দ্য ওয়াল ব্যুরো: আপনার কি ঘুম কম হয়? রাত জেগে অফিসের কাজ না পারিবারিক সমস্যা? রাত বাড়লেই মোবাইলে খুটুরখাটুর? বিশেষজ্ঞেরা জানাচ্ছেন, শরীর–মন–মেজাজ সব ঠিক রাখতে রাতে ৬–৮ ঘণ্টা নিশ্ছিদ্র ঘুম দরকার৷ না হলে কম ঘুমের প্রভাব পড়ে শরীর জুড়ে৷ বাড়ে হৃদরোগের সমস্যা। বিশেষত মধ্যবয়স্ক যে সব মানুষ রাতে পাঁচ ঘণ্টার কম ঘুমোন তাদের হৃদরোগের ঝুঁকি অনেক বেশি। গবেষণায় এমনটাই জানিয়েছেন সুইডেনের একদল বিজ্ঞানী।
বিজ্ঞানীরা জানাচ্ছেন, কম ঘুমোলে শরীর–স্বাস্থ্য–মন সব ছন্নছাড়া হয়ে যায়৷ শরীরে বসে যায় স্ট্রেস হরমোনের মেলা৷ তার হাত ধরে কিছু অসুখ–বিসুখ ডালপালা মেলে, যার মধ্যে কয়েকটি যথেষ্ট জটিল৷
‘ইউনিভার্সিটি অব গোথেনবার্গ’-এর গবেষক মোয়া বেঙ্গসন বলেছেন, ‘‘আজকের ব্যস্ত জীবনে যাঁদের ঘুম খুব কম, অথবা যাঁরা অনিদ্রায় ভোগেন তাঁদের হার্টের নানা রোগ হওয়ার সম্ভাবনা খুব প্রবল।’’
এই গবেষণাটি ৫০ বছর এবং তার আশপাশের বয়সের মানুষজনের উপর প্রথম করা হয়। মোয়া জানিয়েছেন, গবেষণা কাজ শুরু হয় ১৯৯৩ সালে। ৫০ বছর বা তার বেশি বয়সের প্রায় ১,৪৬৩ জন পুরুষকে গবেষণার জন্য নিমন্ত্রণ জানানো হয়। বিজ্ঞানীদের ডাকে সাড়া দেন ৭৯৮ জন। তাঁদের ঘুমের নানা সময় বেঁধে দেন বিজ্ঞানীরা। দীর্ঘ ২১ বছরের বেশি তাঁদের উপর নজরদারি চালিয়ে বিজ্ঞানীরা দেখেন যাঁরা রাতে পাঁচ ঘণ্টা বা তার কম ঘুমিয়েছেন তাঁদের শরীরে বাসা বেঁধেছে নানা রোগ। সুইডিশ হসপিটালের রিপোর্ট বলেছে, ওই সব পুরুষদের ভবিষ্যতে হৃদরোগের সম্ভাবনা বেড়ে গিয়েছে প্রায় দ্বিগুণ। পরিবর্তে যাঁরা রাতে সাত-আট ঘণ্টা ঘুমিয়েছেন তাঁদের শরীর-স্বাস্থ্য অনেক বেশি তরতাজা রয়েছে।
এখন দেখা যাক, কম ঘুমোলে আর কী কী রোগ হওয়ার সম্ভাবনা থাকে—
- হৃদরোগের আশঙ্কা বা রোগ থাকলে তার প্রকোপ বাড়ে৷
- বাড়তে পারে রক্তচাপ৷
- ভাল করে না ঘুমোলে শরীরে রোগ প্রতিরোধকারী অ্যান্টিবডি অনেক কম তৈরি হয় এবং তার ফলে ব্রেস্ট ও কোলন ক্যান্সারের প্রবণতা বাড়ে৷
- অবস্ট্রাকটিভ স্লিপ অ্যাপনিয়া সিনড্রোম হল এমন একটি রোগ যাতে ঘুমের মধ্যে থেকে থেকে শ্বাস বন্ধ হয়ে যাওয়ার প্রবণতা থাকে। কম ঘুমোলে বাড়ে এই রোগ। যথাসময়ে সঠিক চিকিৎসা না হলে তা থেকে ডায়াবেটিস, হাইপ্রেশার, হৃদরোগ, মেদবাহুল্য ইত্যাদি হওয়ার আশঙ্কা খুব প্রবল৷
