
শেষ আপডেট: 21 December 2018 11:36
‘কে পিনু? পিনু এলি?’
নন্দিনী মায়ের অন্ধকার ঘরে মুখ বাড়িয়ে চাপা গলায় ধমক দিল, ‘আঃ! মা, চুপ করবে? বাইরের লোক এসেছে।’
নন্দিনী মাকে মাঝেমধ্যে ঝাঁঝিয়ে জিগ্যেস করে, ‘কই আমার জন্য কখনও এমন করে কাঁদো না! তোমার ছেলে কী এমন সুপুত্তুর যে তাকে এক মুহূর্ত চোখের আড়াল করলেই প্রাণ কাঁদে? আমি তোমার মেয়ে নই?’
রজনী জড়ানো গলায় বলেন, ‘তোকে ডাকি তো। ডাকি না?’
নন্দিনী দাঁতে দাঁত ঘষে বলে, ‘না ডাকো না।’
রজনী জড়ানো গলাতেই বলেন, ‘তুই বাড়ি না থাকলে জানবি কী করে ডাকি কি না?’
নন্দিনী ঠোঁট বেঁকিয়ে বলে, ‘এ ব্যাপারে তো টনটনে জ্ঞান আছে দেখছি।’
দরজায় এবার আরও জোরে আওয়াজ।
নন্দিনী দরজার দিকে এগোল। একটু করিডোরের মতো পথ যেতে হয়। পুরনো বাড়িতে যেমন। আলো কম। সালোয়ার কামিজের ওড়না ঠিক করল নন্দিনী।
অচেনা কেউ এলে মুশকিল। চেনা পুরুষমানুষেও সমস্যা। মা অসুস্থ, বাড়ির একমাত্র পুরুষমানুষটি রাত করে বাড়ি ফেরে, বিয়ের যুগ্যি মেয়ে বাড়িতে থাকলে চেনা পুরুষমানুষও সুযোগ খোঁজে। কিছু না পারুক, বুকের দিকে ড্যাব ড্যাব করে তাকাতে তো পারবে! অফিসের তোয়া এরকম ঘটনা দারুণ ট্যাকল করে। এক বার গড়িয়াহাটের মোড়ে এক জনকে বলেছিল, ‘দাদা ওভাবে বারবার আড়চোখে দেখছেন কেন? আঁচল সরিয়ে দিচ্ছি, ভাল করে দেখুন। নিন।’ সেই লোকের আবার পাশে বউ ছিল। সে কিছু একটা বলতে গেলে তোয়া সত্যি সত্যি আঁচলে হাত দেয়। লোকটা এবার পালানোর পথ পায় না। নন্দিনী এরকম কিছু পারে না। অটোতে কেউ কনুই দিয়ে খোঁচা দিলেও সিঁটিয়ে যায়, মুখে কিছু বলে না।
দরজা খুলতেই ঝড়ের মতো ঢুকে পড়ল পিনাকী। কাঁধে ব্যাগ। ঢুকেই দরজায় পিঠ দিয়ে দাঁড়াল কয়েক মুহূর্ত। চোখ বুজে লম্বা লম্বা শ্বাস নিল। তার পরে ছিটকিনিটা তুলে দিল এক রকম না দেখেই। নন্দিনী চমকে উঠল। কী হয়েছে দাদার? মনে হচ্ছে কেউ যেন তাড়া করেছে। চোখমুখ উদ্ভ্রান্তের মতো। খুব ভয় পেয়েছে। চুল এলোমেলো। হাঁপাচ্ছে। কী হল? দাদা কোনও খারাপ কাজের সঙ্গে তো থাকে না।
‘কী হয়েছে দাদা?’
পিনাকী চোখ বুজে বড় করে শ্বাস নিয়ে বলল, ‘কিছু হয়নি। তুই ঘরে যা।’
নন্দিনী বলল, ‘শরীর খারাপ করছে?’
