অতি উৎসাহে বলে, ‘যাব না মানে! এ তো বিরাট সুযোগ। তবে পুজো এখনও অনেক দেরি। তত দিনে আপনি আমাকে ভুলে যাবেন পাকড়াশিদা। আপনার কত ললি, মলি, বলি এসে যাবে।’
মোহন পাকড়াশি গম্ভীর গলায় বলে, ‘পাকড়াশি কথা দিয়ে কথা রাখেনি এমন কখনও হয়েছে? এই লাইনে কেউ বলতে পারবে?’
মধুমালতী গলা নামিয়ে বলে, ‘আহা, রাগ করেছেন কেন? পাকড়াশিদা আপনাকে আমি চিনি না? আমি তো মজা করলাম। আমি কিন্তু সামনের পুজোতে ডেট ব্লক করছি। ওরা পাবলিসিটি দেবে?’
মোহন পাকড়াশি বলল, ‘বড় করে দেবে না। হোর্ডিং, ফ্লেক্স তো বড় আর্টিস্টদের জন্য। ছোট করে যাতে দেয় তার চেষ্টা করতে পারি। তার থেকেও বড় কথা টাকাটা যাতে ভাল অ্যামাউন্ট হয় সেটা ব্যবস্থা করব। তোমার মায়ের আমলে তো পেমেন্ট ভাল ছিল না। দিল্লি থেকে বেশ খানিকটা যেতে হয়েছিল।’
মধুমালতী গদগদ গলায় বলল, ‘এই জন্যই তো আপনাকে এতো ভালবাসি। অ্যাই পাকড়াশিদা, গান শুনবেন না?’
মোহন পাকড়াশি ঘন গলায় বলল, ‘বললাম তো, গাও।’
মধুমালতী ফিসফিস করে বলল, ‘ও ভাবে গান শোনা যায় নাকি? গাড়ি পাঠান। আমি যাচ্ছি।’
মোহন পাকড়াশি চাপা গলায় বলেন, ‘পাঠাচ্ছি। তুমি রেডি হয়ে নাও।’
মধুমালতী জানে, এই বুড়ো জ্বালায় না। গায়ে হাত দেয় না। দূরেই থাকে। অল্প মদ খায়। একটাই ব্যাপার গা খালি করে বসতে হয়। মেয়েমানুষের আদুল শরীর দেখলেই তার সুখ। এটুকু মেনে নিতেই হয়।
সমস্যা হয় ফাংশনের স্পটে। পার্টিদের নিয়ে। কখনও কখনও সমস্যা কঠিনও হয়েছে।
এক বার সুন্দরবনে প্রোগ্রাম করতে গিয়ে সমস্যা কঠিনের চেয়ে বেশি হল। রাত একটায় স্টেজ থেকে নেমে যখন গাড়িতে ওঠার তোড়জোড় চলছে, একটা রোগা চেহারা ছেলে এসে পাশে দাঁড়াল। বয়স বেশি নয়, আঠেরো–উনিশ হবে। ফুলহাতা শার্ট, চুল পাট করে আঁচড়ানো। গুডবয় ধরনের চেহারা। মধুমালতী সেদিন স্লিভলেস কুর্তা পরে গান গেয়েছিল। পাড়া-গাঁ, একটু ইন্টিরিয়রের দিকে হলে পোশাকে মাঝেমধ্যে হালকা সেক্স রাখে মধুমালতী। জামায় কখনও হাত ছোটো, কখনও বড় করে উন্মুক্ত পিঠ। এতে পাবলিক জমাতে সুবিধে হয়। গানের সঙ্গে গ্ল্যামার জড়িয়ে নাম ছড়ায়। পরে আবার ডাক পাওয়া যায়। প্রোগাম শেষে ফুলহাতা একটা জ্যাকেট পরে নিল। স্টেজ আর স্টেজের নীচের পোশাক এক হলে চলে না। ফারাক থাকলে তবেই না ইন্টারেস্ট জাগে!
ছেলেটি বলল, ‘দিদি, স্যার বলেছেন, খাওয়াদাওয়া করে কলকাতা ফিরলে তিনি খুব খুশি হবেন।’
মধুমালতী ভুরু কুঁচকে বলে, ‘তোমার স্যার কে?’
ছেলেটি বলল, ‘শ্যামাপদ মাল্লা। এখানে সবাই মাছশ্যামা নামে চেনে।’
মধু বিরক্ত হয়ে বলেছিল, ‘রাতে আমি খাই না। তা ছাড়া খুব দেরি হয়ে গেছে। কলকাতায় কখন পৌঁছব ঠিক নেই। তুমি তোমার মালিককে বলে দাও, নেমন্তন্নের জন্য ধন্যবাদ।’
ছেলেটি হাত কচলে বলে, ‘কথাটা স্যারকে আপনি নিজে জানালে ভাল হতো দিদি। উনি ভাববেন, আমি হয়তো ঠিক মতো বলতে পারিনি, তাই আপনি গেলেন না। উনি খুব আশা করে আছেন। এক রকম ধরেই রেখেছেন আপনি রাজি হবেন।’
মধু আরও বিরক্ত হতে গিয়েও নিজেকে সামলাল। খাবার আমন্ত্রণ নিয়ে রাগ দেখানো ঠিক হবে না। গাঁয়ের মানু্ষ অতিথি আপ্যায়ন করতে ভালবাসে। সেই অভিজ্ঞতা তার আছে। আয়োজন বেশি থাকে না, তবে যত্ন আর আদর থাকে খুব। সে গলা নরম করে।
‘ভাই, আপনার স্যারকে ডাকুন। আমি বুঝিয়ে বলে দিচ্ছি। বলে দিচ্ছি, আপনাদের আমন্ত্রণে কোনও ত্রুটি নেই। দোষ আমার। আমি রাতে খাই না।’
ছেলেটি একই ভঙ্গিতে হাত কচলাতে কচলাতে বলল, ‘স্যার তো এখানে নেই।’
মধু অবাক হয়ে বলেছিল, ‘সে কী! এখানে নেই মানে! তিনি কোথায়?’
