
শেষ আপডেট: 29 May 2019 10:25
তাতরা পর্বতশ্রেণী[/caption]
আল্পস, হিন্দুকুশ ও তাতরা পর্বতে প্রচুর শৃঙ্গ আরোহণ করে দিন কাটছিল। কিন্তু কুকোজকার স্বপ্ন, হিমালয়ে আসা। নিজের ক্ষমতা যাচাই করা। কারণ, ততদিনে ইংরেজ, জার্মান, আমেরিকান, নিউজিল্যান্ডাররা পৃথিবীর প্রায় সবকটি উচু শৃঙ্গে চড়ে ফেলেছে। পিছিয়ে আছে কেবল পোল্যান্ড। এতই অর্থাভাব সারা পোল্যান্ড জুড়ে। পর্বত অভিযানে কে অর্থ দেবে। তাই উচ্চ পর্যায়ের পর্বতারোহণের জন্য সত্তরের দশক পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হয় পোল্যান্ডকে। তবুও অর্থের অভাবে প্রয়োজনের চেয়ে অনেক বেশি ঝুঁকি নিতে হয়েছে। ফলে সে যুগে পোল্যান্ডের পর্বতারোহীদের সাফল্যের হার যেমন ঈর্ষণীয়, মৃত্যুর পরিসংখ্যানও চমকে দেওয়ার মত।
[caption id="attachment_109027" align="aligncenter" width="702"]
বিশ্বের অন্যতম শ্রেষ্ঠ পর্বতারোহী কুকোজকা[/caption]
বাম দিকে কূকোজকা, এই পোষাকে একের পর এক আটহাজার মিটারের উঁচু শৃঙ্গ আরোহণ করে গেছেন[/caption]
ক্লাইম্বিং বুট থেকে শুরু করে স্লিপিং ব্যাগ সবকিছুই স্থানীয় মুচি আর দর্জিদের কাছ থেকে বানিয়ে নিতেন কুকোজকা। কয়েকটি সফল অভিযানের পর অতি সামান্য সরকারী অনুদান মিলত। সেটুকুও যাতে না হারাতে হয়, তারজন্য কুকোজকা অভিযানগুলোতে সফল হওয়ার জন্য জীবনকে বাজি রাখতেন। বড় দল নিলে প্রচুর খরচ। তাই কুকোজকা আল্পাইন স্টাইলে আরোহণ করতেন। ‘অ্যাল্পাইনিজম’ শব্দটাকে ভিন্ন উচ্চতায় নিয়ে গিয়েছিলেন তিনি।
অভাবের জন্য পোল্যান্ডে সর্বোচ্চ স্তরের অ্যাল্পাইনিজমের চর্চা ও বিকাশ ঘটেছিল। কারণ অ্যাল্পাইনিজম, কুকোজকাদের জন্য পর্বতারোহণের আলাদা কোন স্টাইল ছিল না। এটা ছিল কুকোজকাদের কাছে কম খরচে পর্বত শৃঙ্গে পৌঁছানোর একমাত্র উপায়।
[caption id="attachment_108919" align="aligncenter" width="540"]
যেখানে ঈগল যেতে ভয় করে, সেখানে পৌঁছে যেতেন কুকোজকা[/caption]
না তাঁবু, বা শেরপার সাহায্য, সোজা বেসক্যাম্প থেকে যাত্রা শুরু করে শৃঙ্গ আরোহণ করে নিচে নেমে আসা। মাঝে থাকতে হলে পাথরের আড়ালে, না হলে বরফে গর্ত খুঁড়ে। কখনও সেকেন্ড হ্যান্ড ফুটিফাটা তাঁবুতে। পাছে ছেঁড়া তাবু আরও ছিঁড়ে যায়, খুব প্রয়োজন না হলে তাঁবুও ফেলতেন না কুকোজকা।
অনেক অভিযানে তাঁবু কেনারও সামর্থ্য ছিলনা[/caption]
যে রুটে তাঁর আগে কোনও অভিযাত্রী আরোহণ করেছেন সেই রুটে কুকোজকা আরোহণ করতে উৎসাহ পেতেন না। তাই, ১৪টি শৃঙ্গের মধ্যে ১১টি শৃঙ্গ আরোহণ করেছেন নতুন রুটে। তিনিই বিশ্বের একমাত্র ব্যক্তি, যিনি সর্বোচ্চ ১১ টি নতুন রুট আবিস্কার করেছেন।
১৪ টি শৃঙ্গের মধ্যে আবার ৭ টি শৃঙ্গ আরোহণ করেন একা একাই। এবং তিনটে শৃঙ্গ আরোহণ করেন শীতকালে। এবং এভারেস্ট বাদ দিয়ে বাকি ১৩টি শৃঙ্গ আরোহণের সময় বোতলের অক্সিজেন ব্যাবহার করেননি। ভাবুন, সে সময়ে অক্সিজেনবিহীন আরোহণের কথা কেউ চিন্তাও করতে পারতেন না। তাই ইতিহাস আজও কুর্নিশ জানায় কুকোজকাকে।
