শেষ আপডেট: 5 June 2020 07:01
কিশোর বয়েসে শিভা আয়াদুরাই[/caption]
কৃতিত্ব নিয়ে শুরু হয়েছিল বিতর্ক
পরে যখন ই-মেলের জনপ্রিয়তা আকাশ ছুঁতে শুরু করেছিল, আবিষ্কারের কৃতিত্ব নিয়ে শুরু হয়েছিল বিতর্ক। ই-মেল আবিষ্কারের দাবি করেছিলেন রে টমলিনসন। সংবাদ মাধ্যমে জানা গিয়েছিল শিভার EMAIL আবিষ্কারের ৭ বছর আগেই কম্পিউটারের মাধ্যমে অন্য কম্পিউটারে চিঠি পাঠানো শুরু করেছিলেন রে টমলিনসন।
'রেথিয়ন' নামে এক প্রযুক্তি কোম্পানির হয়ে ARPANET নামের প্রথম যুগের ইন্টারনেটের সাহায্যে ই-মেল পাঠিয়ে ছিলেন কম্পিউটার পোগ্রামিং-এর পথিকৃত রে টমলিনসন। মার্কিন সেনাদের জন্যই রে টমলিনসন তৈরি করেছিলেন এই সুরক্ষিত ই-মেল পদ্ধতি। রে টমলিনসনের দাবী মেনে নিয়েছিল আমেরিকা রাতারাতি ই-মেল আবিষ্কারের পুরো কৃতিত্বের অধিকারী হয়ে গিয়েছিলেন রে টমলিনসন।
[caption id="attachment_227103" align="aligncenter" width="678"]
রে টমলিনসন[/caption]
তবুও হাল ছাড়েননি শিভা আয়াদুরাই
আয়াদুরাই বলেছিলেন, “উনি (রে টমলিনসন) ই-মেল আবিষ্কার করেননি। রে টমলিনসনের ই-মেল আবিষ্কারের কাহিনি, টেকনোলজির ইতিহাসের সবচেয়ে বড় মিথ্যে। রে টমলিনসন কেবলমাত্র টেক্সট মেসেজ পাঠানোর পদ্ধতি আবিষ্কার করেছিলেন। আজকের যে ফরম্যাটে ই-মেল পাঠানো হয় সেই ই-মেল আমার আবিষ্কার।” ক্ষুব্ধ শিভা ইয়াদুরাই বলেছিলেন, সামান্য রিসার্চ করলেই বোঝা যাবে, ইলেকট্রনিক মেসেজ আর ই-মেল এক নয়।
ই-মেলের সব ফিচার, যেমন cc, bcc, attachments, Inbox, Outbox, Folders, Attachments, Memo তাঁর আবিষ্কার। এবং এর জন্য তিনি রে টমলিনসনের প্রযুক্তির বিন্দুমাত্র সাহায্য নেননি। তাঁর প্রযুক্তি সম্পূর্ণ আলাদা। শিভা ইয়াদুরাই জানিয়েছিলেন, তাঁর কৃতিত্ব ছিনিয়ে নিয়েছেন রে টমলিনসন ও 'রেথিয়ন' সংস্থা।
২০১১ সালে টাইম ম্যাগাজিন শিভা আয়াদুরাইয়ের একটি সাক্ষাৎকার নিয়েছিল, যেটির শিরোনাম ছিল, 'দ্য মান হু ইনভেন্টেড ই-মেল', সেই সাক্ষাৎকারে বলা হয়েছিল শিভা আয়াদুরাইয়ের EMAIL-ই বর্তমান ইমেলের জনক। আমেরিকার বিখ্যাত দ্য স্মিথসোনিয়ান ইন্সটিটিউশনও শিভা আয়াদুরাইয়ের পাশে এসে দাঁড়িয়েছিল। পাশে এসে দাঁড়িয়েছিল আমেরিকার বিখ্যাত সংবাদপত্র ওয়াশিংটন পোস্ট।
[caption id="attachment_227107" align="aligncenter" width="687"]
টাইমের সেই সংখ্যা। যাতে মেনে নেওয়া হয়েছিল শিভার কৃতিত্ব।[/caption]
শুরু হয়েছিল শিভা আয়াদুরাইকে হেয় করার চেষ্টা
আমেরিকার অনান্য প্রধান সারির মিডিয়া ও ব্লগে শিভা আয়াদুরাইকে হেয় করার চেষ্টা শুরু হয়েছিল। শিভা আয়াদুরাই দাবি করেছিলেন, এগুলি তাঁর বিরুদ্ধে হওয়া সংগঠিত ষড়যন্ত্র। যার পিছনে আছে রে টমলিনসনের পৃষ্টপোষক 'রেথিয়ন' সংস্থা।শিভা আয়াদুরাইয়ের বিরুদ্ধে সংঘবদ্ধ আক্রমণের প্রভাব পড়েছিল। শিভা আয়াদুরাইয়ের পাশ থেকে সরে গিয়েছিল ওয়াশিংটন পোস্ট ও দ্য স্মিথসোনিয়ান ইন্সটিটিউশন। ওয়াশিংটন পোস্ট লিখেছিল, তারা ভুল করে শিভাকে ই-মেলের আবিষ্কারক লিখে ফেলেছিল। ইমেলের কিছু ফিচার যেমন ‘bcc’, ‘cc’, ‘to’ ও ‘from’ শিবা আবিষ্কার করার আগেই আবিষ্কৃত হয়ে গিয়েছিল। কিন্তু সেসবের আবিষ্কারক কে সেটা জানাতে ভুলে গেছিল কাগজটি।
