রঘু রাই সেই হাতে গোনা ফটোগ্রাফারের একজন, যাঁর ছবি মানুষকে দিয়ে কথা বলিয়ে নেয়। প্রতিবাদের ভাষা সৃষ্টি করে।

ছবিকে ভালবেসে তিনি হাজির হয়েছিলেন গঙ্গা নদীর কোলে বাঙালির বসতবাটি কলকাতা শহরেও।
শেষ আপডেট: 18 December 2025 13:30
‘না, মানিকদা। এখনও হয়নি। যা চাইছি, তা পাচ্ছি না’। কথাগুলি লেখা রয়েছে দেশের ফটোগ্রাফির জনক রঘু রাইয়ের একটি বইতে। তখন ‘ঘরে-বাইরে’ ছবির শ্যুটিংয়ে ব্যস্ত প্রবাদপ্রতিম পরিচালক সত্যজিৎ রায়। পরিচালক মানিকদার নিজস্ব ছবি তুলতে সেখানে হাজির, আরেক কিংবদন্তি। রঘু রাই লিখেছেন, রায়ের ছবি তোলার অনেকদিনের আগ্রহ ছিল। বইতে থাকা ছবি তোলার ঘটনা প্রসঙ্গে লিখেছেন সত্যজিৎ আমাকে প্রশ্ন করলেন, তুমি আমার কাছে কী চাও? আমাকে কী করতে হবে?
রাই লিখেছেন, আমার মুখে কথা ফুটল না। ভাবতে পারছিলাম না, কী বলব! ভয়ে ভয়ে এবং একটা অস্বস্তিকর পরিবেশে বেশ কয়েকটা ছবি নিলাম। কিন্তু, কিছুতেই আমার শান্তি আসছিল না। কয়েক মিনিটের মধ্যেই উনি বললেন, কী এবার হয়েছে তো? জবাবে আমি বললাম, না, মানিকদা, এখনও হয়নি!
আমার প্রতিবাদ শুনে উনি একটু মুচকি হাসলেন। আমি আরও কয়েকটা ছবি তুললাম। কিছুক্ষণ পরেই দৃশ্যগ্রহণের সাময়িক বিরতি ঘটল। উনি শ্যুটিংয়ের খাটেই আধশোয়া হলেন। হাতে ছিল সেই চিরাচরিত পাইপ। সেই সময় তাঁর ছবির নায়িকাও বিছানায় বসেছিলেন। আমি কয়েকটা ছবি নিলেও আমি বিছানার অন্যদিকে চলে গেলাম। যেখান থেকে আপনারা দেখতে পাচ্ছেন, সত্যজিৎ রায়ের পিছনের দেওয়ালটাই কেবল দেখা যাচ্ছে। দেখলাম জানালা দিয়ে আসা আলোটাও বেশ ফিনফিনে হয়ে ঘরে ঢুকছে। আপনারা দেখতে পাবেন লাগোয়া ঘরটির দরজা এবং খাটের একটা সুন্দর ছায়া দেওয়ালের উপর এসে পড়েছে। আমার মুখ দিয়ে আপনিই বেরিয়ে এল, মানিকদা এদিকে তাকান। আমার চিৎকারে উনি মুখ ফেরালেন। অবাক বিস্ময়ে! এটাই সেই মুখের ভাবের সহজাত অভিব্যক্তি। লিখেছেন রঘু রাই।

ছবিকে ভালবেসে তিনি হাজির হয়েছিলেন গঙ্গা নদীর কোলে বাঙালির বসতবাটি কলকাতা শহরেও। ভালবেসে ফেলেছিলেন কল্লোলিনীর জীবন-তরঙ্গকে। তার অনেক আগে থেকেই কলকাতা রাজনৈতিক রণক্ষেত্রে পরিণত হয়ে রয়েছে। রঘু রাই ছবি তুলেছেন মাদার টেরিজার, কালীর। রঘু রাই বুঝেছিলেন এই শহরের একটি নিজস্ব আত্মা রয়েছে। যমুনার কোলের ইন্দ্রপ্রস্থ থেকে ইন্দিরার পাশ ঘেঁষে হাজির হয়েছিলেন গঙ্গামাতৃক কালীর শহরে।