- গবেষকেরা দেখেছেন, কম ঘুমোলে শরীরে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা অনেক কমে যায়। ফলে সাধারণ জ্বর–সর্দি–কাশি বেশি হয়৷
- দিনের পর দিন কম ঘুমোলে বিপাক ক্রিয়ার হার কমে যায়। ক্যালোরি বাড়তে থাকে, দেখা দেয় হজমের সমস্যা। ফলে ওজন বাড়তে থাকে।
- স্ট্রেস হরমোন কর্টিসোল-এর পরিমাণ বেড়ে গিয়ে মনমেজাজ খারাপ হয়। শরীর জুড়ে দেখা দেয় ক্লান্তি। যার ছাপ পড়ে মুখেও। ফলে অকালে বলিরেখা দেখা দিয়ে ত্বকের লাবণ্য কমতে থাকে।
সারা দিন ধরে যে যে তথ্য পায় আমাদের মস্তিষ্ক, ঘুমের সময় চলে তার ঝাড়াই–বাছাই৷ অর্থাৎ কোন তথ্য মনে রাখতে হবে, কোনটা ভুলতে হবে, কোন কোনটা একে অন্যের সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত, কোন তথ্যকে কাজে লাগিয়ে সমস্যার সমাধান করতে হবে ইত্যাদি৷ কম ঘুমোলে এ কাজে গোলমাল হয়ে স্মৃতিশক্তি, বিচার ক্ষমতা আচ্ছন্ন হয়ে যেতে পারে৷ কমতে পারে সৃজনশীলতা৷ ফলে কাজের মান খারাপ হতে থাকে৷ পাশাপাশি, কম ঘুমের হাত ধরে শারীরিক–মানসিক চাপ বাড়ে৷ ক্লান্তিতে, বিরক্তিতে জেরবার হন মানুষ৷ স্বচ্ছ ভাবে চিন্তাভাবনা করতে পারেন না৷
‘ইউরোপিয়ান সোসাইটি অব কার্ডিওলজি’-এর
গবেষকেরা জানিয়েছেন এই কম ঘুমের কারণেই বাড়ে নানা কার্ডিওভাসকুলার রোগ। শরীরে রক্ত সঞ্চালন অনেক কমে যায়। দেখা গিয়েছে একজন ৭১ বছর বয়সী লোক যদি পর্যাপ্ত পরিমাণ ঘুমোন তাহলে তাঁর হৃদরোগের সম্ভাবনা একজন বছর পঞ্চাশের ব্যক্তির থেকে অনেক কমে যায়। উল্টে কম ঘুমের কারণে মধ্যবয়স্ক নারী-পুরুষদের মধ্যেই হৃদরোগের ঝুঁকি অনেক বেশি বেড়ে যায়।
গবেষকেরা জানাচ্ছেন, কম ঘুমের ছাপ পড়ে দাম্পত্য জীবনেও। মেজাজ খিটখিটে হয়ে যাওয়ার ফলে সম্পর্কে তিক্ততা দেখা দিতে থাকে। এই প্রবল মানসিক চাপ থেকেও স্ট্রোক হওয়ার সম্ভাবনা অনেক বেড়ে যায়।
যদি কম ঘুমোনোর অভ্যাস তৈরি করে ফেলেন তাহলে যত তাড়াতাড়ি পারেন সেই অভ্যাস ঝেড়ে ফেলুন৷ কারণ শরীর ও মনকে ভাল রাখার জন্য ঘুমের মতো ওষুধ খুব কমই আছে৷