সাংবাদিক স্যাম বিডল শিভার বিরুদ্ধে লিখেছিলেন, “প্রযুক্তিকে একটি প্রডাক্টের নাম দিয়ে হাইজ্যাকের চেষ্টা করলে হয়ত প্রচুর সম্পত্তি পাওয়া যাবে। কিন্তু একটা নতুন মডেলের এরোপ্লেনের নাম AIRPLANE রাখলে এরোপ্লেনের আবিষ্কারক উইলবার রাইট হওয়া যায় না।” শিভা যেখানে পড়াশুনা করেছিলেন, সেই ম্যাসাচুসেটস ইনস্টিটিউট অফ টেকনোলোজি, শিভার সংস্থা EMAIL Lab-এর সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করেছিল। শিবার রিসার্চে অর্থ দেওয়া বন্ধ করেছিল। বায়ো-ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগে লেকচার দেওয়ার চুক্তিও প্রত্যাহার করেছিল।
শিভা আয়াদুরাই সংবাদমাধ্যমকে বলেছিলেন, “আসলে এটা ছিল অন্যের কৃতিত্বকে নিখুঁতভাবে নস্যাৎ করে কোটি কোটি ডলার উপার্জনের প্রচেষ্টা। কিন্তু সত্যের থেকে ওঁরা অনেক দূরে। 'রেথিয়ন' প্রচার করে তাঁরাই ই-মেলের আবিষ্কারক। কিন্তু ARPANET-এর সবচেয়ে পুরোনো লিফলেট ছাপা হয়েছিল ১৯৮৬ সালে। সেখানে email বা EMAIL বা electronic mail শব্দগুলির একটিরও নাম গন্ধ নেই। অথচ আমি EMAIL-এর কপিরাইট পেয়েছিলাম, ১৯৮২ সালের ৩০ আগস্ট। এটাই প্রমাণ করছে ই-মেলের আবিষ্কারক আমি।”
কৃতিত্ব পুনরুদ্ধারের চেষ্টা আজও চালিয়ে যাচ্ছেন শিভা
২০১৬ সালে প্রয়াত হয়েছিলেন রে টমলিনসন। মৃত্যুর খবর পেয়ে টুইট করেছিলেন শিভা আয়াদুরাই “ আমি নিচু জাতের, আমার চামড়া কালো, আমি একজন ভারতীয়, যে আবিষ্কার করেছিল #email। রেথিয়ন করেনি, যারা যুদ্ধ ও মৃত্যু থেকে মুনাফা করে। তাদের প্রতীক রে টমলিনসন মিথ্যাবাদী হয়েই মৃত্যুবরণ করলেন।" এই টুইটটাই প্রমাণ করে, কতটা ক্ষোভ ও হতাশা মনে পুষে রেখেছিলেন শিভা আয়াদুরাই, তাই মৃত্যুর পরও প্রতিদ্বন্দীকে মিথ্যাবাদী বলতে দ্বিধা করেননি।
আয়াদুরাইয়ের বয়েস এখন ৫৬। সিস্টেম বায়োলজি,কম্পিউটার সায়েন্স, সায়েন্টিফিক ভিশুয়ালাইজেশন ও ট্রাডিশনাল মেডিসিনে আজ তাঁর বিশ্বজোড়া নাম। তবুও তিনি হারানো কৃতিত্ব পুনরুদ্ধারের চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। কারণ তাঁর মতে ই-মেলের আবিষ্কারক তিনিই। কারণ শিভার সঙ্গে আছে নোয়াম চমস্কির আশীর্বাদ। বিশ্বখ্যাত দার্শনিক, ভাষাতত্ত্ববিদ ও ইতিহাসবিদ ৯১ বছরের নোয়াম চমস্কি তাঁর ছাত্র শিভার দাবিকে সমর্থন করেছিলেন এবং এখনও করেন।
[caption id="attachment_227109" align="aligncenter" width="762"]
শিভার পাশে আছেন নোয়াম চমস্কি[/caption]
শিভা আয়াদুরাই বলেন, তাঁর কৃতিত্বকে হেয় করার পিছনে আছে জাতিবিদ্বেষ ও বর্ণবৈষম্য। ইউরোপ ও আমেরিকা ভাবে, একমাত্র সাদা চামড়ার মানুষেরাই বড় বড় আবিষ্কার করতে পারেন এবং পৃথিবীর আবিষ্কারের কৃতিত্ব নেবে কোনও না কোনও শ্বেতাঙ্গ। এই মিথ ভাঙার জন্য অক্লান্ত চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন কালো চামড়ার ভারতীয় বংশোদ্ভূত এই মার্কিন নাগরিক। কারণ শিভা আয়াদুরাই জানেন, সমস্ত বড় আবিষ্কারের কৃতিত্ব আবিষ্কারকদের হাতে আসে লড়াই করেই।