সত্যজিৎ রায়ের নাম জানতেন, তাঁর ছবিও দেখেছিলেন রঘু রাই। তিনি তখন নয়াদিল্লির স্টেটসম্যান অফিসে চাকরি করেন। সত্যজিৎ তখন দিল্লিতে ২২ জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার মঞ্চ থেকে তিনটি জাতীয় পুরস্কার নিয়ে নেমে আসছেন। রঘু রাই তাঁকে বলেন, মিস্টার রে, আপনার হাতে খুব ভারী জিনিস হয়ে গেছে। আপনার একটু সাহায্য পেলে বোধহয় ভাল হয়। সত্যজিৎ বলেন, এবারে বোধহয় নয়, আমি খুশি আপনার ব্যবহারে।

কয়েক বছর পরেই রাই ও রে-র আবার সাক্ষাৎ হয় এক বিচারকমণ্ডলির সারিতে। সেখানে ছিলেন বিখ্যাত চিত্রশিল্পী, ভাস্কর রামকিঙ্কর বেজও। সেই থেকে সত্যজিৎকে এতটাই ভালবেসে ফেলেন রঘু রাই যে, তাঁকে দাদু বলে ডাকতেন। রঘু রাইকে ভারতীয় আলোকচিত্রের জনক বলা হয়। লোকে বলে ছবি কথা বলে। কিন্তু, রঘু রাই সেই হাতে গোনা ফটোগ্রাফারের একজন, যাঁর ছবি মানুষকে দিয়ে কথা বলিয়ে নেয়। প্রতিবাদের ভাষা সৃষ্টি করে। আর্থ-সামাজিক-রাজনৈতিক বিনোদনের ভাষাকে বিপ্লব ও সমাজ বদলের ভাষায় পরিণত করেছিলেন। বাংলাদেশ যুদ্ধ, শরণার্থী বা উদ্বাস্তুদের দুর্দশা, মন্বন্তর, ৭১-এর যুদ্ধে খাদ্য সঙ্কট থেকে ভোপাল গ্যাস দুর্ঘটনার মর্মন্তুদ অশ্রু তাঁর সাদা-কালো ফ্রেমে গোটা দেশের চোখে জল এনে দিয়েছিল। মাদার টেরিজা, বিসমিল্লা খান, দলাই লামা, রবিশঙ্কর, জাকির হোসেন, পণ্ডিত ভীমসেন জোশি থেকে শর্মিলা ঠাকুর-পতৌদি, অপর্ণা সেন- কার মুখ নেই লেন্সের দৃষ্টিতে।

অথচ, ছোট থেকে তাঁর চোখে ফটোগ্রাফার হওয়ার কোনও স্বপ্ন ছিলই না। তাঁর বাবা চাইতেন ছেলে সিভিল ইঞ্জিনিয়ার হবে। আর নিজে চেয়েছিলেন গানবাজনায় নামডাক হবে। সেই মানুষটাই বাবার ইচ্ছেয় সিভিল ইঞ্জিনিয়ার হলেও ২৩ বছর বয়সে তুলে নেন সমাজ-জব্দ করার অস্ত্র ক্যামেরা। রঘু রাইয়ের জন্ম অবিভক্ত ভারতের (বর্তমানে পাকিস্তান) পাঞ্জাব প্রদেশের ঝাং গ্রামে ১৯৪২ সালের ১৮ ডিসেম্বর। ১৯৭২ সালে পেয়েছিলেন পদ্মশ্রী সম্মান। চারজনের মধ্যে সকলের ছোট ছেলে ছিলেন। রঘুর দাদা ছিলেন স্টেটসম্যানের ফটোগ্রাফার। একদিন দাদার ক্যামেরা খেলার ছলে নিয়ে রঘু একটি গাধার ছবি তোলেন। ডেভেলপ করার পর সেই দাদাই ছবিটি লন্ডনের দ্য টাইমসে পাঠিয়ে দেন। সেই ছবি ছাপা হওয়ার পরেই রঘু রাইয়ের জীবন বদলে দেয় সেই গাধা।