[caption id="attachment_109008" align="aligncenter" width="600"]
শৃঙ্গ থেকে নেমে এসে বরফ গলিয়ে নিজেই স্যুপ বানিয়ে নিতেন[/caption]
শিশাপাংমার (৮০০৮ মি) শৃঙ্গে কুকোজকা[/caption]
● ১৯৮৫ সালের শীত কালেই নেপালের চো ইউ (৮২০১ মিটার) আরোহণ করেন সাউথ-ইস্ট পিলার রুটে।
●১৯৮৫ সালেই পাকিস্তানের নাঙ্গাপর্বত (৮১২৬ মি) আরোহণ করেন নতুন রুটে (সাউথ-ইস্ট পিলার)।
●১৯৮৬ সালে বিশ্বের প্রথম পর্বতারোহী হিসেবে নেপালের কাঞ্চনজঙ্ঘা (৮৫৮৬ মি) শীতকালে আরোহণ করেন চিরাচরিত রুটে।
●১৯৮৬ সালে বিশ্বের দ্বিতীয় উচ্চতম শৃঙ্গ কে-টু (৮৬১১ মিটার) আরোহন করেন আল্পাইন স্টাইলে ও নতুন ও সবচেয়ে ভয়ঙ্কর রুটে (সাউথ ফেস)।
●১৯৮৬ সালে নেপালের মানসালু (৮১৫৬ মি) আরোহণ করেন নতুন রুটে ( নর্থ-ইস্ট ফেস) আল্পাইন স্টাইলে।
●১৯৮৭ সালে বিশ্বের প্রথম আরোহী হিসেবে শীতকালে নেপালের অন্নপূর্ণা-১ (৮০৯১ মি) আরোহণ করেন নতুন রুটে ও আল্পাইন স্টাইলে।
● ১৯৮৭ সালেই নেপালের অন্নপূর্ণা-ইস্ট (৮০১০ মি) আরোহণ করলেন আল্পাইন স্টাইলে নতুন রুটে (সাউথ ফেস) ।
● ১৯৮৮সালে আল্পাইন স্টাইলে আরোহন করলেন চিনের শিশাপাংমা (৮০০৮ মি) নতুন ও সবচেয়ে কঠিন রুটে ( ওয়েস্ট রিজ )
[caption id="attachment_109014" align="aligncenter" width="600"]
জীবনের শেষ অভিযানে[/caption]
কুকোজকার আত্নজীবনী ‘মাই ভার্টিক্যাল ওয়ার্ল্ড’[/caption]
তাঁর মৃত্যুর জন্য কুকোজকাকেই দায়ী করা হয়েছিল। বলা হয়েছিল, কেন তিনি কাঠমন্ডু থেকে কেনা পুরোনো দড়ি এমন এক ভয়ঙ্কর অভিযানে ব্যবহার করেছিলেন! কিন্তু আমরা কেউ জানতে চেষ্টা করিনি, কেন কুকোজকাকে গোটা পর্বতারোহণ কেরিয়ারে সেকেন্ড হ্যান্ড রোপ কিনতে হয়েছিল।
কুকোজকার আত্নজীবনী ‘মাই ভার্টিক্যাল ওয়ার্ল্ড’ থেকে আমরা জানতে পারি অর্থাভাব কীভাবে তাঁকে কষ্ট দিয়েছে। সেকেন্ড হ্যান্ড ইকুইপমেন্ট নিয়েই প্রতিটি অভিযানে আসতেন। লোৎসেতে তাঁর শেষ অভিযানের সমস্ত মালপত্র জাহাজে নিয়ে আসেন ভারতের মুম্বাইয়ে। তারপর মুম্বাই থেকে লরিতে করে মালপত্র নিয়ে যাত্রা শুরু করেন কাঠমান্ডুর উদ্দেশ্যে। লরিতে চেপে মুম্বাই থেকে কাঠমান্ডু, আজকের পর্বতারোহীরা এই কৃচ্ছতার কথা ভাবতেই পারবেন? ৫০ লাখ টাকায় এভারেস্ট যেখানে কেনা যায়,পর্বতারোহণের 'অ আ ক খ' না শিখেও।
পাঠক, সম্ভব হলে Walter bonetti-এর লেখা JerzyKukuczca, de la mine aux sommets (জার্জি কুকোজকা: খনি থেকে সামিট) বইটি পড়বেন। পড়তে পড়তে একজায়গায় চোখ জলে ভিজে যাবে। যেখানে লেখক বলছেন, কদিন একটু ভাল খেতে পাবেন, সে জন্যও হিমালয়ে অভিযানে আসতেন, খাদ্যাভাবে ভোগা গরীব এক দেশের পর্বতারোহী, জার্জি কুকোজকা।
পোল্যান্ডের একটি প্রবাদ বোধহয় এই জার্জি কুকোজকার জন্যই লেখা হয়েছিল, "ক্ষুধার্ত পেটই তোমায় সাফল্য এনে দিতে পারে"