পিনাকী চাপা গলায় বলল, ‘বলছি তো কিছু হয়নি, তুই ঘরে যা।’
নন্দিনী রেগে গিয়ে বলল, ‘আমাকে বারবার ঘরে যেতে বলছিস কেন? কী হয়েছে সেটা তো বল! নিজেকে সামলা। এত ভয় পেয়েছিস কেন? কেউ তাড়া করেছে?’
পিনাকী দাঁতে দাঁত চেপে বলল, ‘আর একটা কথা বলবি তো মার খাবি।’ তার পরে করিডোর পেরিয়ে দ্রুত ঘরের দিকে চলে গেল।
উত্তর কলকাতার এই ভাড়া বাড়িতে আড়াইটে ঘর। একটায় নীলিমা থাকেন। রাতে সেই ঘরে আলাদা চৌকিতে শোয় নন্দিনী। একটা ঘর পিনাকীর। অন্য আধখানা ঘরে দিনের অন্য সময় কাটায় নন্দিনী। বিশেষ করে সন্ধ্যের পর, অফিস থেকে এসে। নীলিমার ঘরে আলো জ্বালানো যায় না। চোখে লাগে। নন্দিনী ঘরে যেতে যেতে শুনতে পেল দাদা বাথরুমে বিকট আওয়াজ করে বমি করছে। দরজার বাইরে কিছু ক্ষণ চুপ করে দাঁড়িয়ে রইল। এক সময়ে দরজা ঠেলে ভিতরে ঢুকল। বমি শেষ করে পিনাকী কলের তলায় উবু হয়ে বসে আছে অন্ধকারে। জলে ভিজে যাচ্ছে। নন্দিনী দাদার পিঠে হাত রাখল। জলের মধ্যেই মুখ ফেরাল পিনাকী।
নন্দিনী ঝুঁকে পড়ে ফিসফিস করে বলল, ‘কী হয়েছে দাদা?’
পিনাকী অসহায় গলায়, জলে ভেজা শূন্য দৃষ্টিতে বলল, ‘মধুমালতী খুন হয়ে গেল। চোখের সামনে ওকে গুলি করে মেরে ফেলল।’
বুঝতে বেশ খানিকটা সময় লাগল নন্দিনীর। মধুমালতী কে? কে তাকে গুলি করল? দাদার এ রকম করছে কেন? তার পরে ধীরে ধীরে হতভম্ব ভাব কেটে তার সব মনে পড়তে লাগল।
মধুমালতী এক জন গায়িকা। ফাংশনের সিঙ্গার। বড় ফাংশন নয়, ছোট ফাংশন। দাদার বন্ধু অঙ্কুশ তার সঙ্গে মাঝে মধ্যে বাঁশি বাজায়। তবে কি সেই সূত্রেই দাদার সঙ্গে ওই গায়িকার আলাপ হয়েছে? দাদা কি তার গান শুনতে যায়? কোনও কোনও দিন বাড়ি ফিরতে রাত হয় কি সেই কারনেই? ক'দিন আগেই বলছিল ‘অঙ্কুশ বাজায় ভাল। তবে এই সব ফালতু রাস্তার প্রোগ্রামে কি আর বাঁশি বোঝা যায়?’
কথাটা শুনে খুব ভাল লেগেছিল নন্দিনীর। মুখে কিছু বলেনি। অঙ্কুশকে নিয়ে সে কোনও কথাই দাদার সামনে বলে না। দাদা কি ওই গায়িকার সঙ্গে কোনও রিলেশনে জড়িয়ে পড়েছিল?
নন্দিনী পিনাকীকে ধরে তুলল। পিনাকী নিচু গলায় বলল, ‘আমাকে পালাতে হবে নন্দিনী। আমাকে পালাতে হবে। আজ রাতেই পালাতে হবে।’
নন্দিনী ভয়ে কাঁপতে কাঁপতে বলল, ‘তুই কেন পালাবি দাদা! তুই কী করেছিস?’
পিনাকী ফ্যাকাশে গলায় বলল, ‘কী করেছি বলতে পারব না, তবে পালাতে হবে।’
নন্দিনী ফুঁপিয়ে উঠে বলল, ‘তুই চিন্তা করিস না। কিছু হবে না। অঙ্কুশদা কই?’