তাঁর কথায়, আমি যখন একটা ক্যামেরা হাতে তুলে নিই। তখন আমার সম্পূর্ণ জীবনীশক্তি ওই অতটুকু ভিউফাউন্ডারে ঢুকে পড়ে। আমি ভাবি কী দেখছি আমি। আমার কাছে ক্যামেরা হল খুব কাছ থেকে জীবনকে দেখার একটি মাধ্যম। স্টেটসম্যানে চাকরি পাওয়ার পর ১৯৬৬ সালে তিনি সেখানকার চিফ ফটোগ্রাফার হন। তারপর কাজ করেন সানডে ও ইন্ডিয়া টুডেতে। ১৯৭৭ সালে তিনি ম্যাগনাম ফটো এজেন্সিতে নির্বাচিত হন। যার প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন চিত্র সাংবাদিকতার জনক হেনরি কার্টিয়ের-ব্রেসন।

রঘু রাই একবার বলেছিলেন, দক্ষতা কখনও শেখানোর বস্তু নয়। সেটা নিজেকে অর্জন করতে হয়। আমি তোমাদের একটা ক্যামেরা দিতে পারি, কিন্তু তোমার মধ্যে ‘দর্শন’ দিতে পারি না। সাদা-কালো ছবি নিয়ে বলেছিলেন, ডিজিটাল প্রযুক্তি খুব ভাল। এবং এতে করে তুমি ক্যামেরাকে অটো ফোকাস, অটো এক্সপোজারে নিয়ে যেতে পার। যাতে সুন্দর ছবি আসবে। কিন্তু আমি আমার ছবিকে সাদা-কালোয় দেখতে চাই।

রঘু রাই তাঁর জীবনের অধিকাংশ সময়টাই অ্যানালগ ক্যামেরায় ছবি তুলেছেন। এরপর এসেছে ডিজিটাল এবং আইফোন ফটোগ্রাফির যুগ। রাই তার সবকটাকেই স্বাগত জানিয়েছেন। প্রায় ৫০ বছর ধরে ক্যামেরার সঙ্গে যুগলবন্দি বেঁধে বহু ইতিহাসকে ফ্রেম করে রেখেছেন রাই। তিনি বলেছেন, যদি কোনও সঙ্কটময় পরিস্থিতি আসে, একটি ফটোই পারে সেই অভিব্যক্তিকে ধরে রাখতে। যেমন তোমার সামনে একটি আয়না ধরলে হবে, ক্যামেরা সেই কাজটাই করে দেখায়।

তিনি নব্য ফটোগ্রাফারদের উদ্দেশে বলেছিলেন, একটি ছবি অতিরিক্ত এডিটিং ও টেকনিক্যালিটিজ দিয়ে ভারী করা উচিত নয়। এসব করলে ছবির মূল গন্ধটাই হারিয়ে যায়। তাঁর কথায়, জো দিল সে নেহি বোলেঙ্গে উও আওয়াজ কা ফ্যায়দা নেহি। আজকালকার বাচ্চারা এত এডিট করে, এত টেকলিক্যালিটি দিয়ে ছবিকে ভারী করে তোলে সেটা উচিত নয়। একটি ছবি যতক্ষণ না হৃদয় দিয়ে তোলা হবে, সেখানে এসবের কোনও অর্থ নেই। ছবি ক্যামেরা তোলে না, তোমাদের হৃদয়ে ক্লিক করবে, তবেই সেটা ছবি হয়ে যাবে।