ছেলেটি গলা নামিয়ে বলে, ‘স্যার নদীতে। উনি তো মাছের ব্যবসা করেন, তাই বেশির ভাগ সময়ে নদীতে থাকেন। এখন নদীতেই আপনার জন্য অপেক্ষা করছেন।’
মধুমালতীর কান ঝাঁ ঝাঁ করে উঠল। চোখ বড় করে বলল, ‘নদীতে আমার জন্য অপেক্ষা করছেন মানে!’
ছেলেটি গর্বিত গলায়, মুখে হাসি নিয়ে বলল, ‘স্যার লঞ্চে আছেন। স্যারের নিজের লঞ্চ। রাতে উনি কখনও কখনও লঞ্চেই থাকেন। জল ভালবাসেন তো। ওই যে বললাম না, মাছ নিয়ে কারবার। শ্যামামাছ নামে সবাই চেনে। আপনি গেলে লঞ্চ ছাড়বে। নদীতে ঘুরতে ঘুরতে স্যার আপনার সঙ্গে রাতের খাবার খাবেন। উনি ঝালমশলা খান না। সিদ্ধ পছন্দ করেন। মাছও তো ছোঁন না।’
মধুমালতী লোকটির স্পর্ধা দেখে যেমন অবাক হয়েছিল, তেমন ভয়ও পেয়েছিল। একটা অচেনা মেয়েকে রাতে লঞ্চে ডাকছে! বোঝাই যাচ্ছে এখানকার মাফিয়া ধরনের কেউ হবে। নইলে এতো সাহস হতো না।
ছেলেটি কথা চালিয়ে যেতে লাগল।
‘চিন্তা করবেন না দিদি, আপনার সঙ্গে যারা বাজনা নিয়ে এসেছে তাদের জন্য আলাদা ব্যবস্থা। ওদের লঞ্চে যেতে হবে না। এখানেই খাবার আসবে। ভাত, ডাল, ডিমের কারি। লঞ্চে শুধু আপনি একা যাবেন। স্যার সে রকমই বলে দিয়েছে। ঘাট পর্যন্ত যাওয়ার জন্য আমি আমার মোটোরবাইক নিয়ে এসেছি। দিদি, এই যে ফাংশন হল, আপনি টাকা পেলেন, সব খরচ আমার মালিক দিয়েছে। সিদ্ধ খান তো, মন ভাল।’
মধুর মাথা রাগে গনগন করে ওঠে। সে চিবিয়ে চিবিয়ে বলে, ‘তোমার সিদ্ধ খাওয়া স্যারকে গিয়ে বলে দাও, আমি রাতে নদীতে যাই না। তোমার স্যারের মতো নোংরা লোকেদের জন্য তো একেবারেই নয়।’
কড়া কথায় ছেলেটির কোনও তাপ উত্তাপ হল না। গলা আরও নামিয়ে বলল, ‘স্যার বলেছেন, লঞ্চে গান শোনানোর জন্য আলাদা পেমেন্ট হবে। উনি বিনিপয়সায় কিছু নেনও না, দেনও না। মাছের ব্যবাসায় মাগনা হয় না। স্যারের তিনটে ভেরিও আছে।’
মধুমালতীর ইচ্ছে করছিল, ছেলেটিকে ঠাসিয়ে একটা চড় মারতে। নিজেকে সামলে বলে, ‘তুমি তোমার স্যারকে বলে দিও, বাড়ি চলে গিয়েছি।’
ছেলেটি একটু চুপ করে থেকে ঘাড় কাত করে বলে, ‘আচ্ছা বলে দেব । অবশ্যই বলে দেব। তবে একটা কথা আপনাকে জানিয়ে রাখি, স্যার না চাইলে এখান থেকে বেরোনো কিন্তু কঠিন। জল, জঙ্গল, নদীনালার জায়গা তো, পথ হারিয়ে যায়।’
মধুমালতী ভয় দেখানোর জন্য বলল, ‘আমার সঙ্গে এতজন লোক আছে। পথ ঠিক খুঁজে পাব।’
ছেলেটি মুখের কাছে মুঠো করা হাত নিয়ে সামান্য কাশল। বলল, ‘দিদি, আপনার সঙ্গে গাড়ির ড্রাইভার, বাজনদার নিয়ে তো মোটে চার জন। আমার মালিকের চারশো লোক ছড়িয়ে থাকে। তারা পথ হারিয়ে দেয়।’
এবার মধুমালতীর বুকটা ধক্ করে উঠল। এ তো হুমকি। জোর করে নিয়ে যাবে বলছে। মধুমালতী এর পরেও ভয়ে লুকিয়ে বলল, ‘আমি কিন্তু থানায় যাব।’
ছেলেটি মাথা চুলকে বলল, ‘থানার বড়কর্তা তো এত ক্ষণ স্যারের লঞ্চেই ছিলেন। উনিও ঝালমশলা খান না। সিদ্ধ খান। মটর সিদ্ধ।’