পিনাকী বিড়বিড় করে বলল, ‘অঙ্কুশ স্টেজে ছিল। ও কিছু জানে না।’
নন্দিনী আবার বলল, ‘তুই চিন্তা করিস না। ঘরে যা।’
পিনাকী বাথরুম থেকে বেরিয়ে টলমল পায়ে নিজের ঘরে গেল। দরজা বন্ধ করে তক্তাপোশের ওপর ফেলে রাখা কাঁধের ব্যাগটা তুলল। ভিতর থেকে একটা রিভলভার বার করে অন্ধকারেই ঘুরিয়ে ফিরিয়ে দেখল। তার পরে ফের ব্যাগে ঢুকিয়ে ফেলল। পাশের আলনা থেকে জামা–কাপড় নিয়ে ব্যাগে ঢোকাতে শুরু করল দলা পাকিয়ে।
‘খাবারের নাম ইলিশ মাছের রোস্ট। ইলিশ মাছ ছাড়াও লাগবে টকদই, কারিপাতা, অল্প তেঁতুল, সরষে, জিরে, মেথি। সঙ্গে পরিমাণ মতো গোলমরিচ, আদাবাটা। আর লঙ্কা, পেঁয়াজ, অল্প তেঁতুল। এর সঙ্গে দরকার খানিকটা ঘি। ইলিশ মাছে পেঁয়াজ সাধারণত চলে না। এখানে চলবে। লেবু, নুন, হলুদ গুঁড়ো পরিমাণ মতো। প্রথমে ইলিশমাছের টুকরোগুলোকে দই, লেবুর রস এবং হলুদ গুঁড়ো মাখিয়ে কম করে এক ঘন্টা ম্যারিনেট করতে হবে। সময় বাড়লে ক্ষতি নেই। মনে রাখতে হবে এই প্রিপারেশনে ইলিশ মাছের ভিতর রস যত ঢুকবে, স্বাদ বাড়বে। এই সময়ের মধ্যে জিরে, সরষে, মেথি ভেজে গুঁড়ো করে নিতে হবে...।"
খাটের ব্যাক রেস্টে হেলান দিয়ে রঞ্জনী ম্যাগাজিন খুলে রেসিপি পড়ছে। শুধু ম্যাগাজিন নয়, সে মাঝেমধ্যে ইউটিউব দেখেও রান্না শেখে। তবে সব চেয়ে ভাল হয় বাড়ির কুক রতনের মায়ের কাছ থেকে হাতে কলমে শিখলে। একেবারে রান্নাঘরে গ্যাসের পাশে দাঁড়িয়ে। রঞ্জনীর খুব ইচ্ছে, এক দিন স্যার আর ম্যাডামকে বাড়ি ডেকে খাওয়ায়। সময় করে বলতে হবে। স্যার সব সময়ই ব্যস্ত। একটু গড়বড়ে মামলা হলেই সবাই বসন্ত সাহাকে ডাকডাকি করবে। এই যে ক'দিনের জন্য উনি বিদেশে যাচ্ছেন, তখন কী হবে কে জানে। ওর কাছে ‘মেঘমল্লার’ ফাইলটা যে দিতে পারা গেছে, এই অনেক।
এই ফাইল তৈরি করতে রঞ্জনীকে খাটতে হয়েছে খুব। সময় বেশি ছিল না। এতগুলো লোককে জেরা করা সহজ নয়। মধুমালতীর মোবাইল সিজ় করে পুরো কললিস্ট নিয়ে বসতে হয়েছে। মেয়েটার দু'টো মোবাইল। সব কল দেখা তো অসম্ভব। ফ্রিকোয়েন্ট কলগুলো চেক করতে হয়েছে। তবে বেশির ভাগই মিউজিসিয়ান আর অর্গানাইজারদের। যেটুকু মেসেজ পাওয়া গেছে, পড়তে হয়েছে। সাইবার ক্রাইমের ইনস্পেক্টর করতোয়া সেন আর তাঁর টিম প্রচুর হেল্প করেছে। হোয়াটসঅ্যাপ, ফেসবুকের চ্যাট চেক করতে হয়েছে। মধুমালতীর ল্যাপটপটাও বাড়ি থেকে সিজ় করা। তবে সেখানে বেশির ভাগই ডাইনলোড করা গান।
