
শেষ আপডেট: 6 August 2020 18:30
হার্ট অ্যাটাক হয়।
মন আর মাথায় ঠিক বাজ পড়ার মতো জোর একটা ঝটকা। চোখের সামনে লহমায় সব অন্ধকার। বুকে চিনচিনে ব্যথা। মাথার দু’পাশে প্রচণ্ড দপদপানি। ডাক্তাররা বলছেন, হৃদয় ভেঙেছে। ডাক্তারি ভাষায় পোশাকি নাম ‘ব্রোকেন হার্ট সিন্ড্রোম’ (Broken Heart Syndrome) ।
হৃদয় ভেঙেছে মানে ঘাবড়ে যাওয়ার কিছু নেই। ব্রোকেন হার্ট সিন্ড্রোমে হার্ট অ্যাটাকই যে হবে সবক্ষেত্রে এমনটা নয়। জটিল হার্টের রোগ চোখ রাঙিয়ে তেড়ে আসবে তেমনটাও নয়। হৃদয় ভাঙে মনের চাপে। প্রচণ্ড অবসাদ আর স্ট্রেসে। ডাক্তারি পরিভাষায় একে ‘স্ট্রেস কার্ডিওমায়োপ্যাথি’ (Stress Cardiomyopathy) বলে। হার্ট ব্লক হয়ে বা হার্টে রক্ত জমাট বেঁধে এই রোগ হয় না। এই সিন্ড্রোমের বেশিটাই মনের ব্যাপার। মন যদি চিন্তায় চাপে দুমড়ে মুচড়ে যায়, তাহলে সে দুঃখে হৃদয়ও খানখান হয়ে যায়। অর্থাৎ হার্টের উপর চাপ পড়ে। সাময়িকভাবে হলেও একটা ঝটকা লাগে শরীরে।
এটা গেল একটা দিক। দ্বিতীয় কারণ হচ্ছে দীর্ঘ সময় লকডাউনে অন্দরবাসে ক্লান্ত হয়ে পড়ছেন অনেকেই। মানসিক স্থিতি হারাচ্ছেন বেশিরভাগ মানুষ। মেজাজ চড়ছে সপ্তমে, রক্তচাপ বাড়ছে, সেই সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে হার্টের সমস্যা। চার দেওয়ালের দমবন্ধ পরিবেশে মানুষ হাঁপিয়ে উঠছে। তাই উৎকণ্ঠা কাজ করছে সব সময়। ডাক্তাররা বলছেন, হঠাৎ করেই শ্বাসের গতি কমে যাওয়া, অনিয়মিত হৃদস্পন্দন, মাথা ঘোরা এই সব লক্ষণ দেখা দিচ্ছে অনেকেরই। প্রচণ্ড স্ট্রেস থেকেই চাপ পড়ছে মনে, আর সে থেকেই দেখা দিচ্ছে ব্রোকেন হার্ট সিন্ড্রোম। করোনা কালে এই স্ট্রেস কার্ডিওমায়োপ্যাথির প্রকোপ বেশি দেখা গেছে।
এবার দেখে নেওয়া যাক কী কী লক্ষণ দেখে সতর্ক হতে হবে—
ডাক্তাররা বলছেন এই ব্রোকেন হার্ট সিন্ড্রোম একদিনে হয় না। দীর্ঘ সময় ধরেই যদি উদ্বেগের পাথর জমতে থাকে মনে, তাহলে তার চাপে একদিন হৃদয় সাড়া দেয়। অনেক সময় দেখা যায় প্রেম ভাঙলে, কাছের মানুষের মৃত্যু হলে বা বিবাহবিচ্ছেদ ইত্যাদি কারণেও ব্রোকেন হার্ট সিন্ড্রোমে আক্রান্ত হয়েছে রোগী। মনের উপর প্রভাব ফেলতে পারে এমন ঘটনাও ব্রোকেন হার্ট সিন্ড্রোমের জন্য দায়ী।
রোগ বাসা বাঁধে ধীরে ধীরে, তার বহিঃপ্রকাশ হয় আচমকাই। শুরুটা হতে পারে বুকে ব্যথা দিয়ে। অনেক রোগীই বলেছেন তাঁরা হঠাৎ করেই বুকে প্রচণ্ড চাপ অনুভব করতে শুরু করেন, মনে হয় বুক ধড়ফড় করছে। হৃদগতি বেড়ে গেছে। শ্বাস নিতে সমস্যা হচ্ছে, দমবন্ধ হয়ে আসছে। তারপর আচমকাই ব্ল্যাক আউট। চোখের সামনে অন্ধকার নেমে আসে। জ্ঞান হারানো এই রোগের আরও একটা লক্ষণ। অনেকেরই রক্ত চাপ হঠাৎ করে কমে যেতেও দেখা যায়। কার্ডিওজেনিক শক লাগে হার্টে অর্থাৎ স্বাভাবিক রক্ত সঞ্চালন বাধা পায়, স্ট্রেস হরমোন হৃদপেশিতে প্রভাব ফেলে। এই অবস্থা কিছুক্ষণের জন্য সাময়িকভাবেও হতে পারে আবার এর রেশ কয়েকদিন বা টানা কয়েক সপ্তাহ থাকতে পারে।
ইকোকার্ডিওগ্রাফি, রক্ত পরীক্ষায় এই সিন্ড্রোম ধরা পড়ে না। হার্ট অকেজো হয়ে পড়ে এমনটাও দেখা যায় না। ডাক্তাররা বলছেন, ব্রোকেন হার্ট সিন্ড্রোম সারে খুব তাড়াতাড়ি। ভাঙা হৃদয় জোড়া লাগানো যায়। তার জন্য অভিজ্ঞ ডাক্তারের কাছে কাউন্সেলিং করাতে হয়। তবে সবচেয়ে বড় থেরাপি হল নিজের খেয়াল রাখা। মানসিক চাপ কমাতে নিয়মিত যোগ ব্যায়াম বা মেডিটেশন করা। লকডাউনে ঘরবন্দি মানেই সোশ্যাল মিডিয়ায় ব্যস্ত না থেকে বেশিটা সময় পরিবারের সঙ্গে কাটানো দরকার। বাইরের পরিবেশে মেলামেশা এই সময় বন্ধ। এর প্রভাব সবচেয়ে বেশি পড়েছে মানুষের মনে। তাই যত বেশি মন খুলে কথা বলা যাবে ততটাই ভাল। কোনও কারণে উৎকণ্ঠায় ভুগলে সবার সঙ্গে খোলাখুলি আলোচনা করা উচিত। মনের মধ্যে উদ্বেগ পুষে রাখলেই বিপদ। রোগ ক্রনিক হয়ে গেলে তার প্রকাশও সাঙ্ঘাতিক হবে। হৃদয় শুধু ভাঙবেই না একেবারে তছনছ হয়ে যাবে। তখন সেই ভাঙা হৃদয়কে জোড়া লাগানো মুশকিল হয়ে পড়বে।