যাকে একটু সন্দেহ হয়েছে বা মনে হয়েছে কাজে লাগতে পারে তার সঙ্গেই কথা বলা হয়েছে। মিউজিকের ছেলেরা খবরও দিয়েছে। ওরা না বললে, শ্যামাপদ মাল্লা নামের লোকটার কথা জানাই যেত না। এই লোকটাকে তার এলাকায় সবাই ’মাছশ্যাম’ নামে চেনে। ফোনে মধুমালতীকে এক বার হুমকি দিয়েছিল। মধু মিউজিকের বিষ্ণু আর অঙ্কুশ নামের ছেলেদু'টিকে গল্প করেছিল। তারাই রঞ্জনীকে বলেছে। মিউজিকের ছেলেগুলো ভাল। তারা চায় অপরাধী ধরা পড়ুক। বলাকা নামের মেয়েটি প্রথমে তার অতীত চেপে চাচ্ছিল। সেটা জানিয়ে দিয়েছে মোহন পাকড়াশি। পরে থানায় রেকর্ড দেখে নেয় রঞ্জনী। বলাকাকে ডেকে এক দিন চাপ দিতে সব স্বীকার করেছে।
‘তোমার বিরুদ্ধে খুনের মামলা ছিল, আগে বলোনি কেন ?’
‘ম্যাডাম জিজ্ঞেস করেননি তাই বলিনি। আমার তো লুকোনোর কিছু নেই। পুলিশের খাতায় সবই আছে। কোর্টেও কাগজ আছে। আমি বেকসুর খালাস হয়েছি।’
রঞ্জনী ধমক দিয়ে বলেছিল, ‘বেকসুর খালাস আমাকে দেখাবে না। অপরাধ করেও আইন-আদালত-পুলিশকে ফাঁকি দেওয়ার ঘটনা আমি জানি। তোমার কথাই যদি বিশ্বাস করে নিই, অজুর্ন ধীমানী লোকটাকে তুমি বিয়ে করলে না কেন? সে সুইসাইডই বা করল কেন?’
বলাকা উত্তেজিত হয়ে বলেছিল, ‘ওই হারামির বাচ্চাকে কে বিয়ে করবে? আমার মতো একশোটা মেয়ের সর্বনাশ করেছে। সুইসাইড করা ছাড়া ওর উপায় কী? সবাই পিটিয়ে মারত।’
যত জনের সঙ্গে কথা বলা প্রয়োজন, তত জনের সঙ্গেই কথা বলার চেষ্টা করেছে রঞ্জনী। এমনকী শ্যামাপদ মাল্লাকেও কলকাতার অফিসে ডেকে পাঠিয়েছিল।
ঠান্ডা মাথার খুব বদ লোক। প্রচুর টাকা। লোকাল নেতা, পুলিশকেও হাত করে রেখেছে। যেমন হয় আর কী। এখানেও মস্ত এক থার্মোকলের বাক্সে বরফ দিয়ে প্রচুর মাছ নিয়ে এসেছিল। তাকে মাছ-সমেত ফেরত পাঠাতে বেগ পেতে হয়েছিল। ম্যাডামের জন্য নদীর মাছ না দিয়ে সে যাবেই না। শেষ পর্যন্ত ডান্ডা মারবার ভয় দেখিয়ে তাড়াতে হয়েছে।
এখন সকাল সাড়ে আটটা। নয়ন খানিক আগে বেরিয়ে গেছে। ন’টায় অফিসে মিটিং আছে। যাবার আগে নাকমুখ কুঁচকে বলল, ‘সকালবেলা অফিস করতে হবে জানলে কে লেখাপড়া শিখত? বেলা পর্যন্ত ভোঁসভোঁস করে ঘুমোতাম।
